গান্ধীর হিন্দুধর্ম: সংস্কারমুখী, মানবিক—যা কট্টরপন্থীদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল
Mahatma Gandhi: তিনি মঠ, মঠাধিপতি বা সন্ন্যাসীদের প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর এই উদারনৈতিক ও সংস্কারমুখী হিন্দুধর্ম কট্টরপন্থীদের চক্ষুশূল ছিল।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নাথুরাম গডসের এই গুলি চালানোর ঘটনাটি কোনো আকস্মিক বা প্রথম প্রচেষ্টা ছিল না। ১৯৩২ সালের পর থেকে হিন্দু মহাসভা বা হিন্দুত্ববাদীরা অন্তত চারবার গান্ধীকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার নেপথ্য কারণগুলি বিশ্লেষণ করলেই গান্ধী হত্যার প্রকৃত প্রেক্ষাপট বোঝা সম্ভব।
পুনা চুক্তি ও হিন্দু মহাসভার ক্ষোভ
গান্ধীকে হত্যার প্রথম প্রচেষ্টাটি হয় পুনা চুক্তির পরবর্তী সময়ে। সেই সময় ডঃ বি.আর. আম্বেদকর দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু গান্ধীর আশঙ্কা ছিল, দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু হলে হিন্দু সমাজে এমন এক ভাঙন ধরবে, যা ভবিষ্যতে আর জোড়া লাগানো সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যেই ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করায় তারা মূলধারার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনীতি থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিল। গান্ধীজির ভয় ছিল, দলিতরাও যদি হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে বর্ণ হিন্দুদের আক্রোশ ও অত্যাচার তাদের উপর আরও বাড়বে। যদিও আম্বেদকর মনে করতেন, বর্ণ হিন্দুদের নিপীড়নের মধ্যে থেকে দলিতদের উত্থান অসম্ভব।
শেষপর্যন্ত গান্ধীর অনশনের ফলে পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা রদ হয় এবং তার বদলে 'সাধারণ আসনে' (General Seats) দলিতদের জন্য কিছু আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু হিন্দু মহাসভা বা কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা এই সামান্য ক্ষমতা প্রদানকেও মেনে নিতে পারেনি। তাদের সমস্ত রোষ গিয়ে পড়ে গান্ধীজির উপর। ১৯৩৩ সালে গান্ধীজি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেই তার উপর প্রথম হামলার চেষ্টা হয়। এরপর আরও তিনবার বিফল হওয়ার পর, ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি বিড়লা হাউসে তারা সফল হয়।
৫৫ কোটি টাকার অজুহাত ও প্রকৃত সত্য
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
The Great Calcutta Killings: ৭০ বছর পর এই ঘটনাটা নিয়ে সিনেমা করার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? বিবেক অগ্নিহোত্রীদের লক্ষ্য হলো, হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে তাদের মধ্যে ঘৃণার সৃষ্টি করা।
গান্ধী হত্যার পর নাথুরাম গডসে আদালতে তার জবানবন্দিতে বলেছিলেন যে, পাকিস্তানকে বকেয়া ৫৫ কোটি টাকা দেওয়ার জন্য ভারত সরকারকে বাধ্য করেছিলেন গান্ধীজি, তাই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই যুক্তি ধোপে টেকে না। কারণ, হিন্দু মহাসভা ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই গান্ধীজিকে হত্যার চেষ্টা করছিল, যখন পাকিস্তান বা ৫৫ কোটি টাকার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এছাড়া, ভারত সরকার যেদিন ওই টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তার চার দিন পর গান্ধীজি অনশন ভঙ্গ করেন। যদি টাকাই একমাত্র কারণ হতো, তবে তিনি সেদিনই অনশন ভাঙতেন। আসলে ৫৫ কোটি টাকার বিষয়টি ছিল হত্যাকারীদের তৈরি করা একটি অজুহাত বা 'মিথ' মাত্র।
গান্ধী-বিদ্বেষের মনস্তত্ত্ব
গান্ধীজির উপর হিন্দুত্ববাদীদের আক্রোশের প্রধানত দুটি কারণ ছিল।
প্রথমত, সাভারকর থেকে শুরু করে আরএসএস-এর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা মনে করতেন, গান্ধীর অহিংসার বাণী আসলে কাপুরুষতার নামান্তর। তাদের মতে, এই অহিংসার ফলেই হিন্দুরা 'নির্বীর্য' ও 'ভীরু' হয়েছে এবং মুসলমানদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গান্ধীজি নিজেকে একজন 'সনাতনী হিন্দু' বলে দাবি করতেন। কিন্তু তাঁর হিন্দুধর্মের অনুশীলন তৎকালীন উচ্চবর্ণের গোঁড়া হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। গান্ধীজি বলতেন, শাস্ত্র আমরা পড়ব, কিন্তু শাস্ত্রের যা কিছু যুগোপযোগী নয়, তা বর্জন করতে হবে। তিনি মনুসংহিতার নারী ও দলিত বিরোধী অংশগুলিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি এমন কথাও বলেছিলেন যা আজও অনেক হিন্দু বলতে সাহস পাবেন না—
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ajit Pawar: বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারের মৃত্যু ঘিরে উঠছে প্রশ্ন, এটা কি নিছকই দুর্ঘটনা নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র?
বিধবাদের যদি শুভ কাজে অস্পৃশ্য করে রাখা হয়, তবে বিপত্নীক পুরুষদেরও দূরে রাখা উচিত।
তিনি মঠ, মঠাধিপতি বা সন্ন্যাসীদের প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর এই উদারনৈতিক ও সংস্কারমুখী হিন্দুধর্ম কট্টরপন্থীদের চক্ষুশূল ছিল।
দাঙ্গা ও গান্ধীর অনশন
দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় গান্ধীজির ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় যখন হিন্দুত্ববাদীরা শহরকে মুসলমান-শূন্য করার চক্রান্ত করছে, তখন গান্ধীজির অনশনের ফলেই সেই দাঙ্গা থামে এবং পরবর্তী বহু বছর কলকাতায় আর বড় কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। ঠিক একইভাবে, ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি দিল্লিতে অনশন শুরু করেন। তখন দিল্লির পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। পাকিস্তান থেকে আসা লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ উদ্বাস্তু এবং আরএসএস-এর প্ররোচনায় দিল্লিকে মুসলমান-শূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। নাথুরামের দাবি ভুল প্রমাণ করে, গান্ধীজির এই দ্বিতীয় অনশনও সফল হয় এবং সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়।
গান্ধীজি মারা গেছেন, এবং রাজনৈতিকভাবে তাঁর শিষ্যরাও তাঁকে পুরোপুরি অনুসরণ করেননি। নেহেরুর ভারত, গান্ধীজির স্বপ্নের ভারতের পথে হাঁটেনি। নোটের ছবি বা রাস্তার নাম বাদে, রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও সমাজচিন্তা থেকে গান্ধীজিকে সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবুও, আরএসএস-এর প্রবল আধিপত্যের যুগেও গান্ধীজি প্রাসঙ্গিক, এবং হয়তো আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক।
কারণ, মহাত্মা গান্ধী কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি চিন্তাধারা। ভারতের মূক, নিরক্ষর ও দরিদ্র মানুষকে সংগঠিত করার এবং ভয়কে জয় করার মন্ত্র তিনি শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন,
ভয় এবং সাহস—দুটোই সংক্রামক।
আজও যখন ভারতের সাধারণ মানুষ কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তা সে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন হোক বা শাহিনবাগের মতো প্রতিবাদ, সেখানে অজান্তেই উঠে আসে গান্ধীজির শেখানো 'সত্যাগ্রহ' বা 'প্যাসিভ রেজিস্ট্যান্স'-এর কৌশল। সুন্দরলাল বহুগুণার চিপকো আন্দোলন থেকে শুরু করে হাল আমলের সোনম ওয়াংচুক বা শঙ্করাচার্যের অনশন—প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আজও গান্ধীজির হাতিয়ারই ব্যবহৃত হচ্ছে।
আরএসএস বা হিন্দুত্ববাদীদের কাছে গান্ধীজি আজও অস্বস্তির কারণ। কারণ গান্ধীজির বহুত্ববাদী ভারতের সঙ্গে তাদের সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদের কোনো মিল নেই। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত গান্ধীজির নামে কুৎসা রটানো এবং ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। তাদের লক্ষ্য ভারতবাসীর মন থেকে গান্ধীজিকে মুছে ফেলা। কিন্তু যতদিন সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ততদিন গান্ধীজি তাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। কারণ গান্ধী-হত্যার মধ্য দিয়ে সেই মানুষটিকে শেষ করা গেলেও, তাঁর আদর্শকে আজও পুরোপুরি পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি।






