আর দু'ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সমূহ সর্বনাশ! কী ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা

২১০০ সালের পর থেকে গ্রীষ্মকালে একটানা বহুদিন তাপপ্রবাহ চলা খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে ভারতের তিনটি রাজ‍্যে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
আর দু'ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সমূহ সর্বনাশ! কী ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা

আচ্ছা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলতে আপনি ঠিক কী বোঝেন? খুব সাধারণভাবে বললে, যখন কোথাও প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে গিয়ে বিপর্যয় ঘটে, সেই বিরল ঘটনাকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলা যায়। কিন্তু ভাবুন, এই বিরল ঘটনাই যদি বদলে গিয়ে হয়ে যায় নিয়মিত? তখন?

এই যে গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহ হয়, এটাকে স্বাভাবিকভাবে একটি বিপর্যয় হিসেবেই দেখা হতো, এখন তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু বছর আগেও তাপপ্রবাহ ছিল আমাদের দেশে একটি বিরল ঘটনা, এখন তা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একথা বানিয়ে বলা বা কল্পনাপ্রসূত নয়। Communications Earth & Environment-এর রিপোর্টে বলা হচ্ছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হওয়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার যদি শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের চেয়ে ২ ডিগ্রি বৃদ্ধিতেও না আটকানো যায়, তাতেও ভারতের বিভিন্ন স্থানে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং তাপপ্রবাহ বিরল নয়, বরং খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

রিপোর্টে বিশেষভাবে ভারতের তিনটি রাজ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান এবং গুজরাত। ২১০০ সালের পর থেকে গ্রীষ্মকালে একটানা বহুদিন তাপপ্রবাহ চলা খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে এই তিনটি রাজ্যে। এই একটানা তাপপ্রবাহের উদাহরণ কিছু দিন আগেই জানা গেছে। চিনে টানা এগারো সপ্তাহ ধরে তাপপ্রবাহ চলছে এবং সেই দেশের বৃহৎ সব নদী এবং হ্রদ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গোটা দেশ তীব্র জল, খাদ্য ও শক্তি-সংকটে ভুগছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিন শুকিয়ে কাঠ! হু হু করে বাড়ছে তাপমাত্রা, কীভাবে এই অবস্থা হলো ড্রাগনের দেশের

ছয় দশকে প্রথমবার তাপমাত্রা এত উর্ধ্বমুখী এবং গত এগারো সপ্তাহ ধরে চিন তাপপ্রবাহ দ্বারা আক্রান্ত।

যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দু'ডিগ্রিতে আটকানো না যায়, তাহলে এই তিন রাজ্যে তাপপ্রবাহ এবং খরা চলতে পারে মাসের পর মাস ধরে। এই তীব্র তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি থেকে ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকবে, যেখানে মানুষের পক্ষে নিজেদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক কাজ করাই দুষ্কর হয়ে পড়বে।

গবেষণা বলছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২০৫০ সালের মধ্যে তীব্র তাপমাত্রার দিন ছুঁতে পারে ১০০-তে। ২১০০ সালের মধ্যে তা আর বিভিন্ন প্রান্তে আটকে থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে গোটা দেশেই।

একইরকম একটি গবেষণা করা হয়েছিল ২০১৯ সালে। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সেই গবেষণাপত্রও যে খুব আশার কথা শুনিয়েছিল, তা নয়। তাঁরা বলেছিলেন, ২০২০ থেকে ২০৬৪ সাল পর্যন্ত ভারতে অন্তত দু'টি তাপপ্রবাহ হবে এবং তা চলবে ১২-১৮ দিন ধরে। দেশের দক্ষিণ প্রান্ত, যেখানে এই ধরনের তাপপ্রবাহ বেশ বিরল, তারাও তাপপ্রবাহের রোষ থেকে রেহাই পাবে না।

আমরা যদি এই বছরের পরিসংখ্যানই দেখি, তাহলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ এবং এপ্রিলে ভারত ঐতিহাসিক তাপপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের কিছু প্রান্ত প্রত্যক্ষ করেছে গত ১২২ বছরে সবথেকে উষ্ণ এপ্রিল। রাজ্য হিসেবে যদি দেখা যায়, তাহলে আমরা দেখতে পাব, উত্তরাখণ্ডে ২৮ দিন, রাজস্থানে ২৬ দিন, পাঞ্জাব এবং হরিয়ানাতে ২৪ দিন, ঝাড়খণ্ডে ১৮ দিন এবং দিল্লিতে ১৭ দিন তাপপ্রবাহ চলেছে এই বছর। গত কয়েক দশকে যা সর্বাধিক। শুধুমাত্র পাঞ্জাব এবং হরিয়ানাতেই গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে বারো গুণ। দেশের মাত্র তিনটি রাজ্যে তাপপ্রবাহ হয়নি। আসাম, হিমাচলপ্রদেশ এবং কর্নাটক। কিন্তু সেই রাজ্যগুলি দেখছে অতি বৃষ্টি এবং বন্যা। সেই সঙ্গে গড় তাপমাত্রাও এই তিন রাজ্যে বেড়েছে।

এই চরম উষ্ণ তাপমাত্রার সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। গ্রীষ্মকালে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা হবে ক্ষতিগ্রস্ত। সানস্ট্রোকে মৃত্যু হয়ে উঠবে সাধারণ ঘটনা। অনেক গবেষণা দাবি করছে যে, অত্যধিক গরম প্রভাব ফেলবে রাতের ঘুমে। দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই শীতাতপনিয়ন্ত্রক যন্ত্র নেই। যাদের আছেও, বা যাদের ক্রয় ক্ষমতা আছে তারা বেশি করে এই যন্ত্র ব্যবহার করবে। চাপ পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যহত হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, যা এখন হচ্ছে চিনে। তীব্র গরমেও মানুষ এসি চালাতে পারছেন না।

মনে হতেই পারে যে ২১০০ সালের কথা ভেবে কী করব? কিন্তু বর্তমান, নিজের ভবিষ্যৎ এবং নিজের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা একটু গভীরে গিয়ে ভাবলে দেখা যাবে যে, এই ধরনের গবেষণার পূর্বাভাসে নির্ধারণ করে দেওয়া সময় মেলেনি। ঘটনাগুলি ঘটছে, কিন্তু অনেক এগিয়ে এসেছে বিপদ। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই ইউরোপ, আমেরিকা, চিনে ঘটে যাওয়া সদ্য তাপপ্রবাহ এবং তার ফলে হওয়া খরার বিষয়ে জেনে নেওয়া যাবে। এই ভবিষ্যৎ কি আমাদেরও কাম‍্য?

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।