লকডাউনে ঘরছাড়া শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়েছেন প্লেনে করে, নিজেই কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তিনি?

মে মাসেই ট্যুইট করেছিলেন, "কখনও আশা ছাড়তে নেই, কারণ জীবনে মিরাকল হয়েই থাকে।" এমন সদাহাস্যময় শত্রুহীন ব্যক্তিত্ব কেন হঠাৎ আত্মহত্যা করলেন?

Sindhu Som
৩ মিনিট
লকডাউনে ঘরছাড়া শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়েছেন প্লেনে করে, নিজেই কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তিনি?

২৪ অগাস্ট, ২০২২। দিল্লির একটি মন্দিরে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে তাঁর দেহ। তাঁর নাম পাপ্পন সিং গেহলট। বয়স ৫৫। লকডাউনের সময় একটি বিশেষ কাজের জন্য নজর কেড়েছিলেন এই কৃষক। দেশে হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণার ফলে সবথেকে বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। কৃষিক্ষেত্রেও এমন প্রচুর শ্রমিক কাজ করে থাকেন, যাঁদের নিজস্ব জমি নেই। কোনও বড় চাষির জমিতে মজুরি করে দিন গুজরান। পাপ্পনের অধীনেও এমন বেশ কিছু শ্রমিক কাজ করতেন, যাঁরা লকডাউনের ফলে অত্যন্ত অসুবিধায় পড়েন। হাজার হাজার লোক তখন পায়ে হেঁটে দেশের বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। একধাক্কায় কাজ চলে গিয়েছে অনেকেরই। শহরে জীবন নির্বাহ করার খরচ বেশি, অথচ রোজগার নেই। এজন্যই দেশে ফেরা। পাপ্পন নিজে প্লেনের টিকিট কেটে তাঁর অধীনে কাজ করা শ্রমিকদের গ্রামে ফিরতে সাহায্য করেছিলেন। আর সেই কাজের জন্যই লাইমলাইটে চলে আসেন তিনি। কিন্তু উপকৃত মজুরদের দোয়া তাঁকে বোধহয় ছুঁতে পারেনি।

আলিপুর অঞ্চলে থাকতেন পাপ্পন। তাঁর বাড়ির সামনেই একটি মন্দির। পুলিশ রিপোর্ট মোতাবেক সেই মন্দিরেরই একটি সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে তাঁকে। দেহ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাতে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে নিজের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন পাপ্পন। মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা রয়েছে এখনও। দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তদন্ত জারি রেখেছে আপাতত। কোভিডে যিনি মজুরদের বাড়ি যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন, করোনার উৎপাত থিতু হলে তিনিই ফের নিজের পয়সায় টিকিট কেটে মজুরদের কাজে ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন। মানুষটিকে অত্যন্ত ভদ্র, নম্র মানুষ বলেই জানত পাড়া প্রতিবেশীরা। শত্রু বলতেও ছিল না কেউ বিশেষ। এমতাবস্থায় পরিবার পর্যন্ত কাউকেই সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত করতে পারেনি। কাজেই আপাতত আত্মহত্যা বলেই মনে করা হচ্ছে এই মৃত্যুকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
করোনার পর কোন ভাইরাস? অতিমারীর ভয়াল দিন ফেরাচ্ছে জলবায়ুর ভোলবদল?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আশঙ্কা থাকছে অনেক মানুষের গৃহহীন হওয়ার। সেই সংখ্যার মধ্যে অনেকেই জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিনত হবেন, বাধ্য হবেন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে।

আত্মহত্যা হিসেবেই যদি আপাতত ধরে নেওয়া হয়, ভারতের প্রেক্ষিতে তা খুব নতুন কিছু কি? কী বলছে এনসিআরবি-র নথি? একথা ঠিক, গত শতকের শেষ কয়েক দশকের থেকে নতুন শতকে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা কিঞ্চিৎ কমেছে। কিন্তু ভারতের মতো জনবহুল দেশে তাও খুব একটা কম না। আর মানুষের তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওজন কেবলমাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে না মাপাই ভালো। কোভিডের ফলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতের অর্থনীতি। এ-সময় কৃষিক্ষেত্রটি ভারতের অর্থনীতিকে সজীব করতে সাহায্য করেছে অনেকখানিই। অথচ ২০১৯-এর থেকে ২০২০-তে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা। কৃষক অর্থে কৃষিমজুর। তাঁদের আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ১৮%। এক বছরে এই বৃদ্ধি অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং মারাত্মক।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যগুলির মধ্যে কৃষক আত্মহত্যা সবথেকে বেশি মহারাষ্ট্রে, গড়ে বছরে ৪০০৬টি। এরপরে রয়েছে কর্নাটক- ২০১৬টি, অন্ধ্রপ্রদেশ- ৮৮৯টি, মধ্যপ্রদেশ- ৭৩৫টি এবং ছত্তিশগড়, ৫৩৭টি। সর্বমোট ১০৬৭৭ জন কৃষিমজূর আত্মহত্যা করেছিল সে-বছর। করোনাকালে আত্মহত্যার হার বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বটে, তবে তার আগের বছরেও মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্র ও মধ্যপ্রদেশে আত্মহত্যার হার সবথেকে বেশি। অস্বীকার করার উপায় নেই, ভারতে কৃষক আত্মহত্যা বর্তমানে একটি অতি-সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা ভারতীয়দের যৌথমানসে আর তেমন দাগ কাটে না আজকাল। অথচ পঙ্গু, ভারতীয় অর্থনীতির ভার বহন করে চলেছে কৃষকরাই।

পিটিআই রিপোর্ট বলছে, ৬৮,০০০ টাকা খরচ করে প্লেনের টিকিট কেটেছিলেন পাপ্পন তাঁর মজুরদের জন্য। প্রত্যেক মজুরের হাতে হাজারতিনেক টাকা হাতখরচ দিয়ে তাঁদের দেশে পাঠিয়েছিলেন। তখন 'শ্রমিক স্পেশাল' ট্রেন চালু হয়েছিল। দিল্লিবাসী পাপ্পন বহু চেষ্টাতেও সেই ট্রেনে মজুরদের জায়গা করে দিতে পারেননি। তাই প্লেনের ব্যবস্থা। পাটনা থেকে মজুরদের সহস্র জেলায় যাওয়ার জন্য একটি বাসও বুক করে দেন তিনি। আইএএনএস নিউজ এজেন্সির তথ্য বলছে, স্বয়ং মাধুরী দীক্ষিত পাপ্পন সিংহ গেহলটের গল্প শুনিয়েছিলেন একটি রেডিও শো-তে। পাপ্পনের নিঃস্বার্থ সাহায্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরে অগাস্ট মাসে শ্রমিকদের দিল্লি ফিরিয়ে আনতেও লাখখানেক টাকা খরচ করেছিলেন তিনি।

নবীন রাম নামে পাপ্পনের এক মজুর জানিয়েছেন, "আমরা যদি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতাম (ফেরার সময়) তাহলে এ-বছর মাশরুম চাষ করা যেত না। অগাস্টে শুরু হয় এই চাষ। সমস্যার কথা মালিককে জানাতেই উনি বললেন চিন্তা নেই। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। প্লেনে করে আমাদের ফেরার ব্যবস্থা করবেন, যাতে দেরি না হয়।" পাপ্পনের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট আর আত্মহত্যা একেবারেই খাপ খায় না। বরং মে মাসেই ট্যুইট করেছিলেন, "কখনও আশা ছাড়তে নেই, কারণ জীবনে মিরাকল হয়েই থাকে।" এমন সদাহাস্যময় শত্রুহীন ব্যক্তিত্ব কেন হঠাৎ আত্মহত্যা করলেন? প্রশ্ন সবারই।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।