নবান্নের বৈঠকে যোগ দেওয়ার পরেই কি মন পরিবর্তন! কেন বিজেপি ছাড়লেন চন্দ্র বসু?
BJP: সম্প্রতি বাংলা দিবস সংক্রান্ত সর্বদল বৈঠকে যোগ দিতে নবান্নে গিয়েছিলেন চন্দ্র। তার ঠিক পরে পরেই দলত্যাগের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই জল্পনা ঘনিয়েছে নানা মহলে।

দিনের পর দিন ধরে বিজেপি যে বিভাজনের রাজনীতি করে আসছে, তা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনীতিক ভাবনার একেবারে পরিপন্থী। সঠিক পথে হাঁটছে না দল। বিজেপির থেকে যা প্রত্যাশা করেছিলেন, এই ক'বছরে পেয়েছেন ঠিক উল্টোটাই। এমনই একগুচ্ছ অভিযোগ আর ক্ষোভ নিয়ে দল ছাড়লেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর উত্তরসুরী চন্দ্র কুমার বসু। বিজেপি সভাপতি জেপি নড্ডার কাছে সেই সমস্ত ক্ষোভই উগরে দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ছিন্ন করেছেন দলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কও। নড্ডার পাশাপাশি সেই চিঠির প্রতিলিপি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও।
দলের সঙ্গে তাঁর সংঘাত আজকের নয়। অনেক দিন ধরেই ধিকি ধিকি করে জ্বলেছে ক্ষোভের আগুন। বিজেপির টিকিটে ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন যে চন্দ্র বসু, দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির কোনও পদে রাখা হয়নি তাঁকে। টিকে ছিল শুধু দলের প্রাথমিক সদস্যপদটুকু। এতদিনে সেই সুতোটুকও ছিন্ন হলে একেবারে।
হিসেব বলছে, বাংলার ভোট আসতে ঢের দেরি। যদিও রাজ্যের বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ছাব্বিশে নয়, ২০২৪ সালে লোকসভার সঙ্গেই নাকি বাংলাতেও বিধানসভা ভোট করিয়ে দেওয়া হবে। তা তিনি যাই বলুন না কেন, খাতায়-কলমে বাংলায় গদি দখলের লড়াই শুরু হতে এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি। তবে এর মধ্যেই যেভাবে দলবদলের ঢেউ উঠতে শুরু করেছে বিজেপির অন্দরে, তা ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
PM Modi and RSS : ২০১৬ সালের পাওয়া শেষ হিসেব বলছে দেশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শাখা রয়েছে ৫৬৮৫৯টি।
সম্প্রতি বাংলা দিবস সংক্রান্ত সর্বদল বৈঠকে যোগ দিতে নবান্নে গিয়েছিলেন চন্দ্র। তার ঠিক পরে পরেই দলত্যাগের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই জল্পনা ঘনিয়েছে নানা মহলে। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে আগেই বিজেপিতে যোগ দেন চন্দ্র। দলে যোগ দিতে না দিতে পেয়ে যান টিকিটও। সেই ভোটেই তিনি লড়েছিলেন খোদ মমতার বিরুদ্ধে। স্বাভাবিক ভাবেই জয় আসেনি। কিন্তু তখনও চন্দ্র বসুকে নিয়ে আশা ছাড়েনি দল।

২০১৯ সালে ফের প্রার্থী হন চন্দ্রবাবু। এবার কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্রে, তৃণমূল নেত্রী মালা রায়ের বিরুদ্ধে। এবারও আসে শোচনীয় পরাজয়। এর পর থেকেই কি দলে গুরুত্ব কমতে থাকে চন্দ্র বসুর! কারণ তার পর থেকে দলীয় কাজে তেমন ভাবে দেখা যায়নি সুভাষ চন্দ্র বসুর বংশধরকে। ২০২০ সালে রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। কারণ তখন থেকেই বিজেপির সঙ্গে নানা বিষয়ে মতানৈক্য তৈরি হতে শুরু করেছে তাঁর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India Renamed Bharat: বিজেপির মূল বক্তব্য হচ্ছে, ব্রিটিশরা ভারতের নাম পরিবর্তন করে ইন্ডিয়া করে।
ক্ষোভ উগরে দিলেও ইস্তফা পত্রে এত সব কথা বিস্তারিত লেখেননি চন্দ্রবাবু। শুধু জানিয়েছেন, যে আদর্শ, যে লক্ষ্যের কথা ভেবে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, সেসব কোনও কিছুই পূরণ হয়নি তাঁর। তাই এই সিদ্ধান্ত। তিনি যা যা সাংগঠনিক প্রস্তাব দলকে দিয়েছিলেন, সেসব বিন্দুমাত্র কানে তোলেনি বঙ্গবিজেপি। যা তাঁকে ক্রমশ এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আয়োজিত পশ্চিমবঙ্গ দিবস সংক্রান্ত সর্বদল বৈঠকে কোনও প্রতিনিধি পাঠায়নি বিজেপি। তবে দলের দেখানো পথে না হেঁটে নিজেই সে বৈঠকে হাজির ছিলেন চন্দ্রবাবু। আর সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই নানাবিধ জল্পনা শুরু করেছে নানা পক্ষ। তবে চন্দ্র বসুর ইস্তফাপত্রে তেমন কোনও ইঙ্গিত নেই।
নড্ডাকে দেওয়া চিঠিতে তিনি লিখেছেন, নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন যজ্ঞে যোগ দেওয়ার জন্যই তাঁর ২০১৬ সালে বিজেপিতে আসা। পাশাপাশি বিজেপির মঞ্চ এবং দলের সাংগঠনিক কাঠামো ব্যবহার করে নেতাজির আদর্শ প্রচারের ভাবনা ছিল তাঁর। তার জন্য নতুন করে 'আজাদ হিন্দ মোর্চা' গড়ারও ইচ্ছা ছিল চন্দ্রবাবুর। তবে সেই সব লক্ষ্য কোনওটাই তাঁর পূরণ হয়নি বিজেপিতে এসে। কীভাবে বাংলার মানুষের দরজায় পৌঁছতে পারে বিজেপি নেতৃত্ব, তার একটা নীল নকশা কষে বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। তবে সেই সমস্ত প্রস্তাবই উপেক্ষা করা হয়েছে বিজেপির তরফে। আর এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা। পাশাপাশি বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির সঙ্গে তার পারিবারিক আদর্শের সংঘাতও এই সরে আসার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন চন্দ্র বসু।
বারবার বিজেপির সঙ্গে মতের অমিল ঘটেছে চন্দ্রবাবুর। কখনও ছাগলের মাংস খাওয়া নিয়ে বিরোধিতা করে বিজেপির অন্য নেতাদের বিরাগভাজন হয়েছেন তো কখনও বিজেপির জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নীতির বিরোধিতা করে খোদ বিজেপিরই অস্বস্তির বাড়িয়েছেন চন্দ্র বসু। সব মিলিয়ে দু-পক্ষের মধ্যেই ক্ষোভ জমছিল। এতদিনে তারই বহিঃপ্রকাশ হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
আগামী দিনে চন্দ্র বসুর জায়গা কি হতে চলেছে তৃণমূলে, সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য এখনও মিলছে না। গত কয়েক বছর ধরেই দু'দলেই আমরা দলবদলুদের ভিড় দেখেছি। বিজেপি সামনে এনেছs ওয়াশিং মেশিন তত্ত্ব। তৃণমূল মুখে তেমন কিছু না বললেও কাজে আলাদা কিছু করে দেখায়নি তেমন। ফলে ভোটের আগে আগে এ দল থেকে ও দলে নেতা-কর্মীদের যাতায়াত দেখাটা পশ্চিমবঙ্গবাসীর জন্য এখন জলভাত। তবে রাজ্যে বিধানসভা ভোটের এতদিন আগে থেকে যেভাবে বিজেপির অন্দরের গোষ্ঠীকোন্দল সামনে আসতে শুরু করেছে, তাতে ভোটের বাজারে অস্বস্তিতে পড়তে পারে বিজেপি, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।







