'পথের পাঁচালী' কিংবা 'খারিজ' নয়, 'কান'-এর সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতেছিল এক অচেনা ভারতীয় ছবি!

Cannes Film Festival : কান ফিল্ম ফেস্টিভাল নিয়ে ভারতীয়দের মাতামাতির কোনো শেষ নেই। কিন্তু এই মাতামাতির ভেতর ফেস্টিভালে এ-দেশ থেকে যাওয়া ছবিগুলির দিকে ভারতীয়দের উৎসাহ কতটা, এ-বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়!

inscript
৪ মিনিট
'পথের পাঁচালী' কিংবা 'খারিজ' নয়, 'কান'-এর সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতেছিল এক অচেনা ভারতীয় ছবি!

কান ফিল্ম ফেস্টিভাল নিয়ে ভারতীয়দের মাতামাতির কোনো শেষ নেই। কিন্তু এই মাতামাতির ভেতর ফেস্টিভালে এ-দেশ থেকে যাওয়া ছবিগুলির দিকে ভারতীয়দের উৎসাহ কতটা, এ-বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়! কেন বলছি এ-কথা? বলছি, তার কারণ, বিগত বছরগুলিতে কান-এ ভারত থেকে যে-যে ছবি গেছে বা নমিনেটেড হয়েছে তার কতদূর খোঁজ আমরা রাখি? হ্যাঁ খোঁজ রাখি, যদি সে-ছবিগুলি যায় হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে এবং সে ছবিগুলির মধ্যে বিস্তৃত বাণিজ্য প্রবণতা থাকে। কিন্তু কান-এর ইতিহাসে ভারতের ভূমিকা বা উপস্থিতি দেখলে বোঝা যায় এমন অনেক ছবি ভারত থেকে এই ফেস্টিভালে গিয়েছে যা ঠিক মূল ধারার নয়। এবং হয়তো সে-কারণেই আমরা সে-ছবির বিষয়ে অত খবর রাখি না।

এখানে প্রথমেই বলতে হয়, ‘পথের পাঁচালী’র কান-এ সেরা হিউম্যান ডকুমেন্টারি বিভাগের পুরস্কার লাভ এবং সে-সম্পর্কে বাঙালিদের মধ্যে অদ্ভুত গর্বের কথা। অবশ্য এ- ঘটনা তো গর্ব করার মতনই। কিন্তু এই জাতি অহংকারের মধ্যে অনেকেরই মনে একটা ভুল তথ্য থেকে গেছে। অনেকেই মনে করেন, ‘পথের পাঁচালী’-র হাত ধরেই প্রথম কান ফিল্ম ফেস্টিভালে সম্মান অর্জন করেছিল ভারতীয় ছবি। বলা বাহুল্য, এ-তথ্য ভুল। এখানে জানাই, স্বাধীনতার এক বছর আগেই, ‘নিচা নগর’ নামে ১৯৪৬ সালে একটি ছবি তৈরি করেছিলেন চেতন আনন্দ। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন খাজা আহমেদ আব্বাস এবং হায়াতুল্লাহ আনসারী। সমাজের শ্রেণি বৈষম্য, ধনি-দরিদ্রদের মধ্যে বিভাজনর রেখা, এই সমস্তকে কেন্দ্র করেই ছবিটি নির্মিত হয়েছিল সেই সময়। ম্যাক্সিম গোর্কির লেখা ‘দ্য লোয়ার ডেপথস’ নাটককে নির্ভর করে এই ছবির কাহিনি এগিয়েছে। জানলে হয়তো অনেকেই অবাক হবেন যে, ‘নিচা নগর’ একমাত্র ভারতীয় ছবি যা কান ফিল্ম ফেস্টিভালে সর্বোচ্চ পুরস্কার লাভ করেছিল এবং ১৯৪৬ সালের পর আর কোনো ভারতীয় ছবি এখনও পর্যন্ত এই সম্মান পায়নি। প্রসঙ্গত জানাই, ‘নিচা নগর’ কখনো রিলিজ করেনি। তাই বেশির ভাগ ভারতীয়রাই দেখতে পাননি ছবিটি। অবশ্য, ১৯৮০ সালে দূরদর্শনে একবার মাত্র ‘নিচা নগর’ টেলিকাস্ট হয়!

'নিচা নগর'-এর পোস্টার

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যদি ফিল্ম দিলে না 'কান'-এ

Cannes Film Festival: পৃথিবীর তথাকথিত সব চেয়ে বেশি সংখ্যক ছবি যে দেশে তৈরি হয় সেই ভারতবর্ষের একটা সুযোগ মূল প্রতিযোগিতায় কেন আসবে না এত বছরে?

আচ্ছা, এরপরেই কি আমরা ভাবব ‘পথের পাঁচালী’-র কথা? তা কিন্তু নয়। কারণ, এর মাঝে রয়েছে আরও একটি ভারতীয় ছবি যা কান-এ বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিল। ছবিটির নাম: 'বুট পালিশ'। ১৯৫৪ সালে ছবিটি রিলিজ করে। ছবিটির ডিরেক্টর ছিলেন প্রকাশ আরোরা এবং প্রযোজনা করেছিলেন রাজ কাপুর। ছবিতে, দু-জন শিশুর শৈশবের জীবন সংগ্রাম, রাস্তায় ভিক্ষে করা, দারিদ্র, এবং এ-সমস্ত কিছুর মধ্যে মিলেমিশে থাকা হাস্যরস ছবিটিকে অনন্য করে তুলেছিল। এই ছবিটিতে ‘বেলু’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নাজ ১৯৫৫ সালের কান ফিল্ম ফেস্টিভালের

'বুট পলিশ'-এর পোস্টার

‘স্পেশাল মেনশন’ পেয়েছিলেন। এর ঠিক পরের বছর, ১৮৫৬ সালে ‘পথের পাঁচালী’ কান-এর ‘সেরা হিউম্যান ডকুমেন্টারি’ সম্মান অর্জন করে। অর্থাৎ, ‘পথের পাঁচালী’ আগেও ভারত দু-বার ওই আন্তর্জাতিক ফেস্টিভালের সম্মানে ভূষিত হয়েছিল। তবুও অজানা কোনও কারণে এ-তথ্য আমরা যেন ভুলে যাই। এখানে, ‘নিচা নগর’ থেকে এখনও পর্যন্ত যে যে ভারতীয় ছবি কান-এ সম্মানিত হয়েছে তার একটি আপাত তালিকা রাখার চেষ্টা করছি:

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফলের দোকান থেকে বলিউডের শেষ কথা! ধাপে ধাপে যেভাবে তৈরি হয়েছে টি-সিরিজের সাম্রাজ্য

T-Series: চলুন জেনে নেওয়া যাক, গুলশন কুমারের টি-সিরিজ তৈরির গল্পটা।

১৯৪৬। ‘নিচা নগর’। কান-এর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, পাম ডি'অর।

১৯৫৫। ‘বুটপলিশ’। অভিনেত্রী হিসেবে, বেবি নাজ স্পেশাল মেনশন

১৯৫৬। ‘পথের পাঁচালী’। সেরা হিউম্যান ডকুমেন্টারি

১৯৫৬। ‘গৌতম বুদ্ধা’। স্পেশাল মেনশন ফর ডায়রেকশন

১৯৮৩। ‘খারিজ’। কান-এর জুরি প্রাইজ

১৯৮৮। ‘সালাম বম্বে’। কান-এর গোল্ডেন ক্যামেরা সম্মান

১৯৮৯। ‘সাজি এন কারুন’। কান-এর ক্যামেরা ডি ওর

১৯৯৯। ‘মারানা সিংহাসানাম’। কান-এর ক্যামেরা ডি ওর

২০০২। ‘আ ভেরি ভেরি সাইলেন্ট ফিল্ম’/ জুরি প্রাইজ, শর্ট ফিল্ম

২০০৬। ‘প্রিন্টেড রেনবো’। ইয়ং ক্রিটিক্স পুরস্কার শর্ট ফিল্মের জন্য

২০১৩। ‘লাঞ্চ বক্স’। গ্র্যান্ড রেল অ্যাওয়ার্ড

২০১৫। ‘মশান’। এফআইপিআরইএসসিআই সম্মান

২০১৬। ‘দ্য সিনেমা ট্রাভেলারস’। স্পেশাল মেনশন

২০২১। ‘আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং’। গোল্ডেন আই সম্মান

২০২২। ‘অল দ্যাট গোল্ডেন ব্রেথস’ গল্ডেন আই পুরস্কার

২০২৪। ‘অল উই ইমাজিন’। গ্রান্ড পিক্স পুরস্কার

২০২৪। ‘সানফ্লাওয়ার ওয়ার দ্য ফাস্ট ওয়ান্স টু ন’। প্রেমিয়ার প্রিক্স সম্মান

২০২৪। ‘দ্য শেমলেস’।সেরা অভিনেত্রী, অনসূয়া শর্মা

প্রশ্ন হল, এই তালিকার মধ্যে থেকে ক-টা ছবি আমরা দেখেছি? এমনকি ক-টা ছবি সম্পর্কে আমরা জানি? ‘লাঞ্চ বক্স’ কিংবা ‘মশান’ এই ছবিগুলো হয়তো আমরা অনেকেই দেখেছি, তার কারণ এগুলি মূল ধারার হিন্দি ছবির মধ্যে পড়ে। কিন্তু তার বাইরে ‘দ্য সেমলেস’ বা অন্যান্য ছবিগুলি কি আমরা দেখেছি? এই ছবিগুলি সম্পর্কে আমরা যে তেমনভাবে জানি না এর একটা কারণ হতে পারে, যেহেতু ছবিগুলির সঙ্গে বানিজ্যিক ছবির তেমন একটা সম্পর্ক

'কান'-এ 'লাঞ্চ বক্স'-এর জন্য ইরফান খান ও নাওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি

নেই, তাই গণমাধ্যম ছবিগুলিকে বিপুলতর প্রচারের আলোয় আনেনি। অর্থাৎ এখান থেকে এ-কথাও প্রমাণিত হয় যে, কান-এ সম্মান পেলেও সেই ছবি যে ভারতে সমাদৃত হবে তা কিন্তু নয়। এর একটা কারণ হয়তো কান-এ পুরস্কৃত ভারতীয় ছবিগুলির সঙ্গে ভারতের মূল ধারার সিনেমা দর্শকের মনোভাবের বিপুল পার্থক্য!

কারণ যাই হোক, কান ফিল্ম ফেস্টিভেলকে নিয়ে ভারতবাসীর এক আভিজাত্যময় উত্তেজনা প্রত্যেক বছরের প্রথমার্ধেই আমরা দেখতে পাই। অথচ সেই উত্তেজনার গভীরে ঐশ্বর্য রাই এবার কী পোশাক পরে হাঁটলেন, তারই আলোচনা প্রধান হয়ে থাকে। বলা বাহুল্য, 'কান' কেবল এইটুকু নয়। গোটা পৃথিবীর চলচ্চিত্র চিন্তাকে এই ফেস্টিভাল ধরে রাখে। আরেকবার অনুরোধ করব, উপরে উল্লেখিত তালিকাটি দেখার জন্য। সারা পৃথিবীর সিনেমার নিরিখে এই তালিকা খুবই সামান্য নয় কি? যে কয়েক জন নতুন পরিচালক বিশ্বমানের ছবি তৈরি করছেন, নতুন ধরনের অভিনয়ের কথা ভাবছেন, তাঁরাও দেশের উদাসীন মনোভাবের সামনে একা। কান-এ কোন ছবি সম্মানিত হল, সেদিকে না তাকিয়ে অভিনেত্রীদের পোশাক উদযাপন অথবা গত শতাব্দীর কোনো প্রাপ্তিকেই অহংকারের ঢাল করে নেওয়া এখন দেশবাসীর আম আচরণ! আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতীয় সিনেমার দুর্দশার এ এক প্রধান কারণ।

লিখেছেন
inscript
inscript
15 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।