বাঙালি খেদাও থেকে অনুপ্রবেশ জুজু, ফিরে দেখা বাংলার ভোটের ইস্যুগুলি
বাংলার ভোটের ময়দানে একাধিক ইস্যু একসঙ্গে কাজ করছে— পরিচয়, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থা। এই বহুমাত্রিক ইস্যুগুলির সংঘাতই নির্ধারণ করবে ভোটের চূড়ান্ত রূপরেখা।
বাংলার আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিটি নির্বাচনের মতো এবারও কিছু নির্দিষ্ট ইস্যু জনমানসে জায়গা করে নিয়েছে, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। গত কয়েক মাসে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ, এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে ভোটের ময়দানে কয়েকটি বড় ইস্যু স্পষ্টভাবে সামনে আসছে।
দেশজুড়ে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাভাষী শ্রমিক বা সাধারণ মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা এবং কিছু ক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগ সামনে এসেছে। সোনালি খাতুন ও আমির শেখের মতো কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে বিরোধী শিবির দাবি করছে, এই প্রবণতা বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। কর্মসূত্রে দিল্লিতে বসবাসকারী বীরভূমের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালি খাতুন ও তাঁর স্বামীকে তাঁদের এক সন্তানসহ বাংলাদেশে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া হয় বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে বাংলাদেশি সন্দেহ করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সোনালি খাতুন তাঁর সন্তানকে নিয়ে দেশে ফিরতে পারলেও তাঁর স্বামী এখনও বাংলাদেশেই। তাঁদের সঙ্গে আরও পাঁচজনকে পুশব্যাক করা হয় বাংলাদেশে। তাঁরাও এখনও নিজভূমে ভারতবর্ষে ফিরতে পারেননি। এছাড়া মালদার কালিয়াচকের একুশ বছর বয়সি আমির শেখ রাজস্থানে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে গেলে; বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে তাঁকে বন্দুকের নলের মুখে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। গত কয়েক মাসে এমন একাধিক ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা নির্যাতিত হয়েছেন। ভাষাগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে এই ধরনের সামাজিক অস্বস্তি রাজনৈতিক বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে।
অনুপ্রবেশের জুজু
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কি ফের জিতবে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে ভারতীয় জনতা পার্টি? সমীক্ষা কি বলছে—তৃণমূল এগিয়ে, নাকি লড়াই টানটান? ভোটের আগে জনমত কতটা বদলাতে পারে?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) একাধিক জনসভায় অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ তুলেছেন। ৩৫ পাতার চার্জশিট পেশ করেছেন যেখানে অনুপ্রবেশকারী তাড়ানো মূল লক্ষ্য বলে অমিত শাহের কথায় উঠে আসে। একইভাবে নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সভাতেও এই বিষয়টি উল্লেখ করেন। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-ও রোহিঙ্গা ইস্যু সামনে এনেছেন বারবার। এস আইআর (SIR)-এর শুরুর দিকে শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছিলেন, বাংলায় ১ কোটি রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি রয়েছে, তাঁরা সকলে অনুপ্রবেশকারী। কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনে আদতে কত রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে? সেই হিসেব দেয়নি নির্বাচন কমিশন বা দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, অনুপ্রবেশ আদতে যতটা না বাস্তব সমস্যা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে, তার চেয়ে বেশি এটি একটি ভয় বা জুজু হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা ভোটের মেরুকরণে ব্যবহৃত হতে পারে।
এসআইআর (SIR)
এই প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়া। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ফলে বিপুল সংখ্যক নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। খসড়া তালিকায় প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষ, ৬৬ হাজার ৯৫২। বিবেচনাধীন ছিল ৬০ লক্ষের বেশি ভোটার। ২৯ মার্চ তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে মোট বাদ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮১ লক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে এসআইআর অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটের। কারণ অনেক যোগ্য ভোটারের নামও বাদ গেছে বলে অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার, বিভিন্ন কর্মসূচিও নিচ্ছে।
সমাজভিত্তিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র। মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নাগরিকত্ব ও পরিচয় সংক্রান্ত আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এসআইআর-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর থেকেই মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নদিয়া ও বনগাঁ—এই দুই মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় বহু মানুষের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যায়, বনগাঁয় প্রায় ৪০ হাজার এবং নদিয়ায় প্রায় ৬০ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে; যা এই সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নাগরিকত্ব থাকবে তো? উৎকণ্ঠায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া যোগ্য ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে ফিরে দেখা যাক, গত কয়েক মাসে এসআইআর-এর নামে যে ত্রাস দেখেছে বাংলা।
একইভাবে, মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও নাম বাদ পড়ার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন মুর্শিদাবাদের ভোটাররা। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, মুর্শিদাবাদে ১১ লক্ষেরও বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুলে রয়েছে। মালদায় এই সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ ২৮ হাজার। উত্তর ২৪ পরগনায় প্রায় ৫ লক্ষ ৯১ হাজার এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৫ লক্ষ ২২ হাজার ভোটার এখনও বিচারাধীন তালিকায় রয়েছেন। এই চারটি জেলাতেই রাজ্যের মোট বিচারাধীন ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বসবাস। এই অঞ্চল সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় অধ্যুষিত, ফলে এই প্রক্রিয়ায় যে সংখ্যালঘুদের একটা অংশ বিপাকে পড়েছেন তা স্পষ্ট।
কোপ পড়েছে মহিলা ভোটেও
মহিলাদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা প্রকট। বিয়ের পর ঠিকানা পরিবর্তন, নথি-সংক্রান্ত নানা কারণে বহু নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। সম্প্রতি রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর প্রশ্নের জবাবে লোকসভায় কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার মন্ত্রক জানিয়েছে, এসআইআর-এর পর পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ও লিঙ্গ অনুপাত—দু’দিকেই পতন ঘটেছে। মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এসএসআর-এ প্রতি ১০০০ পুরুষ ভোটারের বিপরীতে মহিলা ভোটার ছিলেন ৯৬৯, যা এসআইআর-এর পর কমে ৯৬৪-এ নেমেছে; গত পাঁচ বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের মোট সংখ্যা কমে গিয়েছে। ২০১৭ সালে মহিলা ভোটার সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২৪ লক্ষ। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকা মোতাবেক তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৬ লক্ষ। মৃত, স্থানান্তরিত বা অনুপস্থিত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার পাশাপাশি ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় বহু মহিলার নাম রয়েছে, বিশেষত বিয়ের পর পদবি ও ঠিকানা বদলের কারণে তাঁদের নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে— যে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে করা মামলায় মোস্তারি বানু-ও তুলে ধরেছেন।
রান্নার গ্যাসে টান
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Election Commission Guidelines India: অপরাধমূলক অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের টিকিট, তথ্য প্রকাশের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে কতটা কার্যকর? নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে দেশে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে ভারতে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলেছে। হেঁশেলের গ্যাসের পাশাপাশি কমার্শিয়াল গ্যাসের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতি সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে এবং তা নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। কেন্দ্রের বিদেশনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জ্বালানি তেলে অন্তঃশুল্ক কমিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রতি লিটারে ১০ টাকা করে কমানো হয়েছে। কিন্তু মনে করা হচ্ছে, ভোট মিটলেই বাড়তে আরও পেট্রোল ডিজেলের দাম।
তৃণমূলের দুর্নীতি
দীর্ঘদিন ধরেই এটি একটি বড় ইস্যু। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম— এই সব অভিযোগ বিরোধীদের হাতে প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
“অভয়া” ইস্যু
নারী নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, যা বিশেষ করে শহর ও শহরতলির ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট আরজি কর হাসপাতালে কর্মরত তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সরকার রীতিমত টলে গিয়েছিল। রাজ্য, দেশ এমনকি বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পথে নেমেছিলেন ন্যায় বিচারের দাবিতে। ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে অভয়া ইস্যু সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। তৃণমূল গত লোকসভা নির্বাচনের থেকে বেশি আসন জিতেছে। কিন্তু ছাব্বিশের নির্বাচন যেহেতু রাজ্যের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করার ভোট। তাই এই ভোটে অভয়া ইস্যু ফ্যাক্টর হতে পারে বলে মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। তার উপরে অভয়া-র মাকে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি প্রার্থী করেছে পানিহাটি কেন্দ্রে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে মনে করছে অভয়ার পরিবার। অন্যদিকে ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে ৩৫ পাতার চার্জশিটে নারী নিরাপত্তার বিষয়টিকে জোর দিয়েছে বিজেপি। কোনো নারীর সঙ্গে অন্যায় হলে পাতাল থেকে খুঁজে এনে হলেও শাস্তি দেওয়া হবে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সুতরাং, নারী নিরাপত্তার বিষয়টি ভোটের ময়দানে গুরুত্ব পাচ্ছে বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
বাংলার ভোটের ময়দানে একাধিক ইস্যু একসঙ্গে কাজ করছে— পরিচয়, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থা। এই বহুমাত্রিক ইস্যুগুলির সংঘাতই নির্ধারণ করবে ভোটের চূড়ান্ত রূপরেখা। এখন দেখার জনতাজনার্দন কী সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তার প্রতিফলন অবশ্য ভোটের ফলাফলে ৪ মে জানা যাবে।






