বাঙালি শহিদদের রক্তে রাঙা সেলুলার জেল, সিনেমা হার মানবে অত্যাচারের সেই গল্পের কাছে
সেলুলার জেলের ফলক থেকে বাঙালি বিপ্লবীদের নাম মুছে ফেলার অর্থ, কালাপানির অন্ধকারে যে বিপ্লবীদের যন্ত্রণা লুকিয়ে রয়েছে, তাঁকে আজ স্মরণ করতে বাধা দেওয়া।

সমুদ্রের সুনীল আবহে মনমাতানো আন্দামানের প্রাকৃতিক শোভা মন ছুঁয়ে যায়। আশমানি নীল গাঢ় হয়ে ধরা দেয় চোখের তারায়। আন্দামানের বুকে পোর্ট ব্লেয়ার বহন করছে সেলুলার জেলের শিউরে ওঠা ইতিহাসগাথা। এখানে এলে ছুঁয়ে যেতে হয় ব্রিটিশদের তৈরি সেই ভয়ংকরতাকে, যা এক মুহূর্তে পৌঁছে দেয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কালে, যেখানে কত বিপ্লবীর প্রাণ গেছে 'কালাপানি’-র কালো অন্ধকারে! কত বিপ্লবীর জীবন এখানকার 'নরকে' কেটেছে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেলুলার জেলের ফলক থেকে উধাও বহু বাঙালি বিপ্লবীর নাম! কে বা কারা এই ইতিহাস বিকৃতির পিছনে, তা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে।
সেলুলার জেলের অপর নাম 'কালাপানি’। ভারতের আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত এই কারাগার। আজ থেকে বহু বছর আগে এটি তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধর বহু আগে থেকেই ব্রিটিশদের দ্বারা তৈরি হয়েছিল এই কালাপানি বা সেলুলার জেল। মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেফতারের পর পাঠানো হতো এই ভয়ংকর কারাগারে। এক অন্ধকূপের মতো কারাগার। একজন বন্দির পক্ষে একটা কক্ষে হাত-পা ছড়ানোর মতো জায়গা ছিল না। তার ওপর এর গায়ে লেগে রয়েছে নৃশংস অত্যাচারের আখ্যান। প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেকটা মুহূর্ত বন্দিদের কাছে খুব ভয়ংকর ছিল। কেন আজও সেলুলার জেলের কথা শুনলে শিউরে উঠতে হয়?
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পোর্টব্লেয়ারে অবস্থিত সেলুলার জেল এখন একটি জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এখানকার সমুদ্রের জল খুবই গভীর এবং কালো রঙের হওয়ার কারণে জেলকে আবার কালাপানিও বলা হয়।
সেলুলার জেল নির্মাণ
১৮৯৬ সালে সেলুলার জেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এবং ১৮৯০ সালের লায়ল-লেথব্রিজ কমিশনের পরামর্শে ১৯১০ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। সেলুলার জেলের নির্মাণে ব্যবহৃত ইটগুলি বর্মা থেকে আনা হয়েছিল, যা আজকে মায়ানমার নামে পরিচিত।
এই সেলুলার জেলের প্রতিটি ইটে রয়েছে প্রতিরোধ, কষ্ট ও ত্যাগের হৃদয়গ্রাহী গল্প। সেসময় যেসব দেশপ্রেমিক ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন, তাঁদের জেলে পাঠানো হতো। জেলেই অনেক বিপ্লবীর মৃত্যুও হয়েছিল। কারগারটি ৭টি উইং-সহ ৩টি তল নিয়ে তৈরি। কারাগারের নির্মাণ এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি উইংয়ের সামনের অংশটি অন্য উইংয়ের পিছনের দিকের মুখোমুখি ছিল। যাতে কারারুদ্ধ থাকাকালীন কোনও বন্দী একে অপরকে দেখতে না পান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অনেক অজানা নাম আজও ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে আছে, যাঁরা দেশের জন্য প্রাণপাত করেছিলেন।
সেলুলার জেলে বন্দিদের জীবন
রাত্রিবেলায় বন্দিরা যাতে আরাম করার সুযোগ না পান, সেইদিকে নজর রাখত পেয়াদারা। কারও ঘুমে চোখ বুজে এলে পেটে বল্লমের খোঁচা। রাতে যে পাত্র মলমূত্র ত্যাগ করার জন্য দেওয়া হতো, তা এত ছোট যে, তাতে একবারও মলমূত্র নিঃসরণ করা যেত না। অপরিষ্কার কুঠুরি। অর্থাৎ বন্দিদের শাস্তির কৌশল কোনও পরিভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না।
সেলুলার জেলের তৎকালীন বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক বন্দি হলেন- বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র দাস কানুনগো, উল্লাসকর দত্ত, ইন্দুভূষণ রায়, বিভূতিভূষণ সরকার, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল, সুধীনকুমার সরকার, অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং বীরেন্দ্রচন্দ্র সেন। ১৯০৯ সালের পর এই সমস্ত বন্দিকে আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়েছিল।
বিনায়ক দামোদর সাভারকরকে ৪ জুলাই, ১৯১১ সালে আন্দামানে পাঠানো হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে। তিনি যখন সেলুলার জেলে আসেন , তখন তাঁর বড় ভাই গণেশ সাভরকর সেখানে আগে থেকেই ছিলেন। কিন্তু সাভারকর ভাইরা এক জেলে থেকেও এই কথাটি জানতে পারেননি।
বন্দিদের গণ-অনশন
বন্দিরা খুব অত্যাচারিত হলে গণঅনশন করতেন। জেলের কর্মীরা অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিত। যখন তাঁরা অত্যাচার সহ্য করতে পারতেন না, জেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। জেলের মধ্যে গণ-অনশন, ধর্মঘট। বিশেষ করে ১৯৩২ থেকে ১৯৩৭ সালে এইরকম ঘটনা বেশি ঘটে। ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে শেষ ধর্মঘট শুরু হয়। চলে ৪৫ দিন।
এরপর ১৯৩৮ সালের জানুয়ারি মাসে এই সেলুলার জেলের রাজনৈতিক বন্দিদের নিজ নিজ রাজ্যে ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৩৯ সালে এই জেল খালি করতে বাধ্য করা হয়।
কালাপানি নিকষ কালো অন্ধকারের গল্প বললেও এর ইতিহাস বিকৃতির এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে সম্প্রতি। সেলুলার জেলের ফলক থেকে বাঙালি বিল্পবীদের নাম উধাও! কালাপানির ইতিহাসেও সেই আমরা-ওরা গল্প!
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে যাঁদের, বেশ কয়েকটি পাথরের ফলকে তাঁদের নাম খোদাই করে বসানো হয়েছিল আন্দামানের সেলুলার জেলে। তবে সম্প্রতি নজরে আসে, সংকুচিত হয়ে গেছে এই তালিকা। আন্দামানের সেলুলার জেল একসময় ঠিকানা হয়ে উঠেছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ১৮৯৬ সালে এই জেল নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তার বহু আগে থেকে (সিপাহী বিদ্রোহের সময় থেকে) আন্দামানকে বন্দিখানা হিসেবে ব্যবহার করত ব্রিটিশরা। দীপক রায় নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে সেলুলার জেলের নয়া তালিকার ছবি তুলে ধরেন। সেই নতুন ফলকগুলিতে রয়েছে মাত্র ৫১৩ জন বিপ্লবীর নাম। তাঁর মন্তব্যে উঠে আসে, এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে চার শতাধিক বিপ্লবীর নাম। এই তালিকা প্রকাশ্যে আসার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। দীপবাবুর মতে, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অধিকাংশ বাঙালি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সারা ভারত থেকে সেলুলার জেলে পাঠানো হতো বন্দিদের, তাতে সন্দেহ নেই। তবে বাংলা, বিহার এবং আন্দামানের বিচারব্যবস্থা অনেকটা নির্ভরশীল ছিল কলকাতা হাই কোর্টের ওপর। ফলে বাঙালিদের এই জেলে দ্বীপান্তর করার প্রবণতাও সেই সূত্রে ছিল বেশি।
এখন প্রশ্ন হলো, কালাপানির ফলক থেকে ইতিহাস মুছে ফেলার এই অপচেষ্টার পিছনে কে বা কারা শামিল, তা কি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন নয়? সেলুলার জেলের ফলক থেকে বাঙালি বিপ্লবীদের নাম মুছে ফেলার অর্থ, কালাপানির অন্ধকারে যে বিপ্লবীদের যন্ত্রণা লুকিয়ে রয়েছে, তাঁকে আজ স্মরণ করতে বাধা দেওয়া। কালাপানির বুকে এটা কি কালা কানুনের নামান্তর?
















