এক কিডনি গ্রাম! তালিবান জমানায় অঙ্গ বিক্রি করেই বাঁচতে হচ্ছে ওদের

One Kidney Village: শুধু খাবার কেনা বা দেনা মেটানোর জন্যে নয়, নিজেদের সন্তানকে যাতে বিক্রি করতে না হয় সেই কারণেও তাঁরা এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
এক কিডনি গ্রাম! তালিবান জমানায় অঙ্গ বিক্রি করেই বাঁচতে হচ্ছে ওদের

ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনা অভিযান নিয়ে সমস্ত খবর, উত্তেজনা যেন আড়ালে চলে গিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ইতিমধ্যেই ঘরছাড়া হয়েছেন, চূড়ান্ত কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। রুশ এবং ইউক্রেনের সরকারের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয়েছিল কয়েক ঘণ্টার, যাতে সাধারণ মানুষেরা যুদ্ধক্ষেত্র, না, বলা উচিত তাঁদের বাসস্থান যাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে, তা ছেড়ে পালাতে পারেন। সারা বিশ্বের নজর টিকে ছিল ইউরোপের এই ভূখণ্ডে। কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু ইউক্রেনের মানুষই যুদ্ধের শিকার হয়ে অতি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন না। সেই তালিকায় রয়েছে আরও অনেক দেশ, তারই মধ্যে অন্যতম আফগানিস্তান।

তালিবানরা ক্ষমতায় আসার পর দেশটার ওপর চেপেছে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক বাধা নিষেধ। অর্থনীতির অবস্থা ঠেকেছে তলানিতে। তালিবানরা যদিও যুদ্ধ জয়ের এত মাস পরেও বিজয় উৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশের মানুষকে বার্তা দিচ্ছেন যে তাঁরাই আফগানিস্তানের সব সমস্যার শ্রেষ্ঠ সমাধান। কিন্তু আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হেরাটের চিত্র কিন্তু অন্য রকম কথা বলছে। সেই চিত্র ভয়াবহ এবং আতঙ্ক জাগানোর জন্যে যথেষ্ট। কী সেই চিত্র?

হেরাটের একদম লাগোয়া একটি গ্রাম হল সায়শানবা বাজার। সেই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই তালিব-আমেরিকান যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষে কোনও রকমে জীবিত আছেন। সেই গ্রামের একজন হলেন নুরুদ্দিন। তাঁর কোনও জীবিকা নেই, মাথার ওপর অনেক টাকার দেনা এবং নিজের শিশুদের খেতে দিতে পারছেন না। উপায় না পেয়ে নিজের একটা কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু নুরুদ্দিন একা নন, এই গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দা এক পথে হাঁটছেন এবং এমন ভাবেই তাঁদের এই অঙ্গ বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে গ্রামের নাম হয়েছে, 'এক কিডনি গ্রাম', বা One Kidney Village।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুজোয় বাড়ে লাশ, মড়া পোড়ানোর গন্ধে যেভাবে কাটে ডোমের দুর্গোৎসব...

Durgapuja of Female Dom: ডোমের না আছে বোধন, না বিসর্জন, না আছে বড়দিন, না আছে মেলা। পুজোয় মড়া বাড়ে, মড়া বাড়লে কাজ বাড়ে, চুল্লির বিশ্রাম নেই।

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন। তালিবানের 'দয়ায়' প্রায় আড়াই কোটি মানুষ আজ খরার কবলে পরতে চলেছেন, পাঁচ লক্ষ মানুষ হারিয়েছেন জীবিকা নির্বাহের পথ। শুধু খাবার কেনা বা দেনা মেটানোর জন্যে নয়, নিজেদের সন্তানকে যাতে বিক্রি করতে না হয় সেই কারণেও তাঁরা এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আজিজার কথাই ধরা যাক। ২০ বছর বয়সী আজিজার তিন সন্তান। তিনি বলছেন, তিনি অনেকদিন ধরেই দালালের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি বিক্রি করার চেষ্টায় আছেন, কিন্তু ক্রেতা পাচ্ছেন না। এইভাবে চলতে থাকলে তাঁকে যে তাঁর এক বছর বয়সী কন্যাকে বিক্রি করে দিতে হবে।

এমনও নয় যে এই ভাবে কিডনি বিক্রি করে তাঁদের বিশেষ লাভ হয়েছে। নুরুদ্দিন এখন আর কোনও কাজ করতে পারেন না, কোনও ভারী বস্তু ওঠাতে তিনি আর সক্ষম নন। এমনকী কিডনি বিক্রি করে খুব বেশি অর্থও তিনি পাননি। তাঁর একটি কিডনি বিক্রি হয়েছে মাত্র দেড় হাজার ডলারে। আগে একটি কিডনি বিক্রি করে পাওয়া যেত প্রায় চার হাজার ডলার। কিন্তু এমন মন্দা এসেছে আফগানদের জীবনে, যে নিজেদের অঙ্গও বিক্রি করে দিতে হচ্ছে, আর দামও খুব বেশি পাচ্ছেন না। এখন নুরুদ্দিনের ভরসা তাঁর বারো বছরের পুত্র। জুতো পালিশ করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে সে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উলঙ্গ হয়ে ষাঁড় ধরা, ঠোঁট কেটে চাকতি বসানো, অবাক করবে আফ্রিকার আদিবাসীদের যেসব রীতি

African Tribes: শিশুকন্যাদের ঠোঁট ফুটো করে কাঠের টুকরো ঢুকিয়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ফুটোর আয়তন বাড়তে থাকত এবং সেখানে বড় প্লেট বসানো হয়।

কিন্তু এই ভাবে অঙ্গ বিক্রি করা তো বেআইনি? হ্যাঁ, কিন্তু তালিবানের রাজত্বে আইনের শাসন কি আশা করা সম্ভব? কোনওভাবেই নজরদারি করা হয় না এই ধরনের বিষয়ের ওপর এবং দালালরা খুব স্বাধীন ভাবেই নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা ক্রেতা খোঁজেন, সেটা শুধু আফগানিস্তানে সীমাবদ্ধ নয়, পাকিস্তান, এমনকী ভারতেও আফগান কিডনি বিক্রি হচ্ছে।

এই গ্রামের একটি পরিবারের এতটাই ভয়াবহ অবস্থা, যে পাঁচ ভাইকেই তাঁদের কিডনি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। ওই পরিবারের একজন গুলাম নবী বলছেন, "আমাদের দেনা আরও বেড়েছে, দারিদ্রে আরও ডুবে যাচ্ছি।" পাঁচ ভাই কিডনি বিক্রি করা সত্ত্বেও তাঁদের রেহাই মিলছে না।

অন্যান্য দেশে কিডনি বিক্রি বা দান করলে দাতাকে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়, পর্যাপ্ত খাবার খেতে হয়, এবং সব নিয়ম মেনে চললে তিনি নিয়মিত জীবনে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু দারিদ্র্য মেটাতে যাঁরা এই কাজ করছেন, তাঁদের জন্য অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসাও বিলাসিতা। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা অকেজো হয়ে পড়ছেন। এতটাই খারাপ অবস্থা হচ্ছে যে তাঁরা বেশিরভাগ কাজ করার জন্যই আর সক্ষম থাকছেন না।

পশ্চিমি নেতারা কি শুনছেন? জো বাইডেনের কাছে কি কেউ পৌঁছে দিয়েছে এই খবরগুলো? বা রাষ্ট্রপুজ্ঞের কাছে? সব উন্নত দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করছে, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ইউক্রেনের যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাসিন্দাদের প্রতি, যা অবশ্যই খুবই প্রশংসনীয়। কিন্তু হেরাটের এই মানুষরা? তাদের মর্যাদা কি ইওরোপিয়ানদের কাছে দ্বিতীয় শ্রেণির? পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমে অনেক জায়গাতেই সাংবাদিকদের মুখে শোনা গেছে আকুতি, এরা আফগান বা সিরিয়ার বাসিন্দা নন, এরা ইউরোপিয়ান। তাঁরা ইউরোপিয়ানদের কষ্ট চোখে দেখতে পাচ্ছেননা। কিন্তু সিরিয়া? আফগানিস্তান? অনুন্নত দেশ বলেই কি এমন হওয়া স্বাভাবিক!

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।