পরিত্যক্ত শহর হলো জোশীমঠ? বাসিন্দাদের চোখের সামনেই ভাঙা হচ্ছে জীবনের শেষ সম্বল!
Joshimath Sinking: ২০০৯ থেকে ২০১২ অবধি চামোলি-জোশীমঠ অঞ্চলে ১২৮ টি ভূমিধস ঘটেছে!
উত্তরাখণ্ডের জোশীমঠে যে বাড়িগুলিতে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলি একেবারেই ভেঙে ফেলা হবে! বহু প্রজন্ম ধরে যে বাড়িতে কাটিয়েছেন পাহাড়ি মানুষরা, সেই বাড়িঘর রাতারাতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে চলেছে যাতে এই বিপজ্জনক বাড়িগুলি লাগোয়া অন্য বাড়িঘরের ক্ষতি না করতে পারে, জানিয়েছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলি ভাঙার কাজ শুরু হবে। বিপর্যস্ত জোশীমঠকে এখন তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে - 'ডেঞ্জার', 'বাফার' এবং 'সম্পূর্ণ নিরাপদ'। মাটি তলিয়ে বা ধসে যাওয়ার কারণে সম্ভাব্য বিপদের মাত্রার উপর ভিত্তি করে এই এলাকাটিকে ভাগ করা হয়েছে।
তলিয়ে যেতে বসা জোশীমঠের ৬০০ টিরও বেশি বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। বছরের গোড়ার দিনেই মাটির ভেতর থেকে চড়চড় আওয়াজ আর দেওয়াল, রাস্তা জুড়ে বিশাল বিশাল ফাটল ঘুমহীন রাত কাটাতে বাধ্য করছে এই এলাকার বাসিন্দাদের। জোশীমঠ হিমালয়ের অত্যন্ত দুর্বল একটি অংশ। সেখানে ব্যাপকহারে ভারী নির্মাণ মাটির ভিতকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৩ সালে যে এমন ঘটনা প্রথম ঘটেছে তা নয়, জোশীমঠ যে একদিন ধসে গিয়ে পরিত্যক্ত হবেই তা ১৯৭৬ সালেই জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলস্বরূপ, এখন যে বাড়িগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো ভেঙে ফেলা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
তলিয়ে যেতে বসা শহরটিকে 'দুর্যোগপ্রবণ এলাকা' বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এতকাল পরে টনক নড়ায় জোশীমঠ ও আশেপাশের এলাকায় নির্মাণ কার্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রায় ৪,০০০ মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। সরকারের হিসেব বলছে, জোশীমঠের ৩০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিংধর জৈন এলাকা এবং মারওয়াড়িতে জেপি কোম্পানি গেটের কাছে বদ্রীনাথ জাতীয় সড়কে ক্রমাগত ফাটল ধরছে, প্রতি ঘণ্টায় এই ফাটল বাড়ছে। ২০২১ সালে যখন চামোলিতে বেশ কয়েকটি ভূমিধস দেখা দেয় তখনই ঘরবাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছিল। বাসিন্দারা কাঠের খুঁটি ব্যবহার করে বাড়ি ঘরকে ঠেস দিয়ে রাখতে শুরু করেন। ২০২২ সাল জুড়ে প্রায়ই ভূমিকম্প দেখা দেয়। গতবছরই উত্তরাখণ্ড সরকার বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল তৈরি করে। এই বিশেষ দলটিই জানিয়েছিল, জোশীমঠের বেশ কয়েকটি অঞ্চল মনুষ্যসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক কারণে তলিয়ে যাচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Joshimath Landslide: নৈনিতাল শহরটি কুমায়ুন হিমালয়ে অবস্থিত এবং ২০১৬ সালের একটি রিপোর্ট জানান দিচ্ছে, শহরের অর্ধেক এলাকা ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষে ঢাকা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, ভূপৃষ্ঠের উপাদান, মানে জঙ্গল জমি ইত্যাদি সরিয়ে বা খনন করে বসতি স্থাপন হয়েছে, শহর, হোটেল ও অন্যান্য নানা কাঠামো গড়ে উঠেছে। পাথরে প্রাকৃতিক চ্যুতির কারণেও জোশিমঠের প্রায় সমস্ত ওয়ার্ডের ক্ষতি হয়েছে। গত বছর জোশীমঠ পৌরসভা একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে, এক বছরে শহরের ৫০০ টিরও বেশি বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত নির্মাণ, টানেল কাটা, শহরের বৃদ্ধির কারণে এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বড়সড় ভূমিধস হয়েছে। CSIR-এর প্রধান বিজ্ঞানী ডিপি কানুনগো জানিয়েছেন, ২০০৯ থেকে ২০১২ অবধি চামোলি-জোশীমঠ অঞ্চলে ১২৮ টি ভূমিধস ঘটেছে!
১৯৭৬ সালের মিশ্র কমিটি একটি রিপোর্ট পেশ করে। প্রায় ৫০ বছর আগেই ওই রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছিল যে, এমন তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটবে অচিরেই। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাস্তা মেরামত এবং অন্যান্য নির্মাণের জন্য, পাহাড়ের পাশে খনন বা ডায়নামাইট বিস্ফোরণ করে পাথর সরানো যাবে না। এই পাহাড়ের গাছগুলিকে শিশুদের মতো লালন-পালন করতে হবে। এসব সুপারিশ যে ফাইলবন্দি হয়েই পড়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। এখন, এই বিপর্যয়ের পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি সকলকে শহর বাঁচানোর আবেদন জানিয়েছেন। সেন্ট্রাল বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিবিআরআই) একটি দলের তত্ত্বাবধানে জোশীমঠের বাড়িগুলি ভেঙে ফেলা হবে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সও (এনডিআরএফ) এই দলটিকে সাহায্য করবে কাজে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Cracks: মানুষ চেয়েছে সুবিধাকে পর্বতচূড়ায় নিয়ে যেতে, উন্নয়নকে জলের তলায় ঢুকিয়ে দিতে, যাদের জন্য এই উন্নয়ন- বিপদে আসলে পড়ছেন তাঁরাই।

জোশীমঠকে বদ্রীনাথের 'শীতকালীন ঠিকানা' বলা হয়। প্রতি শীতে শহরের প্রধান বদ্রীনাথ মন্দির থেকে বাসুদেব মন্দিরে নামিয়ে আনা হয় বদ্রীনাথের মূর্তি। এটি শিখদের পবিত্র মন্দির হেমকুণ্ড সাহিবের প্রবেশদ্বারও।
জোশীমঠের এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির জন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ অপরিকল্পিত উন্নয়নকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের (এনটিপিসি) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত মাসে মুখ্যমন্ত্রীকে তিনবার চিঠি লিখেছিলেন তাঁরা। এনটিপিসি প্রকল্পের টানেলে বিস্ফোরণের প্রভাব সম্পর্কে সতর্কও করেছিলেন বাসিন্দারা। সরকার শোনেনি। সেই সরকারই এখন জনসাধারণকে এলাকা বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েছে। এনটিপিসি অবশ্য নির্মাণ প্রকল্প এবং জোশীমঠের পরিস্থিতির মধ্যে কোনও সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছে। সরকারি বিবৃতিতে এনটিপিসি জানিয়েছে, এনটিপিসি টানেলটি শহরের নীচে যায় না এবং এই মুহূর্তে সাইটে কোনও বিস্ফোরণের কাজ করাও হচ্ছে না।















