হাত পাতলেই মেলে ‘চাউমিন’ প্রসাদ, যেভাবে কলকাতার কালী মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন চিনারা

Kolkata chinese kali temple : ট্যাংরার চিনাপট্টির মোড়ে একচিলতে কালীমন্দির

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
হাত পাতলেই মেলে ‘চাউমিন’ প্রসাদ, যেভাবে কলকাতার কালী মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন চিনারা

আজব শহর কলকাতা। আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস। এখানে পা দিলেই শুরু হয় টাইম ট্রাভেল। আর অতীতের ছাই ঘাঁটতে ঘাঁটতেই মেলে অমূল্য রতন। এখনও এ শহর নিয়ত প্রাচীনত্বের গল্প বোনে। সেইসব গল্পের পাতা পাল্টাতে পাল্টাতে হঠাৎ ঘণ্টার শব্দে নজর ফেরে। খোদ চিনা পট্টিতে মন্দিরের শব্দ? শুনে খানিকটা ধাঁধা লাগলেও এটাই সত্যি। ‘ট্যাংরা’ নামটা বাঙালির আহারের সঙ্গে মিলে গেলেও কলকাতার ট্যাংরা মানেই আস্ত একটা চিনা ঠেক। আর সেখানেই রয়েছে কালী মন্দির। ধর্মের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। নাম চিনা কালী মন্দির।

চিনের সঙ্গে কলকাতার যোগ অবশ্য আজকের নয়। সেই ১৭৭৮ সাল থেকে এ শহরে চীনাদের আনাগোনা। চা, মোমো, চাউমিন থেকে শুরু করে পোশাক আশাকেও আজকাল চিনা ছোঁয়া। কোন এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে রয়েছে সবকিছুই। তাই বাঙালির খাদ্য তালিকায় চাউমিন বেশ জাঁকিয়ে বসে। তাই বলে, দেবীর ভোগও কিনা হবে সেই চাউমিন? হ্যাঁ চীনা পট্টিতে থাকতে থাকতে দেবীরও এমনটাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। তাই খিচুড়ি, সবজি, পায়েস, ফল, মিষ্টির সঙ্গে একটু চাউমিন না দিলে মুখে রোচে না মা কালীর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন কালীপুজোর দিন হয় অলক্ষ্মী বিদায়

Kali Puja 2022: খানিকটা অবহেলিত দেবী কালীর শ্মশান উপাখ্যানের মধ্যেই বারবার বিরচিত হয় এই অলক্ষ্মীর অনুষঙ্গ।

এ শহরে প্রথম পা রেখেছিলেন টোনি আচিউ। তাঁর পথ অনুসরণ করেই দলে দলে চীনা সম্প্রদায়ের ব্যাস শুরু হয় খাস কলকাতায়। টেরিটি বাজার ও ট্যাংরায় অঞ্চলে পে রাখলে আজও চোখের সামনে অতীতের ছবিটা স্পষ্ট ধরা পড়ে। এদের অনেকের জন্ম এদেশেই। ভুলে গিয়েছেন নিজেদের ভাষা। মিলবে, মিলিবের জাদুতে মিলেমিশে গিয়েছ ধর্ম ও বর্ণ, জাতপাত। তাই শুধু বাঙালিই যে চিনা খাবারের স্বাদ নেবেন তা তো হয় না। দেবতাই বা বাদ যাবেন কেন! সত্তর বছর ধরে এই কালী মন্দিরে ভোগ হিসেবে তাই উৎসর্গ করা হয় খাঁটি চিনা খাবার, চাউমিন।

ইতিহাস অবশ্য একটা অন্য গল্প বলে। কথিত আছে, আগে এই মন্দিরের জায়গায় আগে ছিল সামান্য একটি কালো পাথর। ভক্তরা তাকেই সিঁদুর মাখিয়ে পুজো করতেন। তবে বিশ্বাসে কি না মেলায়! হলও তাই। এই অঞ্চলের এক চিনা শিশুর একবার ধুম জ্বর। ডাক্তার বদ্যি করেও সারছে না। অবশেষে ভিন্ন ধর্মের পায়েই মাথা কুটলেন বাবা মা। ফলও মিলল হাতেনাতে। ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠল ছেলেটি। আর এতেই ভাগ্য ফিরে গেল ওই কালো পাথরটির। ওই পরিবারের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা হল চিনা কালীবাড়ি। বর্তমানে যে কালীমন্দিরটি তৈরি রয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ গ্রানাইট পাথরের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুরুষকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটা! নবদ্বীপে যেভাবে তৈরি হয়েছিল প্রথম কালীমূর্তি

Kali Puja 2022: কীভাবে উৎপত্তি হয়েছিল কালীমূর্তির?

আজকের প্রজন্মের কাছে এই গল্প ভিত্তিহীন মনে হলেও এই অঞ্চলে কান পাতলে এখনও এমনই গুঞ্জন। গত ষোলো বছর ধরে মন্দিরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন জন চেং। জন বাবুর বেড়ে ওঠা এই ট্যাংরা অঞ্চলেই। তাঁর আত্মীয়রা আগে দেখাশোনা করতেন মন্দিরের। পাকাপাকিভাবে নিউইয়র্কে চলে গিয়ে আবার দেশে ফেরেন ১৯৯৭ সাল নাগাদ। এখন তিনি নিজেই আগলে রেখেছেন এই মন্দির। এই পথে একে যেন গায়ে কাঁটা দেয়। এই যে চারিদিকে এত ধর্মে ধর্মে ভেদাভেদ,সব যেন ধুলিস্মাৎ হয়ে যায় নিমেষে। আর জন চেং বাবু এক মনে গাঁথতে থাকেন দেবীর জবার মালা। সাজিয়ে রাখেন কোশাকুশি। আর নিজের প্রিয় খাবার চাউমিন সাজিয়ে পরিবেশন করেন স্বয়ং কালীকেও।

এমনিতে চীনারা বেশিরভাগই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। কলকাতার চীনা নাগরিকরাও তাই। যিনি মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন তিনিও ছিলেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু ওই বিশ্বাসের জোরেই যেন মিলে মিশে গেল দুই ধর্ম। আর সেই থেকেই এক টুকরো ইতিহাস বুনে রেখেছে এই মন্দির। শক্তির দেবীর প্রতি টান থেকেই ধর্মের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে চিনা বৌদ্ধরা জ্বালেন মোমবাতি। মাথা ঠেকান দেবী কালীর চরণে। বিপদ দূর করতে হিন্দু-চিনা একসঙ্গে মা কালীর সামনে পুজোয় বসেন। সব ধর্ম মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় মন্দিরে। আর সব থেকে মজার বিষয় হল ওই প্রসাদের বিষয়টিই। খিচুড়ি, সবজির সঙ্গে সঙ্গত করছে চাউমিন চপসি। কে বলে দেবী কেবল বাঙালির?

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।