টলিউডের সহকর্মীদের চোখে আসলে কেমন ছিলেন অভিষেক?

অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। মৃত্যুর পরে মানুষকে নিয়ে যতটা চর্চা হয়, বেঁচে থাকতে ততটাই বঞ্চনা, লাঞ্ছনা জোটে তার কপালে। দুনিয়ার নিয়ম এই। জীবন্তের মূল্য নেই। নব্বইয়ের দশকের অন্যতম হিট নায়ক ধীরে ধীরে বিস্মৃতির পথ ঘুরে পা বাড়ালেন মৃত্যুর ওপারের জগতে। গত কয়েক বছর ফিরে আসছিলেন ছোট পর্দার জগতে। নিজের অভিনয়ের আভিজাত্য নিয়েই ফিরছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ টলিউড। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে চলে যাবেন অভিষেক–এ যেন কেউ মেনে নিতে পারছে না। এ বিষয়ে কী বলছেন সহ-অভিনেতারা? কার সঙ্গে কী রকম সম্পর্ক ছিল অভিষেকের? আসুন দেখে নিই এক নজর।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও অভিষেকের সম্পর্ক যে দীর্ঘদিন খুব একটা ভালো ছিল না, তার প্রমাণ অভিষেকের বিভিন্ন ইন্টারভিউ গুলি। শাশ্বত পরিচালিত ‘অপুর সংসার’ নামক একটি শোতে প্রকাশ্যেই বলেন অভিষেক, “তোদের খুব প্রিয় ‘দাদা’ আর ‘দিদি’, টপ হিরো আর টপ হিরোইন, তাঁরা দু’জন জোট বেঁধে আমাকে যে কত ছবি থেকে বাদ দিয়েছে, তা বলার মতন নয়! এমনকি আমার সাইন করা প্রায় ১২ থেকে ১৪ খানা ছবি থেকে বাদ দিয়েছে তাঁরা আমায়। সব মিলিয়ে প্রায় ২০-২২টি ছবি থেকে বাদ পড়েছিলাম আমি। আমি অভিষেক চ্যাটার্জি, তখন অলমোস্ট নম্বর ওয়ান স্টার, হঠাৎ আমার হাতে একটাও কাজ নেই। টানা ১ বছর আমি বাড়ির বাইরে বেরোইনি। এমনকি লক্ষ্মীর ভাঁড় ভেঙে তখন আমায় খেতে হয়েছিল।” এই নিয়ে জনগণ ক্ষুব্ধ। মৃত্যুর পর নতুন করে এই বিতর্ক উঠে আসে। অথচ প্রসেনজিৎ অত্যন্ত কাছের বন্ধু ছিলেন অভিষেকের। অভিষেকের মৃত্যু নিয়ে প্রসেনজিৎ-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রাথমিক ভাবে তিনি জানান, “একের পর এক আমায় মৃত্যু দেখে যেতে হয়। আর প্রতিক্রিয়া দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অভিষেকের খবরটা সকালে শোনার পর এই প্রথম সংবাদমাধ্যমকে জানাচ্ছি, এর প্রতিক্রিয়া আমি দিতে পারব না। ওর বিয়েতে বরকর্তা হয়ে গিয়েছিলাম আমি। সেই দিনটার কথা আজ মনে পড়ছে। ওর সঙ্গে যা কিছু ভাল স্মৃতি সেটাই রেখে দিতে চাই। এর বেশি সত্যি ওর জন্য আমি আর কোনও শব্দ ব্যবহার করতে পারছি না।’’ এছাড়াও প্রসেনজিৎ-এর নির্দেশিত প্রথম ছবি, ‘আমি সেই মেয়ে’র নায়ক ছিলেন অভিষেক। পরে ট্যুইটারে প্রসেনজিৎ লেখেন, "বিশ্বাস হচ্ছে না যে অভিষেক আর নেই । কী বলব কী লিখব...ভাষা হারিয়ে ফেলেছি ৷ তোর বিকল্প হবে না কোনো দিন। ভাল থাকিস রে বন্ধু ।"

ঋতুপর্ণার সঙ্গে বহু ছবিতে কাজ করেছেন অভিষেক। যদিও পরবর্তী বিতর্কে প্রসেনজিত-এর সঙ্গে নাম জড়িয়ে যায় ঋতুপর্ণারও। অভিষেকই নাম নিয়ে অভিযোগ আনেন। জানা যায়, খ্যাতির তুঙ্গে থাকাকালীন কোনও সাক্ষাৎকারে ঋতুপর্ণাকে নিয়ে কিছু একটা বলেছিলেন অভিষেক, যা ঋতুপর্ণার পছন্দ হয়নি। এরপরই ছবি থেকে লাগাতার বাদ পড়তে থাকেন অভিষেক। এ মনোমালিন্যের কথা ঋতুপর্ণা কিন্তু স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন, “আমার এখনও মনে আছে, আমি একদিন শুনলাম, ‘ঋতুপর্ণা সুপারস্টার হয়ে গেছে। সুজন সখী সিনেমার সাফল্য চারদিকে হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছে আগুনের মতো।’ সেই ছবি কত টাকার ব্যবসা করেছিল আজ আর মনে নেই। কিন্তু সেই ছবির প্রোডিউসার অসীম সরকার এসে আমায় বলেছিলেন, ‘তুমি আমার লক্ষ্মী।’ অভিষেককেও বলেছিলেন, ‘তুমি আমায় এক বিরাট উপহার দিলে।’...যে ছবিটা আমার কেরিয়ারের অন্যতম সম্পদ, দহন, ঋতুপর্ণ ঘোষের যে সিনেমার জন্য আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলাম, সেই ছবিরও একটা ভীষণ বড় অংশ জুড়ে অভিষেক চট্টোপাধ্যায় ছিল। ও আমার স্বামীর রোলে অভিনয় করেছিলেন। আমার এখনও মনে আছে, অভিষেক মানে মিঠু ওই ছবির সময়ে ঋতুপর্ণ ঘোষকে আমার সম্পর্কে অনেক ভাল ভাল কথা বলেছিল। আমি খুব ভাল অভিনেত্রী, অনেক ভাল কাজ করছি। সেটা আমায় ঋতুদা পরে বলেছিল। আমার খুব ভাল লেগেছিল, যে আমার কো-স্টার আমার সম্পর্কে এত ভাল কিছু বলেছে।” বলেছেন, ‘আমিই সেই মেয়ে’তে একসঙ্গে কাজ করার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন যে যোগাযোগ ছিল না এ কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ঋতুপর্ণাও।

অভিষেকের চলে যাওয়া নিয়ে অভিমানী ইন্দ্রাণী দত্তও। ২০১৭-১৮ সাল নাগাদ ‘নায়িকার ভূমিকায়’ নামক একটি ছবিতেই শেষ একসঙ্গে কাজ দু’জনের। সারা রাত ধরে সেদিন গানের শুটিং চলছিল। সারা রাত সেটে আড্ডা দিয়ে কাটান তাঁরা। “কত ছবির নাম বলব? ‘অপমান’, ‘তুফান’, ‘পাপী’, ‘মিত্তির বাড়ির ছোট বউ’— তালিকাটা বিরাট। ছোটপর্দার একটি রিয়্যালিটি শোয়ে দু’জনে বিচারকের ভূমিকাতেও ছিলাম। হঠাৎ করে অভিষেক আজ পাশ থেকে সরে গেল। আর একসঙ্গে কাজের সুযোগ দিল না” –বলেন ইন্দ্রাণী দত্ত।

শতাব্দী রায় দিল্লি থেকে ফোন করে খবর দেন তাঁকে। শেষবারের মতো অভিষেককে দেখে বেরিয়ে আসেন ইন্দ্রাণী। তাঁর মনে যেতে থাকে পুরনো সমস্ত স্মৃতি। বিচিত্র অবস্থায় করা নানা শুটিং-এর কথা। “সেবার শিলিগুড়ি গিয়েছি। ‘মিত্তির বাড়ির ছোট বউ’ ছবির শ্যুটিং। তিস্তা নদীর উপর গানের দৃশ্যের শ্যুটিং চলছে। একটা গোল পাথরের উপর আমি আর অভিষেক দাঁড়িয়ে আছি। পা পিছলে যাচ্ছে। তার মধ্যে প্রচণ্ড হাওয়া। খুব শীত। দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। অভিষেক আমায় বলতে থাকে, মনে করো, তোমার শীত করছে না। এই ঠান্ডা হাওয়ায় তোমার আরাম লাগছে। আর তুমি পড়ে যাবে না। এই দেখো, আমি শক্ত করে তোমার হাত ধরে রেখেছি। বন্ধু, সহঅভিনেতা, সহশিল্পী অভিষেক শক্ত করে হাত ধরেছিল। ভরসা ছিল। আজ আচমকা সেই হাতটা ও ছেড়ে দিল। এই দুঃখ আমার কখনও যাবে না।” স্মৃতির আবেগে গলা রুদ্ধ হয়ে আসছে তাঁর। শেষবার বন্ধুকে দেখে ইন্দ্রাণী এগিয়ে চলেছেন। এগিয়ে চলেছেন তাঁর নিজের জীবনের দিকে।

বন্ধুর মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ইন্দ্রাণী হালদার। বলেন, “কাজ কী, আমরা জীবনটাই একসঙ্গে শুরু করেছিলাম। আমার জীবনের প্রথম ছবির পর থেকেই অভিষেকের সঙ্গে কাজ। ওরা তখন অবশ্য সিনেমা করত। আমি তখন টেলিভিশনে। 'জামাইবাবু'-সহ অনেক ছবি, তারপর অনেক শো করা। মিঠু আমার দুঃখের সাথী ছিল।” ‘কুয়াশা’ ছবি করতে গিয়ে নিজেদের দুর্বিপাকের কথাও জানান অভিনেত্রী। স্মৃতিকাতর কণ্ঠে বলেন, “গত তিন বছর ধরেও সমসময় দেখা হত, কথা হত। আমরা ছবিও করেছি মাঝখানে একটা। সবসময় বলতাম, মিঠু একটু রোগ হয়ে যা। তোর কত সুন্দর চেহারা ছিল আগে। কত জিম করতিস। খেতে ভালবাসত। আমরা সবাই খুব ফুডি। কথা শুনত না একদম। ভীষণ জেদি ছিল। একটা ব্যাপারে মিল ছিল ওর সঙ্গে আমার, ও খুব পুজোপাঠ করত।” ভীষণ মনখারাপ করছেন দেবশ্রী রায়। তাপস, মিঠু–একে একে সহকর্মী/বন্ধুরা হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর জীবন থেকে। বুকে ভিড় করে আসছে স্মৃতি। “খুব মনে পড়ছে, তরুণ মজুমদারের ‘পথভোলা’ ছবিতে নয়না দাস আর অভিষেক চট্টোপাধ্যায় নতুন মুখ। এর পরেই আমি, মিঠু, দেবিকা মুখোপাধ্যায় মিলে করি ‘ওরা চারজন’ ছবিটি। শমিত ভঞ্জের ওই ছবিতে কাজ করতে করতে ভীষণ মজা করতাম সবাই। মিঠু খুবই প্রাণবন্ত ছিল। সারা ক্ষণ সবার পিছনে লাগা। দুষ্টুমি করা। সমান তালে তাল দিত আমাদের সঙ্গে। আমরা চার জন মিলে কী ভূতের ভয় দেখাতাম!” জানান তিনি। কেন বড় পর্দায় অভিনয় থেকে সরে গেল মিঠু–সে প্রসঙ্গ আজ আর তুলতে চাইলেন না ব্যথাতুর সহকর্মী। শুধু জানালেন এতশত মৃত্যুর মাঝে তিনি নিজেও মৃত্যুর পায়ের শব্দ খুব কাছ থেকে শুনতে পাচ্ছেন।

পিতৃবিয়োগের পর চলে গেলেন দাদাও–বুকভাঙা কান্নায় নবীনা সিনেমাহল লাগোয়া বহুতল গুমরে গুমরে উঠছিল। কাঁদছিলেন রচনা ব্যানার্জী। অভিষেকের মরদেহ আঁকড়ে ধরে। “কী করে হতে পারে? আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আমার বাবার পর যে কয়েকজন মানুষ আমার সবচেয়ে কাছের ছিলেন, তার মধ্যে তুমিই তো একজন। এটা কী করে হতে পারে?” থামাতে পারছিলেন না কেউই। এমনটাই ছিলেন অভিষেক চ্যাটার্জী। বন্ধু বান্ধব সহঅভিনেতাদের মুহূর্তে আপন করে নিতেন। সেই মানুষটা একা হেঁটে চলেছেন মৃত্যুর ওপারে। সহকর্মীদের চোখের জলে তাঁর নিজের চোখও কি ঈষৎ চিকচিক করছে না?

More Articles

;