লকডাউনে ঘরছাড়া শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়েছেন প্লেনে করে, নিজেই কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তিনি?
মে মাসেই ট্যুইট করেছিলেন, "কখনও আশা ছাড়তে নেই, কারণ জীবনে মিরাকল হয়েই থাকে।" এমন সদাহাস্যময় শত্রুহীন ব্যক্তিত্ব কেন হঠাৎ আত্মহত্যা করলেন?

২৪ অগাস্ট, ২০২২। দিল্লির একটি মন্দিরে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে তাঁর দেহ। তাঁর নাম পাপ্পন সিং গেহলট। বয়স ৫৫। লকডাউনের সময় একটি বিশেষ কাজের জন্য নজর কেড়েছিলেন এই কৃষক। দেশে হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণার ফলে সবথেকে বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। কৃষিক্ষেত্রেও এমন প্রচুর শ্রমিক কাজ করে থাকেন, যাঁদের নিজস্ব জমি নেই। কোনও বড় চাষির জমিতে মজুরি করে দিন গুজরান। পাপ্পনের অধীনেও এমন বেশ কিছু শ্রমিক কাজ করতেন, যাঁরা লকডাউনের ফলে অত্যন্ত অসুবিধায় পড়েন। হাজার হাজার লোক তখন পায়ে হেঁটে দেশের বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। একধাক্কায় কাজ চলে গিয়েছে অনেকেরই। শহরে জীবন নির্বাহ করার খরচ বেশি, অথচ রোজগার নেই। এজন্যই দেশে ফেরা। পাপ্পন নিজে প্লেনের টিকিট কেটে তাঁর অধীনে কাজ করা শ্রমিকদের গ্রামে ফিরতে সাহায্য করেছিলেন। আর সেই কাজের জন্যই লাইমলাইটে চলে আসেন তিনি। কিন্তু উপকৃত মজুরদের দোয়া তাঁকে বোধহয় ছুঁতে পারেনি।
আলিপুর অঞ্চলে থাকতেন পাপ্পন। তাঁর বাড়ির সামনেই একটি মন্দির। পুলিশ রিপোর্ট মোতাবেক সেই মন্দিরেরই একটি সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে তাঁকে। দেহ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাতে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে নিজের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন পাপ্পন। মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা রয়েছে এখনও। দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তদন্ত জারি রেখেছে আপাতত। কোভিডে যিনি মজুরদের বাড়ি যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন, করোনার উৎপাত থিতু হলে তিনিই ফের নিজের পয়সায় টিকিট কেটে মজুরদের কাজে ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন। মানুষটিকে অত্যন্ত ভদ্র, নম্র মানুষ বলেই জানত পাড়া প্রতিবেশীরা। শত্রু বলতেও ছিল না কেউ বিশেষ। এমতাবস্থায় পরিবার পর্যন্ত কাউকেই সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত করতে পারেনি। কাজেই আপাতত আত্মহত্যা বলেই মনে করা হচ্ছে এই মৃত্যুকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আশঙ্কা থাকছে অনেক মানুষের গৃহহীন হওয়ার। সেই সংখ্যার মধ্যে অনেকেই জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিনত হবেন, বাধ্য হবেন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে।
আত্মহত্যা হিসেবেই যদি আপাতত ধরে নেওয়া হয়, ভারতের প্রেক্ষিতে তা খুব নতুন কিছু কি? কী বলছে এনসিআরবি-র নথি? একথা ঠিক, গত শতকের শেষ কয়েক দশকের থেকে নতুন শতকে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা কিঞ্চিৎ কমেছে। কিন্তু ভারতের মতো জনবহুল দেশে তাও খুব একটা কম না। আর মানুষের তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওজন কেবলমাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে না মাপাই ভালো। কোভিডের ফলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতের অর্থনীতি। এ-সময় কৃষিক্ষেত্রটি ভারতের অর্থনীতিকে সজীব করতে সাহায্য করেছে অনেকখানিই। অথচ ২০১৯-এর থেকে ২০২০-তে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা। কৃষক অর্থে কৃষিমজুর। তাঁদের আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ১৮%। এক বছরে এই বৃদ্ধি অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং মারাত্মক।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যগুলির মধ্যে কৃষক আত্মহত্যা সবথেকে বেশি মহারাষ্ট্রে, গড়ে বছরে ৪০০৬টি। এরপরে রয়েছে কর্নাটক- ২০১৬টি, অন্ধ্রপ্রদেশ- ৮৮৯টি, মধ্যপ্রদেশ- ৭৩৫টি এবং ছত্তিশগড়, ৫৩৭টি। সর্বমোট ১০৬৭৭ জন কৃষিমজূর আত্মহত্যা করেছিল সে-বছর। করোনাকালে আত্মহত্যার হার বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বটে, তবে তার আগের বছরেও মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্র ও মধ্যপ্রদেশে আত্মহত্যার হার সবথেকে বেশি। অস্বীকার করার উপায় নেই, ভারতে কৃষক আত্মহত্যা বর্তমানে একটি অতি-সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা ভারতীয়দের যৌথমানসে আর তেমন দাগ কাটে না আজকাল। অথচ পঙ্গু, ভারতীয় অর্থনীতির ভার বহন করে চলেছে কৃষকরাই।
পিটিআই রিপোর্ট বলছে, ৬৮,০০০ টাকা খরচ করে প্লেনের টিকিট কেটেছিলেন পাপ্পন তাঁর মজুরদের জন্য। প্রত্যেক মজুরের হাতে হাজারতিনেক টাকা হাতখরচ দিয়ে তাঁদের দেশে পাঠিয়েছিলেন। তখন 'শ্রমিক স্পেশাল' ট্রেন চালু হয়েছিল। দিল্লিবাসী পাপ্পন বহু চেষ্টাতেও সেই ট্রেনে মজুরদের জায়গা করে দিতে পারেননি। তাই প্লেনের ব্যবস্থা। পাটনা থেকে মজুরদের সহস্র জেলায় যাওয়ার জন্য একটি বাসও বুক করে দেন তিনি। আইএএনএস নিউজ এজেন্সির তথ্য বলছে, স্বয়ং মাধুরী দীক্ষিত পাপ্পন সিংহ গেহলটের গল্প শুনিয়েছিলেন একটি রেডিও শো-তে। পাপ্পনের নিঃস্বার্থ সাহায্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরে অগাস্ট মাসে শ্রমিকদের দিল্লি ফিরিয়ে আনতেও লাখখানেক টাকা খরচ করেছিলেন তিনি।
নবীন রাম নামে পাপ্পনের এক মজুর জানিয়েছেন, "আমরা যদি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতাম (ফেরার সময়) তাহলে এ-বছর মাশরুম চাষ করা যেত না। অগাস্টে শুরু হয় এই চাষ। সমস্যার কথা মালিককে জানাতেই উনি বললেন চিন্তা নেই। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। প্লেনে করে আমাদের ফেরার ব্যবস্থা করবেন, যাতে দেরি না হয়।" পাপ্পনের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট আর আত্মহত্যা একেবারেই খাপ খায় না। বরং মে মাসেই ট্যুইট করেছিলেন, "কখনও আশা ছাড়তে নেই, কারণ জীবনে মিরাকল হয়েই থাকে।" এমন সদাহাস্যময় শত্রুহীন ব্যক্তিত্ব কেন হঠাৎ আত্মহত্যা করলেন? প্রশ্ন সবারই।
















