কেন ভোটে জিততে পারছে না সিপিএম? যা বললেন সৃজন ভট্টাচার্য
সৃজন ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিপিএমের নির্বাচনী দুর্বলতার পেছনে রয়েছে সংগঠনের ক্ষয়, অর্থের অসম প্রভাব এবং রাজনীতির ইস্যু বদলের মতো একাধিক কারণ।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক সময় বামপন্থীরা ছিল প্রধান শক্তি, গত এক দশকে তাদেরই নির্বাচনী সাফল্য ক্রমশ কমেছে। বিধানসভা থেকে লোকসভা, প্রতিটি নির্বাচনে সিপিএম এবং বামফ্রন্টের ভোট ও আসন দুই-ই কমতে কমতে কার্যত তারা এখন শূন্য। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, কেন ভোটে জিততে পারছে না সিপিএম? ইনস্ক্রিপটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিপিএম-এর রাজ্য কমিটির সদস্য এবং এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের কথায় উঠে এল বাম রাজনীতির সংকট ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক।
সৃজন ভট্টাচার্যের মতে, বাম রাজনীতির নির্বাচনী দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ সংগঠনের ক্ষয়। এক সময় গ্রাম থেকে শহর— প্রতিটি স্তরে সিপিআইএমের শক্তিশালী সাংগঠনিক উপস্থিতি ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে সেই সংগঠন অনেক জায়গাতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তাঁর কথায়, “এক সময় যে সাংগঠনিক শক্তি বামপন্থীদের ছিল, তা আজ আর সেই জায়গায় নেই। ফলে মানুষের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক কাজ করার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।”
অর্থের রাজনীতি: অসম লড়াই
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
CPIM West Bengal: ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে ডিওয়াইএফআই-এর সদস্য সংখ্যা বেড়েছে ২ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি। কিন্তু সদস্যসংখ্যা বাড়লেও ভোটবাক্সে তার কোনও প্রতিফলন পড়ছে না। কেন?
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থের প্রভাবও বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করেন সৃজন। তাঁর মতে, রাজনীতিতে বিপুল অর্থের ব্যবহার নির্বাচনী লড়াইকে অসম করে তুলেছে। তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মতো দলগুলো বিপুল আর্থিক শক্তি নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করে— এই বাস্তবতায় সিপিএমের মতো দলগুলোর পক্ষে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ন্যারেটিভ বদল: রুজি-রুটি থেকে ধর্ম
রাজনীতির মূল ইস্যুর পরিবর্তনকেও বামেদের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, এক সময় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা বা শ্রমিক অধিকার অর্থাৎ মানুষের রুজি-রুটির প্রশ্ন। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ধর্ম, জাতপাত বা পরিচয়ের রাজনীতি। সৃজনের বক্তব্য, এই ন্যারেটিভ পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে বামপন্থীরা অনেক সময়ই সমস্যায় পড়েছে।
বিকল্প রাজনীতির সংকট
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জয়ের সম্ভাবনা আছে এমন আসনে প্রার্থী করার মাধ্যমে সিপিআইএম কি বুঝিয়ে দিতে চাইছে তৃণমূলের যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছে, বামেদেরও তৈরি হচ্ছে মীনাক্ষী!
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন তিনি। নতুন প্রজন্মের সামনে একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক মডেল তুলে ধরা। তাঁর মতে, বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা মানুষের মূল্যবোধকে ক্রমশ ব্যক্তি-কেন্দ্রিক করে তুলছে। ফলে সামষ্টিক রাজনীতি বা শ্রেণিভিত্তিক আন্দোলনের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মকে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
‘দুর্নীতির অর্থনীতি’ বনাম বিকল্প মডেল
আগামী নির্বাচনে বামপন্থীদের কীভাবে প্রাসঙ্গিক করা যায়— সেই প্রশ্নে সৃজন ভট্টাচার্যের জোর মূলত অর্থনৈতিক বিকল্পের উপর। তাঁর মতে, কৃষিকে পুনরায় লাভজনক করা, শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং তৃণমূল সরকারের তথাকথিত “দুর্নীতির অর্থনীতি” থেকে মানুষকে বের করে আনা— এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই বামপন্থীদের রাজনীতি এগোতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও মাঠের রাজনীতি
একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকলেই হবে না। মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলা— যা এক সময় বাম রাজনীতির বড় শক্তি ছিল, সেটিকে নতুন করে জোর দিতে হবে।
মতাদর্শ বনাম ব্যক্তিগত সম্পর্ক
সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন রাজনৈতিক সতীর্থ প্রতিকূল রহমানের দলত্যাগ প্রসঙ্গও উঠে আসে। সেই প্রসঙ্গে সৃজন স্পষ্ট করে বলেন, ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের চেয়ে তাঁর কাছে দল ও মতাদর্শ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, বামপন্থী মতাদর্শ ছেড়ে অন্য দলে গিয়ে নিজেকে বামপন্থী বলা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সৃজন ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিপিএমের নির্বাচনী দুর্বলতার পেছনে রয়েছে সংগঠনের ক্ষয়, অর্থের অসম প্রভাব এবং রাজনীতির ইস্যু বদলের মতো একাধিক কারণ। তবে একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বিকল্প রাজনীতি তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে বামপন্থীরা আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।






