মহাভারতের 'ঘৃণ্য' চরিত্র পূজিত হন ভারতে! দুর্যোধন মন্দিরের যে কাহিনি অবাক করবেই

Duryodhana Temple Kerala: এই মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই। ভিতরে গেলে কেবল একটি উঁচু মঞ্চ দেখতে পাওয়া যায় যাকে বলা হয় মণ্ডপম বা আলথারা।

inscript
৩ মিনিট
মহাভারতের 'ঘৃণ্য' চরিত্র পূজিত হন ভারতে! দুর্যোধন মন্দিরের যে কাহিনি অবাক করবেই

মহাকাব্য নায়ক গড়ে, মহাকাব্যই গড়ে ভিলেন। কোনও কোনও নায়কের আগে মহাকাব্যিক সেই কলম বসিয়ে দেয় 'ট্রাজিক' শব্দটি, কোনও খলনায়কের গা ভরে ওঠে পাঠকের থুতুতে। ভারতীয় দুই মহাকাব্যই নায়ক আর খলনায়কের দ্বন্দ্বে চরম ভুক্তভোগী। এখানে নায়ককে মাঝেমাঝে খল সেজে ‘ধর্ম’ রক্ষার ডাক দিতে হয়েছে, খলনায়ককে মাঝেসাঝে হয়ে উঠতে হয়েছে সংবেদনশীল। তবে কোনও কোনও খলনায়ককে পাঠক জীবনে ক্ষমা করেনি। স্থান কাল বদলেও ঘৃণা আর ক্ষোভের পাত্র হয়ে থেকেছেন সেই চরিত্ররা। ভারতে রাম পুজো পান, পণ্ডিত রাবণ হয়ে ওঠেন পোড়ানোর কুশপুতুল। আর মহাভারতে? থরে থরে নায়ক, তবে সবচেয়ে ঘৃণ্য খলনায়ক দুর্যোধন। পাশাখেলা, দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা- সবটা মিলেই দেশ যাকে ক্ষমা করেনি। মহাকাব্যের অন্য এক বিশ্লেষণ বলে, তিনিই এই মহাকাব্যের একজন উজ্জ্বল, দয়ালু এবং সাহসী মানুষও। ১০০ কৌরব ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় দুর্যোধন এই ভারতে পূজিতও হন। শুনতে অবাক ঠেকলেও, খোদ দুর্যোধনকে রীতিমতো মন্দির গড়ে পুজো করা হয় এখানে। কিন্তু কেন?

পোরুভাজি পেরুভিরুথি মালানাদা মন্দির

পোরুভাজি পেরুভিরুথি মালানাদা মন্দির পেরুভিরুথি মালানাদা বা মালানাদা নামেও পরিচিত। এটিই ভারতের একমাত্র মন্দির যেখানে দুর্যোধনকে পুজো করা হয়। কেরলের কোল্লাম জেলার পোরুভাজি গ্রামে অবস্থিত এই মন্দিরটি আসলে খলনায়ক হিসেবে গড়ে তোলা এক চরিত্রের জীবনের শুভদিকগুলির প্রতীক। ঈর্ষায় মত্ত ভাই, পাশাখেলায় ছলনা, দ্রৌপদীর শ্লীলতাহানি- এত কিছুর পরেও দুর্যোধনের কিছু প্রশংসনীয় গুণ ছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এক হাতে পদ্ম, অন্য হাতে ফল! ভারতের এই রাজ্যেই আছে সনিয়া গান্ধীর বিশাল মন্দির!

Sonia Gandhi Temple: মন্দিরে সনিয়ার একটি ৯ ফুটের মূর্তি রয়েছে, সোনালি রঙের৷

কিংবদন্তি যা বলে

জনশ্রুতি আছে, নির্বাসনে থাকাকালীন পাণ্ডবদের খোঁজ করতে গিয়েছিলেন দুর্যোধন। কেরলের দক্ষিণের বনাঞ্চলে পাণ্ডবদের খোঁজ করার সময় তিনি এই স্থানে পৌঁছন। সারাদিন ধরে খোঁজাখুঁজির জেরে অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত ছিলেন দুর্যোধন। জলতেষ্টা মেটাতে একজনের কাছে জল চান তিনি। নিম্নবর্ণের একজন বৃদ্ধা তাকে টডি মানে মিষ্টি নারকেলের জল দেন। দুর্যোধন বিনা দ্বিধায় তা পান করেছিলেন।

দুর্যোধনের রাজকীয় পোশাক দেখে, বৃদ্ধ ওই মহিলা বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি একজন রাজা। এমন এক সম্মানীয় ব্যক্তি কুরব জাতের এক অস্পৃশ্য মহিলার হাত থেকে জল খাচ্ছেন এমনটা দেখেই অবাক হয়ে যান তিনি। দুর্যোধন কখনও জাতিভেদে বিশ্বাস করেননি। উলটে ওই বৃদ্ধার আতিথেয়তা দুর্যোধনকে এতটাই স্পর্শ করে যে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে সেখানে একটি পাহাড়ে ধ্যানে বসেন। গ্রামে বসবাসকারী মানুষদের মঙ্গল কামনায় শিবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন দুর্যোধন। শুধু তাই নয়, গ্রামবাসীদের কৃষিজমিও দান করেছিলেন দুর্যোধন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতের এই মন্দিরে পূজিত হয় মোটরবাইক! 'বুলেট বাবা'-র নেপথ্যে রয়েছে গা ছমছমে যে ঘটনা

Bullet Baba Temple: মন্দিরটিতে ওম বান্নার একটি আবক্ষ মূর্তিও রয়েছে। তার পিছনেই রয়েছে সেই বুলেট মোটরসাইকেল।

পরে, যেখানে তিনি ধ্যান করেছিলেন সেই জায়গায় গ্রামবাসীরা পোরুভাজি পেরুভিরুথি মালানাদা মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন। মজার বিষয় হলো, প্রতি বছর দুর্যোধনের নামে সম্পত্তি করও দেয় এই মন্দির কর্তৃপক্ষ। আজ পর্যন্ত যতজন এই মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্বে এসেছেন, সকলেই কুরব সম্প্রদায়ের মানুষ।

মূর্তিবিহীন মন্দির

তবে সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, এই মন্দিরে অন্যান্য হিন্দু মন্দিরের মতো কোনও মূর্তি নেই। ভিতরে গেলে কেবল একটি উঁচু মঞ্চ দেখতে পাওয়া যায় যাকে বলা হয় মণ্ডপম বা আলথারা। এখানেই ভক্তরা প্রার্থনা করেন এবং ধ্যান করেন। কেরলের কোল্লামের কুন্নাথুরে অবস্থিত এই মন্দিরটি একটি ছোট পাহাড়ে অবস্থিত। মালায়লাম ভাষায় 'মালা' মানে হচ্ছে পাহাড় এবং 'নাদা'র অর্থ মন্দির। পোরুভাজি পেরুভিরুথি মালানাদা মন্দিরে এক বিশাল খোলা মঞ্চও আছে। ভক্তরা চাইলে পাথরের মণ্ডপে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে পারে।

মন্দিরের আচার ও উৎসব

পোরুভাজি পেরুভিরুথি মালানাদা মন্দিরে একটি সোনার পতাকা (স্বর্ণাক্কোদি) রয়েছে। এটি শাসক মান্নানের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক। 'মালাক্কুদা মহলসভাম দিবস'-এর মতো শুভ দিনগুলিতে আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন দিয়ে উৎসব শুরু হয়। মালাক্কুদা মহোৎসবের শোভাযাত্রা চোখ ধাঁধানো। ষাঁড় এবং ঘোড়ার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট লম্বা সুসজ্জিত কাঠামো তৈরি করা হয়। ঐতিহ্যবাহী সুর বাজাতে বাজাতে এই বিশাল কাঠামোগুলো হয় কাঁধে চাপিয়ে বা রথে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

কৌরব রাজা দুর্যোধনের শুভ গুণগুলিই পূজিত হয় এই মন্দিরে। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে দুর্যোধনের দৃষ্টিভঙ্গি, কর্ণের সঙ্গে বন্ধুত্ব, নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলা এবং দরিদ্রদের প্রতি সমবেদনার মতো প্রশংসনীয় গুণগুলির পুজো প্রমাণ করে ভারতে নায়ক-খলনায়ক, পূজিত হন দু'জনেই। আর চরম ঘৃণার মধ্যেও কোথাও যে নরম কোনও কুঁড়ি ফুটতে পারে- সেই সম্ভাবনাকেই যেন পুজো করা হয় এই মন্দিরে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।