বাঙালির প্রিয় জিলিপির আসল দেশ কোথায়?

History Of Jilipi : বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রসময় খাদ্যটির কবে প্রথম এসেছিল ভারতে? এক্ষেত্রে আমাদের মনে করে নিতে হবে একটি বইয়ের কথা। বইটির নাম: ‘কিতাব-উল-তাবিখ’।

inscript
৩ মিনিট
বাঙালির প্রিয় জিলিপির আসল দেশ কোথায়?

জিলিপি-র সঙ্গে বাঙালির প্রেমবন্ধুত্ব অনেক দিনের। ছোট হোক কিংবা বড়, ঠোঙা-ভর্তি জিলিপি দেখামাত্রই মন আনন্দে ভরে যায় না, এমন লোক প্রায় নেই বললেই চলে। রথের মেলা দেখতে গিয়ে জিলিপি কিনে খাওয়া, অথবা বৃষ্টির দিন সন্ধেবেলা পাড়ার দোকান থেকে জিলিপি নিয়ে বাড়ি এসে সবার সঙ্গে ভাগ করে গল্প করতে বসা, এসবই আমাদের পরিচিত আনন্দদৃশ্য। বাঙালির পছন্দের তালিকা অনেক রকম! দোকানে দাঁড়িয়েই কেউ চান পোড়া লাল রঙের জিলিপি, কারোর আবার সোনা রংয়ের দিকেই চোখ! কেউ-কেউ আবার জিলিপি বাড়ি নিয়ে এসে কিছুটা খান। কিছুটা রেখে দেন। বলেন, বাসি জিলিপির স্বাদ-ই আলাদা!

বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রসময় খাদ্যটির কবে প্রথম এসেছিল ভারতে? এক্ষেত্রে আমাদের মনে করে নিতে হবে একটি বইয়ের কথা। বইটির নাম: ‘কিতাব-উল-তাবিখ’। না, এই বইটি ভারতে লেখা হয়নি। এবং বলা ভালো, এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি রান্নার বই, যা দশম শতকের শুরুর দিকেই লেখা শুরু হয়। মুহম্মদ বিন হাসান আল-বাগদাদী ‘কিতাব-উল-তাবিখ’-এ উল্লেখ করেছেন বাঙালির অতি প্রিয় জিলিপির এক বয়স্ক আত্মীয়ের নাম, যা হল: ‘জুলবিয়া’। আবার প্রায় একই সময়কালে রচিত অন্য একটি রান্নার বইতেও এই নামটিই দেখতে পাওয়া যায়। ‘জুলবিয়া’ আসলে কী? জানা যায়, ইরানে রমযান মাসে গরিব মিসকিনদের মাঝে এই খাবার বিতরণ করা হত। বলা বাহুল্য, এখনও ইরানে গেলে সহজেই এই রসময় খাদ্যটি চোখে পড়বে। বিশেষত, ইরানে নব্বর্ষের সময় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ‘জুলবিয়া’ বানানোর রীতি রয়েছে।

বাঙালির জিলিপি

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভুল করে মিষ্টি পুড়িয়ে ফেলেই জন্ম বিখ্যাত ডেজার্টের! শেষপাতে মিষ্টিমুখের শিকড় ফ্রান্সেই?

French Desserts: এক শিল্পী চিনি দিয়ে তৈরি করেছিলেন লুই পঞ্চদশের কাটা মস্তক, সৈন্য ও কামানসহ যুদ্ধের দৃশ্য— এ সবই খাওয়ার উপযোগী, কিন্তু সত্যি বলতে, কেউ কি চিনির সৈন্য খেতে চাইবে? বা রাজার কাটা মাথা?

আমাদের ঘরের লোক, সন্ধেবেলার সুপরিচিত 'জিলিপি'-র সঙ্গে ‘জুলবিয়া’-র কিছু পার্থক্য রয়েছে। জিলিপি কীভাবে বানানো হয়, তা প্রায় কম-বেশি আমরা সকলেই দেখেছি দোকানের দাঁড়িয়ে। জিলিপির মন হল দুই কিংবা আড়াই প্যাঁচের। হ্যাঁ, এই অপূর্ব জটিলতা জিলিপিকে মানায়। অপর দিকে, 'জুলবিয়া' দেখতে হয় অনেকটা ফুলের মতন। ভিন্নতার এখানেই শেষ নয়, ইরান থেকে একটু মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যেতেই আমাদের জিলিপি, ইরানের 'জুলবিয়া' নাম পালটে হয়ে যান 'জালবিয়া'। শুধু কি নামের পরিবর্তন? না। চিনির রসের বদলে মধ্যপ্রাচ্যে 'জালবিয়া' পরিবেশন করা হয় মধু ও গোলাপ জলের মধ্যে ডুবিয়ে। ব্যাপারই আলাদা!

অমৃতি

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গাড়ি থামিয়ে মিষ্টি কিনতেন উত্তম কুমার, কী ভাবে বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠল জনাইয়ের মনোহরা?

Bengals Famous Monohora at Janai : বাংলার মিষ্টি হিসেবে আজও ঐতিহ্যবাহী জনাইয়ের মনোহরা, বিশেষ কারণেই তৈরি হয়েছিল এই মিষ্টি

ওসব ভেবে কাজ নেই। আমরা বরং দেশে ফিরি। জানা যায়, মধ্যযুগে পার্সিরা ব্যবসার জন্য ভারতে আসতে শুরু করেন। এবং সেই সময়ই এ-দেশে প্রবেশ করে আমাদের অতি প্রিয় জিলিপি। বলা বাহুল্য, রূপে-স্বাদে অত্যন্ত গুণবতী হওয়ায় ভারতে আসার কিছুদিন পরেই সারা দেশে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই মিষ্টান্ন! যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখতে পাব, ১৪৫০ সালে জিনাসুরার লেখা এক জৈন গ্রন্থে জিলিপির উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থটির নাম: ‘প্রিয়মকর্ণপকথ’। জানা যায়, ভারতের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থেই প্রথম জিলিপির কথা লিপিবদ্ধ হয়েছিল।

ছানার জিলিপি

কিন্তু তখন এই মিষ্টির নাম 'জিলিপি' ছিল না। কী ছিল তাহলে? ‘জলভাল্লিকা’ বা ‘কুণ্ডলিকা’। আরও জানা যায়, এর কিছু সময় পরে লেখা বেশ কয়েকটি সংস্কৃত গ্রন্থেও জিলিপির উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থগুলি হল: ‘গুণাগুণবোধিনী’, ‘ভোজন কুতূহল’। বলবার মতো বিষয় হল, এই সংস্কৃত গ্রন্থগুলিতে জিলিপি তৈরির যে পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়, সেই পদ্ধতিতেই এখনও তৈরি হয় জিলিপি। এবং এখানে উল্লেখ করা উচিত, পনেরো’শ শতকের প্রথম দিক থেকেই জিলিপিকে সারা দেশের নানা আচার অনুষ্ঠান ও মন্দিরের ভোগ সামগ্রীতে ব্যবহার করা শুরু হয়ে যায়।

ইসলামিক দেশ থেকে আসা, এমনকী সেই দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এই মিষ্টান্নকে সেদিনকার ভারত নিজের করে নিয়েছিল। এটাই তো স্বাভাবিক! সময় যত এগিয়েছে, ভারত ও তার পাশের দেশগুলিতেও জিলিপির রসস্বাদ ছড়িয়ে পড়েছে। পালটে গেছে নাম ও রূপ। যেমন, বাংলাদেশের ঢাকায় একরকমের জিলিপ পাওয়া যায়, যার নাম: শাহী জিলিপি। আবার ময়মনসিংহ-তে চালের গুড়োর সঙ্গে তেতুলের টক মিশিয়ে বানানো হয়: টক জিলিপি। জিলিপিকে উত্তর ভারতে ডাকা হয় ‘জালেবি’ নামে। দক্ষিন ভারতে জিলিপির নাম : জিলেবি। এর মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশে জিলিপির আকার ও রূপ কিছুটা পালটে গেছে। নাম হয়েছে: ‘ইমারতি’। এই ইমারতিকেই আমরা বাংলায় ‘অমৃতি’ বলে জানি। নাম বদলেছে। রূপ বদলেছে। কিন্তু এই বিস্তৃত উপমহাদেশের জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য আনন্দস্বাদ হিসেবে রয়েই গেছে জিলিপি!

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।