মৃত্যু স্পর্শ করতে পারে না এই শহরে! হাজার হাজার বছর ধরে যে রহস্য বয়ে বেড়াচ্ছে জ্ঞানগঞ্জ
Gyanganj — a city of immortals : সত্যিই কি অমরত্বের প্রত্যাশা মেটে এখানে, কেন বিজ্ঞানে ব্যাখ্যা মেলে না জ্ঞানগঞ্জের?

স্বর্গটা ঠিক কোথায়, সেই উত্তর জানা না থাকলেও কল্পনা করা যায় বই কি! যা কিছু অজানা, যা কিছু সুন্দর তার সঙ্গে মিলিয়েও নেওয়া যায় অচিরেই। হিমালয়, হল যেন ঠিক সেই অপরূপ সৌন্দর্য্যের আধার। যার পরতে পরতে রয়েছে রহস্য। হিমালয় নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, যত সাধু, সন্ন্যাসী সবার বাস নাকি হিমালয়ের চূড়ায়। এ জীবনের পরে অন্য একটা জীবনের সন্ধান যেখানে চলে নিয়ত। কিন্তু তা বলে সিদ্ধলাভ কি সত্যিই অমর করতে পরে মানুষকে? বিজ্ঞাপনের যুগে দাঁড়িয়ে এ যে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু পুরাণকে অস্বীকার ক্ষমতাও যে নেই! হিমালয় যেন চিরকালের রহস্যময়ী। কেউ এখানে জীবনকে জয় করার রাস্তা খুঁজে পায় পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে, কেউ আবার সংসারের মায়াকে অতিক্রম করে হিমালয়কেই বেছে নেন জীবনের অন্তিম পর্যায় হিসেবে।
প্রায় ২৪০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা হিমালয়, সারা বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে অনাদিকাল থেকেই। আবার হিমালয়ের যে অংশে মানুষের পদচিহ্ন আজও পড়েনি, সেখানেই লুকিয়ে আছে এমন সব রহস্য, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। বিজ্ঞানও হিমসিম খায় পুরাণ এবং বিশ্বাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে। ‘ইয়েতি’ ও ‘রূপকুণ্ড’ জনসমক্ষে চলে এলেও হিমালয়ের অন্তঃপুরে লুকিয়ে আছে এরকম আরও অনেক অজানা রহস্য। গল্পে অথবা কাব্যে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে ব্যাখ্যা মেলে না যার। এমনই এক অজানা রহস্য হল জ্ঞানগঞ্জ।
সুমন চাটুজ্যে তাঁর গানে লিখেছেন, “অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনও দাবী দাওয়া...”, কিন্তু মৃত্যুকে রুখে দিতে কে না চায়! অথচ জীবনের সবথেকে বড় সত্যিই হল মৃত্যু। আর এই মৃত্যুই নাকি মিথ্যা প্রমাণিত হয় হিমালয়ের গহীনে, জ্ঞানগঞ্জে। আজকের আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে এই কথা শুনতে খানিকটা অবাক লাগলেও বিজ্ঞানও ব্যাখ্যা দিতে পারেনি এর। হাজার হাজার বছর ধরেই রহস্য বয়ে বেড়াচ্ছে হিমালয়ের অন্তপুর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
The truth of Yeti: ব্রিটিশ অভিযাত্রী এরিক শিপটন এক রহস্যময় ছবি তুলেছিলেন। বলা হয়, ইয়েতির পায়ের ছাপ ছিল সেটি!
হিমালয়ের দুর্গম স্থানে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যময় নগররাষ্ট্র হল এই জ্ঞানগঞ্জ। বরফের চাদরে ঢাকা তিব্বতের রহস্যময় ঘেরাটোপে যার অবস্থান। তিব্বতে এই নগররাষ্ট্রটিকে বলা হয়ে শাম্বালা। আর ভারতে বলা হয় জ্ঞানগঞ্জ বা সিদ্ধাশ্রম। যদিও বিজ্ঞানের সত্যি এখানে আজও অধরা তাই ইতিহাসের সত্যিটুকুই মেনে নিতে হয়। আর সেই সত্যিই আমাদের জানায়, এই নগররাষ্ট্রে প্রবেশ করার অধিকার নেই সাধারণ মানুষের। এই জ্ঞানগঞ্জই হল সেই প্রত্যাশিত অমরলোক। মৃত্যু এখানে স্পর্শ করতে পারেনা কাউকেই। চেতনা জাগ্রত থাকে সর্বদাই। এমনকী এখানে বসবাসকারী সন্ন্যাসীদের নাকি বয়সও বাড়ে না, কাল চক্র এখানে গতিহীন।
কথিত আছে, হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চকোটির যোগী, সাধু, ঋষি, মুনি ও সিদ্ধপুরুষরাই কেবলমাত্র জ্ঞানগঞ্জে বসবাস করতে পারেন। তবে কেবল সিদ্ধপুরুষ নন, যাঁরা জীবনে একটিও পাপ করেননি, কেবলমাত্র সেইসব সিদ্ধপুরুষরাই সর্বোচ্চ জ্ঞানলাভ করার জন্য এই আধ্যাত্মিক নগরীতে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করতে পারেন নাকি। বিশ্বাস করা হয়, এই গ্রহের সর্ব্বোচ জ্ঞানের আধার এই নগরী। সেই থেকে এমন নাম জ্ঞানগঞ্জ। এই জ্ঞানই নাকি পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করে!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Duryodhana Temple Kerala: এই মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই। ভিতরে গেলে কেবল একটি উঁচু মঞ্চ দেখতে পাওয়া যায় যাকে বলা হয় মণ্ডপম বা আলথারা।
রহস্যময় জ্ঞানগঞ্জ, যার কথা প্রথম লোকসমক্ষে আসে ১৯৩৩ সালে জেমস্ হিলটনের লেখা ‘লষ্ট হরাইজন’ বইটির মাধ্যমে। গহীন হিমালয়ের কোলে গিরিখাতের দুর্গমতম প্রদেশে গিরিবর্ত্মের আড়ালে একটি চিরসবুজ উপত্যকা ফুলের মত ফুটে আছে, এটিই প্রত্যাশিত অমৃতলোক। তবে সাধারণের কাছে নিষিদ্ধ, রহস্যে ঘেরা এই উপত্যকায় আজও পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারেনি। সেনানায়ক, গুপ্তচর, প্রকৃতিপ্রেমিক থেকে শুরু করে পর্বতারোহী, সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রী উত্তর অক্ষরেখার মাঝে অবস্থিত এই আশ্চর্য ভূমি, যার নাম শাংগ্রীলা ঘাঁটি। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে লেখা হিলটনের ‘দ্য লষ্ট হরাইজন’ উপন্যাসটি এই আশ্চর্য উপত্যকার প্রেক্ষাপটে রচিত। ১৯৩৩ সালে উপন্যাসটি চলচিত্রে রূপায়িত হওয়ার পর শাংগ্রীলাকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল তুঙ্গে ওঠে।
কেউ বলেন বৈদিক যুগের সৃষ্ট, কেউ আবার বলেন পৌরাণিক যুগে, তিব্বত ভুমিতে একুশ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এই জ্ঞানগঞ্জে রয়েছে ১১ টি মঠ। আমাদের ভারতের উত্তরদিকের শেষপ্রান্ত গাড়োয়াল হিমালয় এবং তিব্বতের মধ্যবর্তী এক বিশাল তুষারক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত এই সিদ্ধাশ্রম জ্ঞানগঞ্জ। পারঙ্গম এবং বেনারস ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিয়ান মহামহোপাধ্যায় ডঃ গোপীনাথ কবিরাজ মহাশয়ের লেখনী থেকে জানা যায়, এই অঞ্চলের বর্ণনা। জ্ঞানগঞ্জে প্রবেশের মাত্র দুটি পথ, একটি পাঞ্জাবের গোনা হয়ে এবং অন্যটি গাড়ওয়াল হিমালয় প্রান্তে অবস্থিত ভারতের শেষ গ্রাম মানা হয়ে।
জ্ঞানগঞ্জের সৌন্দর্য নিয়ে উল্লেখ মেলে পুরাণে। রামায়ণ এবং মহাভারতে রয়েছে হদিশ।যদিও লোকচক্ষুর আড়ালে এমনকী সময়ের স্রোতে ভেসে আলোচনারও আড়ালে চলে গিয়েছে এই শহর। হিমালয়ের এক গুপ্ত পুরী এই স্থান। সিদ্ধ-হ্রদ নামে পরিচিত একটি সুবিশাল হ্রদকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছে এই নগররাষ্ট্রটি। এখানে রয়েছে সুদৃশ্য বাড়ি ও প্রাসাদ, যেগুলি বর্ণময় পাথর দিয়ে তৈরি। বাড়ি ও প্রাসাদের দেওয়ালগুলিতে খোদাই করা আছে জ্ঞানগঞ্জের প্রতীক। যে প্রতীকে দেখতে পাওয়া যায় আট পাপড়ি যুক্ত একটি পবিত্র পদ্মফুলকে। আর এই পদ্মটিকে ঘিরে আছে তুষারাচ্ছাদিত পর্বতমালা। পদ্মের মাঝখানে ঝলমল করছে অতীব উজ্জ্বল একটি স্ফটিক। এটাই জ্ঞানগঞ্জের মূল আকর্ষণ।
তবে রহস্যের জট এখনও ছাড়েনি, মনে করা হয় দিনের বিভিন্ন সময় বদলে যায় এখনকার পরিবেশ। এ যেন ঠিক গিরগিটি সদৃশ, বিপদ বুঝেই রং বদলে ফেলে নিজের। আর মিশে যায় প্রকৃতির সঙ্গে। সেভাবেই হিমালয়ের বুকে প্রকৃতির রঙের মধ্যে হারিয়ে যায় জ্ঞানগঞ্জ। হারিয়ে যায় বলেই আড়ালে চলে যায় লোকচক্ষুর। বিজ্ঞানও হদিশ দিতে পারে না এই হারিয়ে যাওয়া শহরটির, এমনকী স্যাটেলাইটও খুঁজে পায় না কোনও অস্তিত্ব। অথচ অসংখ্য হিন্দু ও বৌদ্ধ পুরাণে হিমালয়ে লুকিয়ে থাকা এই নগররাষ্ট্রটির উল্লেখ আছে। তাই আজও এক অধরা রহস্যের বেড়াজাল বুনছে জ্ঞানগঞ্জ।
















