দেবদর্শনের আশায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে! শবরীমালা মন্দিরে প্রাণ গেল ১১ বছরের কিশোরীর
Sabrimala Temple: লম্বা লাইনের কোনও একটি প্রান্তে বাবা-মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল একরত্তি মেয়েটা। শরীরে বাসা বেঁধেছে মারাত্মক অসুখ।

সেই শবরীমালা মন্দির। বছর কয়েক আগে নানাবিধ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কেরলের এই মন্দিরটি। রজস্বলা মেয়েদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার ছিনিয়ে আনতে কম লড়াই হয়নি। আইনআদালত করেও ভাঙা যায়নি সেই ট্যাবু। আজও রজস্বলাদের ঢুকতে দেওয়া হয় না সেই মন্দিরে। এবার সেই মন্দিরে পুজো দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যু হল বছর এগারোর এক কন্যার।
মাত্র বছর তিনেক বয়স তখন। সে সময় হৃদযন্ত্রে সমস্যা ধরা পড়ে শিশুটির। বিগ্রহদর্শন করলেই সারবে সমস্ত অসুখ, সেই আশাতেই মন্দিরে সকাল থেকে লাইন দিয়েছিল এগারো বছরের ওই মেয়েটির অভিভাবক। সঙ্গে ছিল খুদে শিশুটি। কিন্তু সেই মন্দিরই যে তার কাল হবে ঘুনাক্ষরেও ভাবেননি পরিবারের কেউ।
কিছুদিন ধরেই মারাত্মক ভিড় হচ্ছে শবরীমালা মন্দিরে। দূরদূরান্ত থেকে বিগ্রহদর্শনে আসেন ভক্তেরা। মন্দিরের ভিড়, লাইন সামলাতে হিমশিম অবস্থা মন্দির কর্তৃপক্ষের। বহু দর্শনার্থীকেই আঠেরো থেকে কুড়ি ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে লাইনে। স্বাভাবিক ভাবেই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে দর্শনার্থীদের। দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা। কেউ ব্যারিকেড পেরোচ্ছেন লাফিয়ে, কেউ জুড়ছেন চেঁচামেচি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Justice DY Chandrachud: দেশের শীর্ষ আদালতের ৫০তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে চূড়ান্ত হয়ে গেল ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নাম, ফিরে দেখা তাঁর কেরিয়ার।

এমনই পরিস্থিতির মধ্যে লম্বা লাইনের কোনও একটি প্রান্তে বাবা-মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল একরত্তি মেয়েটা। শরীরে বাসা বেঁধেছে মারাত্মক অসুখ। বিগ্রহ দর্শন করলেই যে সমস্ত রকমের রোগভোগ থেকে মুক্তি মিলবে, এমন সরল বিশ্বাস নিয়েই অসুস্থ মেয়েটিকে নিয়ে মন্দিরে লাইন দিয়েছিলেন বাবা-মা। আর সেখানেই ঘটল বিপর্যয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mal River Flash Flood: নজরুল মঞ্চে সঙ্গীতশিল্পী কেকের মৃত্যুর পরে এই প্রশ্ন উঠেছিল ফের। অপর্যাপ্ত জায়গায়, অপরিমিত বন্দোবস্ত সত্ত্বেও নাছোড়বান্দা জনতার ভিড় সামলানোর পরিকাঠামো না থাকলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না
হঠাৎ করেই মাথা ঘুরতে শুরু করে মেয়েটির। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে থেকেই লুটিয়ে পড়ে একরত্তি। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা সেখানে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে। যে রোগ থেকে মুক্তির আসায় শবরীমালা মন্দিরের ওই দীর্ঘতর লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটি, সেই মন্দিরই প্রাণ কাড়ল খুদের। বিশ্বাস কিংবা অন্ধবিশ্বাসে ভর করে চিকিৎসাশাস্ত্রের কোনও কথায় কান না দিয়ে ওই ভিড়ভাট্টায় অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে এসে যে ভুল করেছিলেন অভিভাবকেরা, তার মাশুল দিল ১১ বছরের ছোট্ট মেয়েটি।

প্রতিবারই এই সময়টা ভিড় হয় শবরীমালা মন্দিরে। ভিড় ঠেকাতে, লাইনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতটা সম্ভব চেষ্টা করছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ, তবে তা সত্ত্বেও এই বিপুল ভক্তসমাগম যেন সামলানো যাচ্ছে না কিছুতেই। ইতিমধ্যেই এ নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছে কেরল প্রশাসন। মন্দিরে প্রবেশের বুকিংয়ে লাগাম টানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দশ হাজারের বেশি টিকিট কোনও ভাবেই অনলাইনে বুক করা যাবে না। এমনকী কমিয়ে দেওয়া হয়েছে অফলাইন বুকিংয়ের সংখ্যাও।
যে মন্দির একদিন রজস্বলাদের প্রবেশ রুখতে গিয়ে আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে উঠে এসেছিল, সেই মন্দিরের দেবীদর্শন করতে এসে বেঘোরে প্রাণ চলে গেল বছর এগারোর একটি অসুস্থ শিশুর। মন্দিরের ভিতরে রজস্বলাদের প্রবেশ অধিকার নিয়ে বিতর্কের নেপথ্যে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন একটি সংস্কার। তবে সংস্কার না বলে তাঁকে কুসংস্কার বলাই ভালো। যে দেবীর উপাসনা করা হয়, সেই দেবীও তো একজন মেয়ে। মন্দিরে রজস্বলাদের প্রবেশ নিষেধ, অথচ এই দেশেরই একটি প্রসিদ্ধ মন্দিরে মহাধূমধাম করে পালন করা অম্বুবাচী। চিকিৎসাশাস্ত্রের পরোয়া না করে, কেবলমাত্র মন্দিরে এসে প্রার্থনা করলেই সেরে যাবে মারণব্যাধি, এ হেন কুসংস্কারও কিন্তু আজকের ভারতে আজও চলে আসছে বহাল তবিয়তে। যার বলি হচ্ছে ১১ বছরের ওই মেয়েটির মতো আরও অজস্র শিশু, বৃদ্ধ ও মানুষ। কবে মিলবে এই অন্ধকার থেকে মুক্তি? না, তার উত্তর বোধহয় প্রশ্নের চেয়েও কঠিন।
















