কলকাতার প্রেমিক, পাকিস্তানের প্রেমিকা! ভালবাসা জুড়ে দিল দুই দেশকে

Cross-Border Love Story: মঙ্গলবার অমৃতসরের আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারত-পাক আন্তর্জাতিক বর্ডার পার করে ভারতে এসে পৌঁছেছেন জাভেরিয়া। ঢাকঢোল বাজিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান প্রেমিক সমীর।

Sohini Das
৩ মিনিট
কলকাতার প্রেমিক, পাকিস্তানের প্রেমিকা! ভালবাসা জুড়ে দিল দুই দেশকে

কথায় বলে, প্রেম নাকি 'আগ কা দরিয়া'। আর তা ডুব দিয়ে পার করাই দস্তুর। কিন্তু পাকিস্তানের মেয়ে জাভেরিয়ার কাছেও তাঁর এই প্রেম সেই আগুনের চেয়ে কিছু কম ছিল না। পাকিস্তানের মেয়ে ভালোবেসে ফেলেছিল ভারতীয় এক যুবককে। এক দেশের মানুষের সঙ্গে ভিনদেশের মানুষের বিয়ে হয় না কি আর! কিন্তু এ যে ভারত-পাকিস্তান। গত কয়েক দশকে যাঁদের সম্পর্ক সাপে আর নেউলের। যে দেশে ক্রিকেট টিম পাঠাতে পর্যন্ত রাজি হয় না ভারত, সে দেশের প্রেমিকার এদেশের ভিসা পাওয়া কি আর সহজ হবে।

না, সহজ ছিল না মোটেও। দু-দুবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন জাভেরিয়া। তবে হাল ছাড়েননি। প্রমাণ করে দিয়েছেন রূপকথা হয়। মঙ্গলবার আটারি ওয়াঘা সীমান্ত পার করে ভারতে এসেছেন পাকিস্তানের ডেরা ইসমাইলের বাসিন্দা জাভেরিয়া। পূরণ হয়েছে স্বপ্ন। কলকাতার বাসিন্দা সমীর খানের সঙ্গে আগামী জানুয়ারি মাসে গাঁটছড়া বাঁধতে চলেছেন জাভেরিয়া।

কলকাতার বাসিন্দা সমীরের সঙ্গে জাভেরিয়ার আলাপ বছর পাঁচেক আগে। মায়ের মোবাইলে জাভেরিয়ার ছবি দেখেই তাঁকে প্রথম দর্শনেই মন দিয়ে ফেলেন সমীর। সবে সবে তখন জার্মানি থেকে ফিরেছেন তিনি। একবাক্যে মাকে সমীর জানান, বিয়ে যদি করেন, এই মেয়েকেই করবেন। সমীরের মা পাকিস্তানে জাভেরিয়ার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। রাজি হয়ে যায় দুই পরিবারই। না, এ গল্পে অমরিশ পুরী ছিল না বটে, তবে সমীর-জাভেরিয়ার মিলনের পথে ছিল বিস্তর কাঁটা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পথের কাঁটা ভিসা, পাক প্রেমিকার গলায় ভার্চুয়াল মালা দিলেন ভারতীয় যুবক

Cross Border Love: দু-পক্ষের পরিবারই সাড়ম্বরে যোগ দিয়েছিল বিয়ের অনুষ্ঠান। ভার্চুয়াল হোক, তবু তো বিয়ে। অনলাইনে সব কিছু সারা হলেও আন্তরিকতার অভাব ছিল না কোনও পক্ষে।

ভারতে আসার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনে ভিসার আবেদন করেন জাভেরিয়া। কিন্তু লাভ হয়নি। হাইকমিশন ফিরিয়ে দেয় তাঁর আবেদন। একবার নয়, পর পর দু-বার। এর মধ্যেই আবার চলে এল করোনা। সমস্ত যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেল দু-দেশের মধ্যে। তাদের গল্পের হ্যাপি এন্ডিংয়ের পথটা ক্রমশ অস্পষ্ট হচ্ছিল। তবু আশা ছাড়েননি জাভেরিয়া। একদিন করোনা অতিমারির প্রভাব কমে। পৃথিবী ক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠে। ফের ভিসার আবেদন করেন জাভেরিয়া। বিস্তর লড়াইয়ের পর প্রসন্ন হন ভাগ্যদেবতা। কীভাবে যেন ভিসার আবেদনখানা গৃহীত হয়ে যায় এবার।

মঙ্গলবার অমৃতসরের আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারত-পাক আন্তর্জাতিক বর্ডার পার করে ভারতে এসে পৌঁছেছেন জাভেরিয়া। এত দূর পথ পেরিয়ে প্রেমিকা দেশে আসছে, আর প্রেমিক তাঁকে নিতে আসবেন না, তা আবার হয় নাকি! বাগদত্তা জাভেরিয়াকে নিতে ঢোল-বাজনা নিয়ে ওয়াঘা সীমান্তে হাজির হয়েছিলেন সমীর। রীতিমতো হইহই করে তাঁকে সেখানে স্বাগত জানান সমীর ও তাঁর পরিবার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভুলতে পারেননি নিজের প্রথম প্রেমিকাকে, এই শহরের নামে তাঁকে অমর করে গেলেন বিধান চন্দ্র রায়

D. Bidhan Chandra Roy: দুর্গাপুর, সল্টলেক, শকুন্তলা পার্কের মতো একাধিক টাউন তৈরি করা হলো কলকাতার আশেপাশে বেশ কিছু জায়গায়। সেরকম ভাবেই নদিয়ার রুজভেল্ট টাউন নতুন করে তৈরি করলেন ডঃ বিধান চন্দ্র রায়।

পরিবারের বাঁধায় কত ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত রাস্তা খুঁজে পায় না। যে দেশে সম্মান রক্ষার নামে খুনের প্রথা চলে আসে, সেখানে যে শুধুই এসবই ঘটে, তা নয়। মাঝেমধ্যে সেই পাথুরে জমিতে জাভারিয়া-সমীরদের মতো ভালোবাসার গাছে ফুলও ধরে। আর তা কেবল সিনেমায় বা বড়পর্দায় নয়, ঘটে বাস্তবেও। আর এমন রূপকথা সত্যি হওয়ার পর সমীর জানালেন, তিনি আপ্লুত। একই রকম খুশির ঝলক জাভেরিয়ার মুখেও। জানালেন, ভারতে ঢুকে থেকে সকলের কাছ থেকে এত ভালোবাসা পেয়েছেন, যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন, তাতে তিনি মুগ্ধ। এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এমনও হয়।

পাঁচ বছরের এই প্রেমে মাত্র তিন বার জাভেরিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছে সমীরের। দু-বার থাইল্যান্ডে ও একবার দুবাইতে। কিন্তু এ বার একটা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে চাইছিলেন পাত্র-পাত্রী দু'জনেই। বারবার সোশ্যাল ব্লগিং সাইট টুইটার তথা অধুনা এক্সে ভারত সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছেন যুগল। অবশেষে তাঁদের সেই কাতর আবেদনে সাড়া দিয়েছে দু-দেশই। আর তার জন্য ভারত ও পাকিস্তান, দু-দেশের প্রশাসনকেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুগল। সমীর জানান, তিনি যে ঠিক কতটা খুশি, তা তাঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ভারত সরকার এবং জনাব মকবুলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সমীর, তাঁদের ভিসা প্রক্রিয়ায় সাহায্য করার জন্য।

সামনের মাসেই চার হাত এক হতে চলেছে সমীর-জাভেলিয়ার। তার পর হাতে থাকতে চলেছে আরও কয়েকটা মাস। মোট পাঁচ মাসের ভিসা পেয়েছেন জাভারিয়া। ততদিন এ দেশেই থাকার কথা তাঁর। ততদিন নববধূকে কাছে পাবেন সমীর। তারপরে কী হবে, তা নিয়ে এখনই ভাবছেন না তাঁরা। আপাতত এই মুহূর্তটাকেই প্রাণ ভরে উপভোগ করতে চান তাঁরা। পাশাপাশি দুদেশের সরকারের কাছেই যুগলের আবেদন, বিয়ে করতে চায় এমন যুগলদের জন্য বিশেষ ভিসা তৈরি করা হোক। যাতে প্রেমের জন্য কাঁটাতার টপকাতে রক্তাক্ত না হতে হয় কোনও প্রেমিক বা প্রেমিকাকে। তবে আপাতত দুই পরিবারেই খুশির আমেজ। বিয়ের প্রস্তুতিও তুঙ্গে। দুই সংস্কৃতির দুই দেশের মেলবন্ধন বলে কথা। আয়োজন প্রচুর। জানা গিয়েছে, আফ্রিকা, স্পেন, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশ থেকে আসতে চলেছেন সমীরের বন্ধুবান্ধব। কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যতই যুজুধান হোক না কেন দুই দেশ, এই ধরনের রূপকথা বারবার হোক, এমনটাই বোধহয় চান দু-দেশের আমআদমির হৃদয়।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।