বাবা ঔরঙ্গজেব দু'দশক জেলবন্দি করে রেখেছিলেন, উপেক্ষিতা জেব-উন-নিসা আজও বিস্ময়

Aurangzeb daughter: শোনা যায়, জেব-উন-নিসা তাঁর ভাই আকবরের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখলে, সেই অপরাধে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে সালিমগড় দুর্গে আমৃত্যু কারারূদ্ধ করে রাখেন

Arunima Mukherjee
৪ মিনিট
বাবা ঔরঙ্গজেব দু'দশক জেলবন্দি করে রেখেছিলেন, উপেক্ষিতা জেব-উন-নিসা আজও বিস্ময়

পরনে সাদা পোশাক, অলংকার বলতে গলায় পরিহিত সাদা মুক্তার মালা। সোনা রূপোয় মোড়া চাকচিক্যময় মোঘল দরবারে এ যেন সাক্ষাৎ সরস্বতীর আনাগোনা। যার প্রবেশমাত্র মোঘল দরবার আলোকিত হত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্যুতিতে। ইতিহাসের বিরাট অঙ্কের পাতা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রক্তাক্তময়, শক্তিশালী মোঘল অধ্যায়ে যে প্রজ্ঞাশিখা সকলের দৃষ্টির অন্তরালেই থেকে গেছে, তিনি মোঘল সম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কন্যা, জেব-উন-নিসা।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের জ্যেষ্ঠ কন্যা হয়েও, তিনি ছিলেন পিতার একেবারে বিপরীতাভিমুখী। তাঁর জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে গেলে দিন ফুরিয়ে যাবে। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি গোটা কোরান মুখস্থ করে ‘হাফিজা’ তকমা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঔরঙ্গজেব কন‍্যার মেধায় এতই খুশি হয়েছিলেন যে, সেই সময়ে তিনি দুই দিনের জাতীয় ছুটি অবধি ঘোষণা করেছিলেন এবং কন‍্যাকে উপহার হিসাবে দিয়েছিলেন ৩০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা। শুধু তাই নয়, জেব-উন-নিশার শিক্ষিকা হাফিজা মারিয়ামকেও তিনি শিক্ষা দানের জন‍্য পুরস্কার বাবদ দিয়েছিলেন তিরিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা। ‘হাফিজা’ স্বীকৃতি লাভের পর রাজকুমারী জেব-উন-নিসাকে কলা এবং বিজ্ঞানে পারদর্শী করে তোলার উদ্দেশ্যে মোহম্মদ সাইদ আশরাফ মাজান্দারানি নামে এক পারসি কবিকে নিয়োগ করা হয়। কিছুদিনের মধ‍্যেই তিনি দর্শন, জ‍্যোতির্বিদ‍্যা, ইতিহাস, গণিত, ধর্মতত্ত্ব এবং সাহিত‍্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। খুব অল্পসময়ের মধ্যেই তিনি একজন অত‍্যন্ত দক্ষ ক‍্যালিগ্ৰাফার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। রাজকুমারীর চোদ্দ বছর বয়সে তিনি যখন পারসি কবিতার চর্চা করছিলেন, তখন তিনি তাঁর শিক্ষক দ্বারা কবিতা লেখার জন্য গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। এই সময় থেকেই তাঁর কবিতা লেখার হাতেখড়ি হয়।

সম্রাট ঔরঙ্গজেব সাহিত্য এবং শিল্পের বিশেষ অনুরাগী না হওয়ায়, সম্রাটের চোখ এড়িয়েই সেই সময়ে মোঘল দরবারে, গোপনে সাহিত্যিকদের সভা তৈরি হয়েছিল। সেই সভায় উপস্থিত থাকতেন বিখ্যাত সব জ্ঞানীগুণী কবি, সাহিত্যিকরা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গানি কাশ্মীরি, নাইমাতুল্লা খান এবং আকিল খান প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ। কবিতা এবং শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগে, সমস্ত পর্দা প্রথার অবসান ঘটিয়েই জেব-উন-নিসা ক্রমে এই গোপন সভার একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠেছিলেন। আবার অন্য সূত্রে জানা যায়, সেইসময়ের একজন পণ্ডিত এবং মোঘল দরবারের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শাহ রুস্তম গাজী, রাজকুমারীর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে অনুরোধ করেন জেব-উন-নিসাকে সেই সভায় যেতে অনুমতি দেওয়ার এবং তাঁর অনুরোধেই ব্যাতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি তাঁকে কবি, সাহিত্যিকদের সাহিত্যে সভায় অংশগ্রহণে অনুমতি দিয়েছিলেন।

তাঁর সাহিত্যচর্চা যে এইখানেই সীমিত ছিল তা নয়। বরং তিনি তাঁর প্রাপ্ত অর্থের বেশিরভাগই ব্যয় করতে শুরু করলেন শিল্প এবং সাহিত্যের কাজে। শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, জানা যায় সেইসময় সম্ভবনাময় অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্য কর্ম প্রকাশ করার জন্য তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সাহিত্য ভাণ্ডারকে আরও নতুন নতুন সাহিত্যের দ্বারা সম্মৃদ্ধ করে তোলা এবং একই সাথে সুযোগ থেকে বঞ্চিত সেইসব সম্ভবনাময় সাহিত্যিকদের এক পরিচয় দান করা। এখানেই থেমে না থেকে, তিনি লেখক, লিপিকার এবং বিভিন্ন জ্ঞানী মানুষদের একত্রিত করে বিশেষ একটি সাহিত্য বিভাগ শুরু করেছিলেন। এই বিভাগে বিভিন্ন সাহিত্যকেরা তাঁদের নিজেদের লেখা এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রসিদ্ধ সাহিত্য কর্মগুলির অনুবাদকার্য সম্পাদনা করে থাকতেন। শোনা যায়, তিনি সম্পূর্ণ নিজের খরচে মোল্লা সাফলুদ্দিন আদবেলিকে কাশ্মীরে পাঠিয়েছিলেন ‘তাপসির-ই-কবির’ (Tafsir-i-kabir) অনুবাদের জন্য। এই ‘তপসির-ই-কবির’ ছিল কোরানের এক ব্যাখ্যা, অনেকে বলেন এই ব্যাখ্যা স্বয়ং জেব-উন-নিসা-ই রচনা করেছিলেন। তিনি ‘মাখফি’ (makhfi, means a hidden one) ছদ্মনাম ব্যবহার করে নিজের রচনা কার্য চালাতেন। তাঁর এই ছদ্মনামের মধ্যে সুফি বিশ্বাসের খোঁজ মেলে। জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য সাহিত্য রচনা করে গেছেন। তাঁর রচিত, পাঁচ হাজার কবিতা নিয়ে সংকলিত বই ‘ দেওয়ান-ই-মাখফি’ ছাড়াও আরও তিনটি বইয়ের কথা জানা যায়। সেগুলি হল, ‘মনিস-উল-রো’, ‘জেব-উল মনসাদ’, ‘জেব-উল-তাপসির’। এছাড়াও তিনি কয়েকশো গজল রচনা করেছিলেন।

জেব-উন-নিসা-র অন্য এটি দিক উল্লেখ না করলেই নয়। ঔরঙ্গজেব ক্ষমতায় বসার পর তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বিভিন্ন যুদ্ধ দমন করার মধ্যে দিয়েই। শাহজাহানের চার পুত্রের মধ‍্যে শুরু হয় সিংহাসন আরোহনের বিবাদ শুরু হলে এবং ক্রমে তা রক্তাক্ত সংঘর্ষে পরিণত হলে, ঔরঙ্গজেব মোঘল সিংহাসনের প্রথম দাবিদার দারাশুকোকে ১৬৫৯ সালে এবং তাঁর পুত্রকে ১৬৬২ সালে হত্যা করেন । ঔরঙ্গজেবের অন‍্য দুই ভাই‌ও তাঁর হাতে প্রাণ হারান। সমস্ত ভাইদের হত্যা করে তিনি মোঘল সিংহাসনে আসীন হয়ে কন্যা জেব-উন-নিসাকে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক বিষয়ে পরামর্শদানের জন্য নিযুক্ত করেন। মোঘল সাম্রাজ্য এ ঘটনা বিরল।

কিন্তু এতকিছুর পরেও রাজকুমারীর জীবনের শেষ কুড়ি বছর কেটেছিল কারান্তরালে। একসময় তাঁর প্রিয় ভাই এবং সম্রাটের পুত্র আকবর, সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শোনা যায়, জেব-উন-নিসা তাঁর ভাই আকবরের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখলে, সেই অপরাধে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে সালিমগড় দুর্গে আমৃত্যু কারারূদ্ধ করে রাখেন, এমনকী তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। জেব-উন-নিশা কোনও বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হননি, কবিতাই ছিল তাঁর প্রথম এবং শেষ ভালবাসা এবং তাই জীবনের শেষ দিন অবধি আল্লাকে উৎসর্গ করে তিনি কবিতা রচনার কাজ চালিয়ে গেছিলেন। অবশেষে ১৭০২ সালে কারারুদ্ধ অবস্থায় তিনি প্রাণত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র-

  • দ্যা হেরিটেজ ল্যাব ডট ইন

  • ওয়াইজমুসলিমওম্যান ডট ওআরজি

  • সানডেগার্ডিয়ান লাইভ ডট কম

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।