পুরুষকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটা! নবদ্বীপে যেভাবে তৈরি হয়েছিল প্রথম কালীমূর্তি

Kali Puja 2022: কীভাবে উৎপত্তি হয়েছিল কালীমূর্তির?

Ramen Das
৩ মিনিট
পুরুষকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটা! নবদ্বীপে যেভাবে তৈরি হয়েছিল প্রথম কালীমূর্তি

সবেমাত্র পরিবর্তিত হচ্ছে নবদ্বীপ। সঙ্গে বাংলায় প্রভাব কমছে চৈতন্যের। ঠিক এই মুহূর্তেই ফের বাড়ল শক্তির আরাধনা। কালো যাদু, তন্ত্র-মন্ত্র উচ্চারণে ব্যতিব্যস্ত তখন চারিদিক। অবিভক্ত বাংলার ছত্রে ছত্রে গড়ে উঠছে শক্তিচর্চার আরাধনা কেন্দ্র। ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলা আসলে কেমন? দুই পন্থার শত্রুতা নিরসনে কীভাবে মেলবন্ধনের বাংলা রচিত হবে আবার? এই সমস্ত ভাবনার দোলাচলে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন চৈতন্য মহাপ্রভুর বন্ধু নদিয়ার নবদ্বীপের কৃষ্ণনন্দ আগমবাগীশ। যিনি বৈষ্ণব নন, ছিলেন শাক্ত। কিন্তু মানসিকতায় ভিন্ন।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কে?

মূলত, তন্ত্রের সাধনার গীতা বলা হয় যাকে, সেই 'বৃহৎ তন্ত্রসার' গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে বিখ্যাত তিনি। নদিয়ার নবদ্বীপে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পরে তন্ত্রশাস্ত্রের জন্য ‘আগমবাগীশ’ উপাধি লাভ করেন কৃষ্ণানন্দ। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শান্তি এবং দর্শনধর্মী তন্ত্রসাধনার কথা যে কয়েকজন ভেবেছিলেন, তাঁর মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। তন্ত্র সাধনার এই পথপ্রদর্শক বিখ্যাত আর একটি কারণেও। যিনি প্রথম গোটা দেশের মধ্যে এমন একটি জায়গায় বসে তন্ত্রের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। সেটি সম্পূর্ণভাবে ছিল বৈষ্ণবদের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ তথাকথিত দুই পন্থার বিভেদের সূত্রধার ছিলেন কৃষ্ণানন্দ। বলা হয় এমনও।

কালী মূর্তির উদ্ভব

কথিত আছে, কৃষ্ণানন্দের সৃষ্টির আগে পৌরাণিক যুগ থেকেই নিরাকার ছিলেন কালী। শুধুমাত্র কল্পনা করে তাঁর আরাধনা চলত। শিলাখণ্ড অথবা মাটি দিয়ে ঘট তৈরি করে চলত দেবীর উপাসনা। মূলত, দক্ষিণা এবং রটন্তি কালীর রূপের মাধ্যমে সার্বিকভাবে কালীর রূপ প্রকাশ এই কৃষ্ণানন্দের হাত ধরেই। বলা, পূজার মন্ত্রের সৃষ্টির নেপথ্যেও রয়েছে তাঁর নামই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রোশনাইয়ের আনন্দ নয়, মনখারাপের দীপাবলি মাটির প্রদীপের কারিগরদের

Kali Puja 2022: কেমন আছেন প্রদীপের কারিগররা?

কীভাবে তৈরি হলো প্রথম কালী মূর্তি

কথিত আছে, একদিন রাতে নাকি দেবী স্বয়ং কৃষ্ণানন্দকে স্বপ্নাদেশ দিলেন। সেই আদেশে তিনি বললেন, সকালে বেরিয়ে প্রথম যে নারীকে দেখবি, ওটাই আমার রূপ হবে। নিরাকার দেবী স্বপ্নে বললেন নিজের আকারের কথা।

পরদিন সকালে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গাস্নানে যাচ্ছেন। এমন সময় গোপ-পাড়ার কাছে যেতেই তাঁর চোখে প্রথম পড়লেন এক গোপবধূ। যিনি ঘুঁটে দিচ্ছিলেন দেওয়ালে। একহাতে গোবর। ছোট শাড়ি পরনে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের সুন্দরী ওই মহিলা তাঁকে দেখে লজ্জায় জিভে কামড় দিলেন। সেই দৃশ্য দেখে বাড়ি ফিরলেন তিনি। ফিরেই মনে পড়ল সেই স্বপ্নের কথা। তারপরেই তিনি তৈরি করলেন মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তি। সেই থেকেই কালীর রূপ প্রকাশিত হলো জনমানসে।

পরবর্তীকালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নির্দেশে দিকে দিকে শ্যামা পূজার আবহে ছড়িয়ে পড়ল দেবীর এই রূপ। কৃষ্ণানন্দের দেওয়া রূপেই পূজিত হলেন কালী।

বর্তমান অবস্থা

আগমেশ্বরী মাতা। প্রায় ৪৫০ বছর ধরে এই পুজো চলছে নবদ্বীপের আগমেশ্বরী পাড়ায়। এখনও দীপান্বিতা অমাবস্যায় ওই রূপেই পূজিতা হন দেবী। বিরাট চোখ, কালো বর্ণ আর মাথায় সুসজ্জিত মুকুটে সেজে ওঠেন দেবী। মায়ের ভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। দেওয়া হয় অড়হর ডালের খিচুড়ি, মোচার ঘণ্ট, এঁচোড়ের ডালনা এবং চালতার টক। সারারাত হয় পুজো। পরের দিন দুপুর ১২টায় বেহারার কাঁধে চেপে মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হয় পাশের নদীতে। এখনও পুজোর দিন ভিড় জমে ওই অঞ্চলে। বিরাট জনসমাগমে মুখরিত হয় চারিদিক। কিন্তু স্রষ্টার পরিবারের পুজো হয় শান্তিপুরে।

শান্তিপুরে পুজোর সূচনা

একই আচার ৩৭৬ বছর ধরে পালিত হচ্ছে শান্তিপুরে। বলা হয়, এই পুজো নবদ্বীপ থেকে শান্তিপুরে নিয়ে আসেন কৃষ্ণানন্দের পরিবার। দেবীরূপ সৃষ্টির ৮৩-৮৪ বছর পর থেকেই শান্তিপুরে হয় পুজো।

যদিও এই ঘটনার পিছনেও রয়েছে কারণ। বলা হয়, শাক্ত-বৈষ্ণব বিরোধ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টায় কৃষ্ণানন্দের নাতি সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে মথুরেশ গোস্বামী তাঁর নিজের মেয়ের বিয়ে দেন। এর পর নবদ্বীপ উত্তাল হয়। বৈষ্ণব-শাক্ত বিভেদে একঘরে হন সার্বভৌম। শান্তিপুরে মেয়ে, জামাইকে নিয়ে চলে আসেন মথুরেশ। বড় গোস্বামীদের পরিবারে থাকতে শুরু করেন তাঁরা। এই পরিবারই পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করে সেখানে কালী পুজোর প্রচলন করেছিলেন। এই সূত্রেই শান্তিপুরে বড় গোস্বামী পাড়ায় শুরু হয় কালীপুজো। সেই প্রতিমার নামও আগমেশ্বরী মাতা। যাঁর পুজো এখনও সাড়ম্বরে পালিত হয় ওই এলাকায়। যদিও শাক্ত এবং বৈষ্ণব বিভেদে একটা সময় দুই মেরুতে অবস্থান করত শান্তিপুর এবং নবদ্বীপ। আজ কৃষ্ণানন্দের বংশ পরম্পরায় শান্তিপুরে তৈরি হয় সেই মূর্তি। কোজাগরী পূর্ণিমার পর, পঞ্চমী থেকে একাদশী পর্যন্ত তৈরি হয় ছোট মূর্তি। তারপর রীতি মেনে একাদশীতে শুরু হয় বড় মূর্তির কাজ। তার আগেই চলে খড়ের কাজ। অমাবস্যা তিথিতে চক্ষুদান হয় দেবীর।

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।