ফিরিয়েছে হিংসায় উন্মত্ত মণিপুর, খুদে কন্যাকে সন্তানস্নেহে বুকে টেনে নিল কেরল
Manipur Violence: শুরু হল হইনেইজেমের নতুন জীবন। নিজের বাসভূমি থেকে দূরে, পরিবারের থেকে দূরে, অন্য একটা সম্পূর্ণ নতুন জায়গায়।

আফগানিস্তান, সিরিয়া থেকে শুরু করে ইউক্রেন। এ দৃশ্য বড় চেনা। যুদ্ধক্লান্ত দেশ থেকে শয়ে শয়ে পালাচ্ছেন মানুষ। ঘর গেরস্থ ছেড়ে, বসতবাটি ছেড়ে কোনও মতে প্রাণ হাতে করে পালাচ্ছেন। গিয়ে উঠছেন প্রতিবেশী দেশে। এসব ছবি দেখে সচরাচর আর্দ্র হয় আমাদের চোখ। আহাউহু করি আমরা। অথচ নিজের দেশে, বাড়ির পাশের রাজ্য যখন জ্বলে, পোড়ে, মাংসপোড়া গন্ধ বেরোয়। তখন আমরা নিরো সেজে থাকি। বেহালা বাজাই। কোন কোন রাজ্য়ে এমন কাণ্ড আগেও ঘটেছে, আখছার ঘটে, তার নজির খুঁজে বেড়াই।
আড়াই মাস ধরে জ্বলছে মণিপুর। জাতি হিংসার নামে কার্যত ছাড়খার উত্তরপূর্বের ছোট্ট রাজ্যটি। মহিলাদের উপরে নির্যাতন সমস্ত সীমা ছাড়িয়েছে। প্রাণ হাতে করে কোনও রকমে রাজ্য ছাড়ছেন অসংখ্য মণিপুরবাসী। জড়ো হচ্ছেন প্রতিবেশী রাজ্যে। এমনিতেই ভারতের উত্তরপূর্বের মানুষেরা রূপগত কারণে এ দেশে কোণঠাসা। 'চিঙ্কি', 'চিনা' এমন নানা ডাক শুনতে তাঁরা অভ্যস্ত। ফলে অন্য রাজ্যে শরণার্থী মণিপুরবাসীদের অবস্থাটা আন্দাজ করা যায় সহজেই।
অশান্তির শুরু ৩ মে থেকে। ইতিমধ্যেই মণিপুরের জাতি হিংসার জের ১২৫টি প্রাণ কেড়েছে। ছাড়খার হয়ে গিয়েছে শতাধিক বাড়ি, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মন্দির। ভয়ে ঘর ছেড়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ। তার মধ্যে যেমন মেইতেই সম্প্রদায় রয়েছেন, তেমনই রয়েছে কুকি সম্প্রদায়ও। নষ্ট হয়ে গিয়েছে সারা জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, ঘরবাড়ি, জ্বলে গিয়েছে গোটা গ্রাম। যে যেখানে পেরেছেন পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে মাথা গুঁজেছেন।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur horror: একের পর এক মণিপুরে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, তা শিউড়ে ওঠার মতোই। এতদিন সিরিয়া, কাবুলে জঙ্গি-অত্যাচারের কথা শুনে ভয় পেয়েছি আমরা। মণিপুরে যা হচ্ছে, তাকে কি কোনও ভাবেই লঘু করে দেখা যায়?
মণিপুরের সেনাপতি জেলার নাখুজাং গ্রামের ভাইফেই পরিবার। হিংসায় জ্বলে গিয়েছে গোটা গ্রাম, পুড়ে গিয়েছে বাড়িঘর। পালিয়ে শরণার্থী শিবিরে উঠেছিলেন ছেলে-মেয়ে সংসার নিয়ে। কপালজোরে এক আত্মীয় কাজ করতেন কেরলে। তাঁর সহায়তাতেই কোনওমতে কেরলে পৌঁছয় ছোট্ট হইনেইজেম। পিছনে শরণার্থী শিবিরেই থেকে যায় বাকি পরিবার। শুরু হল হইনেইজেমের নতুন জীবন। নিজের বাসভূমি থেকে দূরে, পরিবারের থেকে দূরে, অন্য একটা সম্পূর্ণ নতুন জায়গায়।
সমুদ্র পেরোতে গিয়ে হাতটা ফস্কে গিয়েছিল। ভিড়ে ঠাসা নৌকো থেকে পড়ে গিয়েছিল একরত্তি ছেলেটা। সমুদ্র কাউকে ফেরায় না। আয়লানকে বালির বুকে নিশ্চিন্তে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল সমুদ্র। আর সাগর পাড় করা হয়নি সিরিয়ার সেই ছোট্ট শিশু আয়লান কুর্দির। সেই ছবি নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে। নিথর আয়লান কুর্দির নতুন দেশ পাওয়া হয়নি। সকলের ভাগ্য আয়লানের মতো হয়না, হয়নি হইনেইজেমেরও। নতুন ঘর খুঁজে পেয়েছে সে। পেয়েছে বন্ধুবান্ধব।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur Woman Molested: অমিত মালব্যর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী হিংসার অংশ হিসেবে নগ্ন করে হাঁটানো হয়েছে পঞ্চায়েত প্রার্থীকে!
কেরলে গিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে। পেয়েছে নতুন বন্ধুবান্ধব। রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে আসার সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র আনার কথা মনে ছিল না তাদের। স্কুললিভিং সার্টিফিকেট ছিল না, ছিল না টিসি-র কাগজও। তবে মানবতার কাছে কম পড়েছে সেসব কাগুজে নথি। সেসব ছাড়াই কেরলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে সে তৃতীয় শ্রেণিতে। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এটা ব্যতিক্রমী ঘটনা।
মণিপুরের মেয়ের জন্য সহজ নয় সবটা। অনেক মানিয়ে নেওয়া, মেনে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে সর্বক্ষণ। সবচেয়ে বড় বাধা বোধহয় ভাষার সমস্যা। তবু খুব মন দিয়ে নতুন ভাষাটাকে শেখার চেষ্টা করছে সে। মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, ভুলে যেতে চাইছে ভয়ঙ্কর সেই ট্রমা, সেদিন যার সামনে পড়তে হয়েছিল তাকে।


মণিপুর যদি হইনেইজেমের মাতৃভূমি হয়, তাহলে কেরল তাঁর পালক-মা। নতুন রাজ্যে এসে নতুন জীবন পেয়েছে ছোট্ট মেয়েটি। মণিপুরে থাকলে হয়তো তারও অবস্থা হত রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য করা সেসব নগ্নিকার মতোই। কিংবা শরীরে ক্ষত নিয়ে পড়ে থাকতে হত ক্ষেতে। তবে হইনেইজেমের কপাল ভালো, সেসব কিছুই হয়নি। সম্প্রতি হইনেইজেমের সঙ্গে তাঁক স্কুলে দেখা করতে আসেন কেরলের শিক্ষামন্ত্রী ভি শিবানকুট্টি। তিনি কথা বলেন খুদে মেয়েটির সঙ্গে। জানিয়ে দেন, আপাতত কেরলেরই পালিত কন্যা হইনেইজেম। আর তাই কোনও রকম ট্রান্সফার সার্টিফিকেট ছাড়াই তাকে স্কুলে ভর্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে রাজ্যের সরকার। মন্ত্রীমশাই জানিয়েছেন, পড়াশোনার ক্ষেত্রে সমস্ত রকম সাহায্য করা হবে সরকারের তরফ থেকে। এমনকী তাঁর স্কুলের পোশাক থেকে বইখাতা, সব কিছুই আসবে সরকারি তহবিল থেকে।
যে অশান্তির ভূমি থেকে উঠে এসেছে হইনেইজেম, সেই ক্ষত ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক ছোট্ট মেয়েটা। আপাতত সেইটুকুই চেষ্টা করছে কেরলের সব পক্ষ। তবে মণিপুরে যা হচ্ছে, যা হয়ে চলেছে, তার ব্যাখ্যা নেই। যেমন জানা নেই, কবে ফিরবে শান্তি বিধ্বস্ত মণিপুরে। তবু একদিন সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত অশান্তি ভেদ করে ফুটবে ভালোবাসা, সম্প্রীতি আর মৈত্রীর ফুল, আমরা শুধু এইটুকু প্রত্যাশা করতে পারি মাত্র।
















