কেন কালীপুজোর দিন হয় অলক্ষ্মী বিদায়

Kali Puja 2022: খানিকটা অবহেলিত দেবী কালীর শ্মশান উপাখ্যানের মধ্যেই বারবার বিরচিত হয় এই অলক্ষ্মীর অনুষঙ্গ।

Ramen Das
৪ মিনিট
কেন কালীপুজোর দিন হয় অলক্ষ্মী বিদায়

রূপেই তোমায় ভালো লাগে, গুণে তুমি কী! বাহির তোমার খারাপ হলে সমাজে তুমি ঝি! ও মেয়ে তোর বয়স কত বলতে বলতে ও মেয়ে তুই খারাপ কেন? এই প্রশ্নেই উদ্বেল হয় দুনিয়া। তথাকথিত সমাজের ঠিক করে দেওয়া বিধিনিষেধের বশে বারবার অনুরণিত হয় এক-একটি কালো মেয়ের উপাখ্যান।

বর্ণবৈষম্য থেকে সামাজিক গঞ্জনা সব ক্ষেত্রেই দেখা দেয় এক অযাচিত হস্তক্ষেপ! ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মূর্মূর যুগে দাঁড়িয়েও এমনই একাধিক দৃষ্টান্ত উঠে আসে পুরাণ থেকেও। আর তারই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন কালীপুজোর রাতের অলক্ষ্মী! বঞ্চিত দেবী চণ্ডী, খানিকটা অবহেলিত দেবী কালীর শ্মশান উপাখ্যানের মধ্যেই বারবার বিরচিত হয় এই অলক্ষ্মীর অনুষঙ্গ। যাঁর অবহেলিত-আরাধনা সূচিত হয় দীপান্বিতা অমাবস্যায়। শ্যামার পূজার দিন।

কে এই অলক্ষ্মী

পুরাণে বলা হয়, অলক্ষ্মী এক হিন্দু দেবী। লক্ষ্মীর ছায়া এবং দুর্ভাগ্যের দেবী তিনি। অলক্ষ্মী কল্কি পুরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী, বিরাটাকায় দৈত্য কলির দ্বিতীয়া স্ত্রী। বাহন তাঁর গর্ধব বা গাধা। এই অলক্ষ্মী প্রসঙ্গ রয়েছে লিঙ্গ পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, শ্রী সুক্তমে। তিনি দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কি না, এই বিষয়ে রয়েছে একাধিক বিতর্কও।

পুরাণে যাঁর রূপ বর্ণনা করা হয় ঠিক এইভাবে। 'গোরু খেদানো, হরিণের মতো পা, ষাড়ের মতো দাঁত।' অপর একটি বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর 'দেহ শুষ্ক, গাল কুঞ্চিত, ওষ্ঠাধর স্ফীত, ক্ষুদ্র, গোলাকার ও উজ্জ্বল চক্ষুবিশিষ্টা এবং তিনি গর্দভের পিঠে উপবিষ্টা।'

তিনি কখনও কখনও লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচার রূপ ধারণ করেন। মনে করা হয়, প্যাঁচা হল, লক্ষ্মী দ্বারা আসা সৌভাগ্যের সঙ্গেই হাজির হওয়া ঔদ্ধত্য ও অশুভের প্রতিনিধি এবং দুর্ভাগ্যের প্রতীক।

অর্থাৎ, এই বর্ণনার ছত্রে ছত্রে বিরচিত অলক্ষ্মীর কুকথা। যেখানে তাঁর নামের মধ্যেই রয়েছে খারাপ কিছুর ইঙ্গিত, অর্থাৎ অ অর্থাৎ না লক্ষ্মী। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর বর্ণনাও লক্ষ্মীর বিপরীতে রয়েছে খারাপেই দাঁড়িয়ে।

কথকতার অলক্ষ্মী

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুরুষকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটা! নবদ্বীপে যেভাবে তৈরি হয়েছিল প্রথম কালীমূর্তি

Kali Puja 2022: কীভাবে উৎপত্তি হয়েছিল কালীমূর্তির?

অলক্ষ্মীর জন্ম-সংক্রান্ত একাধিক উপাখ্যান রয়েছে। এক জায়গায় বলা হয়, লক্ষ্মী প্রজাপতির মুখের আভা থেকে জন্ম নেন এবং অলক্ষ্মী জন্ম নেন প্রজাপতির পৃষ্ঠদেশ থেকে।

অপর একটি উপাখ্যান অনুযায়ী, লক্ষ্মীর জন্ম সমুদ্রমন্থনের সময়। এইসময় বাসুকি নাগের মুখনিসৃত কালকূট বিষ থেকে অলক্ষ্মীর জন্ম হয়। আবার এই কাহিনিরই পাঠান্তর অনুযায়ী, অলক্ষ্মী-লক্ষ্মী দুই জনেই সমুদ্রমন্থনের সময় জন্ম নেন। অলক্ষ্মী আগে জন্মান।

অপর একটি উপাখ্যান অনুযায়ী বলা হয়, অলক্ষ্মী তার কনিষ্ঠা ভগিনীকে বিষ্ণুর মতো স্বামীর সঙ্গে বৈকুণ্ঠে বাস করতে দেখে বেদনার্ত হন। কারণ তার স্বামী বা বাসস্থান কিছুই ছিল না। লক্ষ্মী তখন তাকে বর দেন,

কলি হবে অলক্ষ্মীর স্বামী এবং অপরিচ্ছন্ন, কুৎসিত, আলস্য, অত্যাচার, ঈর্ষা, ক্রোধ, ভণ্ড, লোভ ও কামের মধ্যে তিনি বাস করবেন।

তখন থেকেই সাড়ম্বরে উৎপত্তি।

অলক্ষ্মী পুজো

কালীপুজোর দিন। দীপান্বিতা অমাবস্যায় অশুভের বিদায় লগ্নের আগমনের জন্য অলক্ষ্মীর পুজো হয়। যেখানে দীপাবলির সন্ধ্যায় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুধর্মের মহিলারা এই পুজো করেন। অলক্ষ্মীকে অমঙ্গল ও অশুভের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। তাই অলক্ষ্মী বিদায় করে লক্ষ্মীবরণই এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। গোবর দিয়ে অলক্ষ্মীর এবং পিটুলি দিয়ে লক্ষ্মী, কুবের ও নারায়ণের মূর্তি নির্মাণ করা হয়। উঠানের এক কোণে অলক্ষ্মীর মূর্তি রেখে প্রথমে পূজা করা হয়। পূজা শেষে মেয়েরা কুলো পিটাতে পিটাতে ওই মূর্তিটি বাড়ির কাছের কোনও রাস্তার তিন মাথা মোড়ে নিয়ে যান।

সেখানে সমবেত কণ্ঠে 'লক্ষ্মী আয়, অলক্ষ্মী যা' ধ্বনি সহকারে মূর্তিটি ফেলে দেওয়া হয়। ফেরার পথে আলোর আধিক্য থাকে। এর সঙ্গেই বাজে ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা। এরপর গৃহিণীরা গৃহে ফিরে তাঁদের আরাধ্যা দেবী লক্ষ্মীর পূজা করেন।

নারীর বঞ্চনা

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এবং সার্বিকভাবে পুরাণে বর্ণিত নারীর-দেবীর মাহাত্ম্য-কথায় যে বঞ্চনার প্রসঙ্গ এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম যেমন মনসা, চণ্ডী। ঠিক তার বিপরীত দিকে রয়েছেন এই অলক্ষ্মী। যাঁর অস্তিত্ব লক্ষ্মীর ছায়ায়, যাঁর অস্তিত্ব কখনও লক্ষ্মীর পদতলের প্যাঁচার মধ্যে। অর্থাৎ বরাবর বঞ্চিত, অবহেলিত তিনি।

অনেকেই বলেন, পুরাণকথায় তাঁর প্রসঙ্গে একাধিক অশুভের কথা বলা হয়েছে, তাই তাঁকে তাড়াতে এই কথকতা আসবেই!

কিন্তু সেই অনুযায়ী যদি অলক্ষ্মীর উপাখ্যান ধরা হয়, সেখানেই বলছে; যখন অলক্ষ্মী গৃহে প্রবেশ করেন, তখন তিনি সেই গৃহে ঈর্ষা ও অমঙ্গল নিয়ে আসেন। তিনি ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব এনে কুল-বিনাশ করেন। অর্থাৎ প্রথম থেকেই স্পষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে লক্ষ্মীর বিপরীত দিক, পূর্ণিমার আলোকের অভিযাত্রী লক্ষ্মীর অন্ধকার দিকের বাহক তিনি। মানব সত্তার আলো আর কালোর মধ্যেই তিনিই কালোর দেবী। যেখানে কালী হয়েছেন শক্তি, সংহার আর দশ মহাবিদ্যার এক রূপ। যেখানে সমস্ত খারাপের ত্যাগের বাহক হয়ে উঠেছেন কালী। অনেক লড়াইয়ের পরে এসেছে এই স্বীকৃতি। ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে অলক্ষ্মীর দেবী সত্তার তুলনায় তাঁর খারাপ দিকটিই বিবেচিত হয়েছে বারবার। যেখানে মহিলারা আর এক মহিলাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন ঘর থেকে। এই সমাজের নারীর প্রতি নারীর অত্যাচারের মতোই। দুয়ারে লেবু-লঙ্কা প্রতীক রাখছেন যাতে তিনি না আসেন!

যাঁর বঞ্চনা তো প্রথম থেকেই! একই সঙ্গে জন্মেও লক্ষ্মীর বড় দিদি হয়েও তিনি স্বর্গে নন, থেকেছেন অন্যত্র। আবার লক্ষ্মী তাঁকে খারাপের মধ্যে থাকতে, খারাপ স্বামী পাওয়ার বর দিচ্ছেন।

অর্থাৎ, তুমি খারাপ, তোমার স্থান ওখানেই। যে অধিকার ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলেন মনসা। যে লড়াইয়ে খানিকটা রুখে দাঁড়াতে পেরেছিলেন চণ্ডী, কালী। সেখানে অলক্ষ্মীর রূপ, অবস্থান প্রসঙ্গ, পুরাণ-অনুষঙ্গ তাঁদের তুলনায় বহু ক্ষেত্রে আলাদা হলেও এই লড়াই না করেই ক্রমশ যেন একা একা বারবার অশুভের সঙ্গেই বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। আর সেখানেই অলক্ষ্মী তাড়াতে উদ্যত মেয়েরাই আর এক মেয়েকে ঝাঁটাপেটা করেছেন বারবার।

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।