তুলকালাম ঘটাবে ভক্তরা, ভয়ে পর্দায় রজনীকান্তের চরিত্রদের মারতে সাহস পাননি পরিচালকরা
Rajinikanth superstar : এখানে আর এমন কী আছে? সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে, চুল আর সানগ্লাস ঠিক করার পর উত্তর চলে আসবে, “আমাদের এখানে রজনীকান্ত আছেন!”

পৃথিবী উল্টে যাক, তবুও তাঁর গায়ে কোনওদিনই গুলি লাগবে না। গুলি এলে তিনি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবেন। কিংবা আঙুলের এক টোকায় ফিরিয়ে দেবেন ভিলেনের দিকে। জানা যায়, একবার তিনি প্লেনে করে বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। হঠাৎই তাঁর মানিব্যাগটি নিচে পড়ে যায়। তারপরই পৃথিবীখ্যাত সুইস ব্যাঙ্কের পথচলা শুরু হয়। দীপাবলিতে তাঁর জন্য রকেটবাজি তৈরি করে খোদ নাসা! এক কথায় তাঁর অসাধ্য সাধন কিছুই নেই। তাঁর বয়স বাড়ে না কখনও। কোনও বিদেশি যদি ভারতে এসে বলেন, ওখানে তো সুপারম্যান আছে। এখানে আর এমন কী আছে? সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে, চুল আর সানগ্লাস ঠিক করার পর উত্তর চলে আসবে, “আমাদের এখানে রজনীকান্ত আছেন!”
‘সুপারস্টার’ – এই ভারতে অনেক তারকাই এই খেতাব পান। রজনীকান্তও পেয়েছেন। তবে নিছক সুপারস্টার বললে বোধহয় তাঁকে ঠিক ব্যাখ্যা করা হয় না। তাঁর সিনেমা রিলিজ করা মানে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অঘোষিত বনধ শুরু হয়ে যায়। ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ের জন্য চলে মারামারি, হাতাহাতি। তাঁর কিং সাইজ পোস্টার এনে শুরু হয় পুজো আচ্চা। আর জন্মদিন? সে যেন দেবতাকে মর্ত্যে আবাহনের মতো জোগাড়! কাট আউট, ফটো সমস্ত কিছুতে দুধ ঢেলে পুজো দেওয়া হয়। নিষেধ করলেও শুনবে কে! ভগবানের জন্মদিনে ভক্তরা একটু প্রণামও জানাবে না? তা কি হয়?
রজনীকান্ত থেকে এবার আসা যাক শিবাজি রাও গায়কোয়াড়ের দিকে। রজনীর আসল নাম। যতই আকাশচুম্বী উচ্চতায় পৌঁছে যান, দিনের শেষে আজও শিবাজির সেই দারিদ্র, সেই কষ্টকর জীবনের দিকে ফিরে তাকান তিনি। সে-ই বারবার জানান দেয়, পা রাখো মাটিতে। ১৯৫৫ সাল। একরত্তি শিবাজি গায়কোয়াড়ের বয়স তখন পাঁচ বছর। হঠাৎই মধ্যবিত্তের সংসারে নেমে আসে দুর্যোগ। মারা যান তাঁর মা জিজাবাই। অভাব অনটনের সংসারে নেমে এল আরও খানিক অন্ধকার। মারাঠি পরিবারের সন্তান শিবাজি রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি হয়ে পড়াশোনাও শুরু করেন। কিন্তু সেইসঙ্গেই দারিদ্র্যের বোঝাও যে সামলাতে হয়। অল্প বয়স থেকেই তাই কুলি, কারপেন্টার হিসেবে কাজ করেছেন। লোকের মোট বয়েছেন, তাঁদের গালাগালিও খেয়েছেন। আর পাঁচটা কুলির মতোই রোদে ঝড়ে ছুটেছেন তিনি। হাজার হোক, এখান থেকেই দু’টো পয়সা আসে ঘরে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Suchitra Sen: তরুণ মজুমদারেরও মেজাজটা গেল চড়ে। সুচিত্রাকে বললেন, "ওঁর সঙ্গে কাজ করা যায় কিনা তা পরের কথা। কিন্তু যা ব্যবহার করলেন, আপনার মতো আর্টিস্টের সঙ্গেও কাজ করা যায় না।"
সেই রামকৃষ্ণ মিশনই শিবাজির ভেতর অভিনয়ের পোকা নড়িয়ে দেয়। সেখানেই নাটকে টুকটাক অভিনয় করতেন। স্বপ্ন দেখতেন, আমারো একদিন বড়ো পোস্টার পড়বে শহরের ব্যস্ততম মোড়ের মাথায়। লাইন দিয়ে লোকে আসবে তাঁর কাছে। তাঁর সৃষ্টি, সিনেমার কাছে। বেঙ্গালুরুর বিটিএস কোম্পানির বাস কন্ডাক্টর থাকার সময়ও সেই স্বপ্ন নেমে আসত শিবাজির চোখে। মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের হোর্ডিং দেখে আশা হতাশার দোলাচলে থাকতেন তিনি। আদৌ কি স্বপ্ন পূরণ হবে তাঁর? বড় পর্দায় নামতে পারবেন তিনি?
কিন্তু নামবেনই বা কী করে? বাস কনডাক্টরের মাইনেটাই তো একমাত্র ভরসা। অভিনয় নিয়ে ভর্তি হলে সেই কাজ কামাই করতে হবে। ফলে কমবে মাইনে। সেটা তো সমস্যা! বাসে যেতে যেতেই যাত্রীদের মনোরঞ্জন করতেন শিবাজি। ওইটুকুই ছিল তাঁর অভিনয় প্রয়াস। বাসের লোহার খাঁচার গণ্ডি, দারিদ্র থেকে কি কখনই ডানা মেলতে পারবেন না তিনি? হঠাৎই ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন রাজ বাহাদুর। ঠিক যেন সিনেমার স্ক্রিপ্ট! রাজ বাহাদুর শিবাজির সঙ্গেই বিটিএস সার্ভিসে কাজ করতেন। শিবাজির কাছের বন্ধু তিনি। তাঁর ইচ্ছে শুনে এক ডাকে চলে এলেন রাজ। পকেট থেকে বের করে শিবাজির হাতে রাখলেন বেশকিছু টাকা। যাও তুমি, তোমার লক্ষ্যের দিকে যাও। যতদিন না রোজগার হচ্ছে, রাজই সাহায্য করে গেলেন শিবাজিকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Uttam Kumar-Manna Dey: পরিচালককে বললেন, “‘আমি আগন্তুক, আমি বার্তা দিলাম’— মান্নাদার মতো ভারতবর্ষের কোনও শিল্পীই গাইতে পারবে না।” খুব একটা ভুল যে বলেননি, তার প্রমাণ তো হাতেনাতেই। মান্না দে-ই নেপথ্যসঙ্গীতে রয়ে গেলেন।
১৯৭৫ সালে কে বালাচন্দরের একটি সিনেমা বেরোয়। নাম ‘অপূর্ব রাগাঙ্গাল’। সেখানেই শ্যামলা, সাধারণ চেহারার এই ছেলেটির সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতীয় সিনেমার। আর তারপর? এই ছেলেটাই ২০০৭ সালে ‘শিবাজি’ বলে একটি সিনেমায় অভিনয় করে। কিন্তু ততদিনে আসমুদ্র হিমাচল তাঁকে চিনে গিয়েছে। ‘শিবাজি’ নন, তিনি এখন রজনীকান্ত। জ্যাকি চ্যানের পরই এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতা তিনি। তাঁর সিনেমা ‘শিবাজি’ প্রথম ভারতীয় সিনেমা, যেটি ১০০ কোটির গণ্ডি ছাড়ায়। শ্যামলা, তথাকথিত হিরোর চেহারা নয়, সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মাননি, বরং প্রতিটা দিন দারিদ্রের কোরাল রূপ দেখে গিয়েছেন। সেই মানুষটিই এখন ‘থালাইভা’। বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে তিনি ‘ভগবান’…
আর ভগবান বলেই তাঁর মৃত্যু হয় না! রজনীকান্তের সিনেমা যারা দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন, অধিকাংশ সিনেমায় তিনি শেষ পর্যন্ত বেঁচেই থাকেন। মৃত্যু হয়নি তাঁর। কেন? পর্দায় রজনীকান্তের মৃত্যু দেখানোর পর যে আর রক্ষে থাকবে না! তাঁর ভক্তদের প্রতিবাদে জনজীবন ব্যহত হয়ে যাবে। ভগবানের মৃত্যু এভাবে কেন সহ্য করবে সাধারণ মানুষ? যতই রুপোলি পর্দা হোক না কেন, থালাইভা তো একজনই। স্রেফ তাঁকে নিয়ে সিবিএসসির সিলেবাসে একটি আলাদা অধ্যায়ই রয়েছে। নাম 'ফ্রম বাস কনডাক্টর টু সুপারস্টার'। এমনকী, অস্ট্রেলিয়ার ডার্বি পুলিসও গাড়ি চালানো নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে রজনীকান্তের আশ্রয় নেয়। থালাইভার সিনেমার একটি দৃশ্য দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করেন তারা।
স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন তাঁর থেকে অনুপ্রেরণা পান। সেই রজনীকান্তই একটি কৌতুক বিভাগের স্রষ্টা। ভারতীয় হয়ে ‘রজনীকান্ত জোকস’ শোনেনি, এমন মানুষ বোধহয় খুবই কম। নেই-ই বলা যায়। একের পর এক সিনেমায় তাঁর অতিমানবিক চরিত্রদের প্রভাবেই তৈরি হয়েছে এমন সব জোকস। যেমন, রজনীকান্ত কখনও জল ভরতে যান না। সোফায় বসে স্রেফ হাততালি মারেন। সঙ্গে সঙ্গে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের বিক্রিয়া হয়ে তৈরি হয় জল। কিংবা ধরা যাক, রজনীকান্তের বন্দুকে একটিই গুলি। আর সামনে পাঁচজন ভিলেন। ওই একটি গুলি ছুঁড়েই রজনীকান্ত পাথর ছোঁড়েন। ব্যস, পাথরের ধাক্কায় গুলি পাঁচ টুকরো হয়ে পাঁচ ভিলেনকে খতম করে! যত দিন গিয়েছে, এই জোকসের ভাণ্ডার ততই বেড়েছে।
৭২ বছরে পৌঁছে সিনেমার সঙ্গে জীবনে জুড়ে নিয়েছেন রাজনীতিকেও। পর্দার নায়ক রজনীকান্ত বাস্তব জীবনে একদম অন্য মানুষ। সেই শিবাজির ছাপই হয়তো তাঁর সঙ্গে রয়ে গিয়েছে। রয়ে যাবে আজীবন। কেবল মারাঠি ভক্তদের একটাই দুঃখ। জন্মসূত্রে মারাঠি হলেও, সেভাবে এই ভাষার সিনেমায় থালাইভাকে দেখা যায়নি। ভবিষ্যতে কি সেই সুযোগ আছে? রজনীকান্ত একবার ভেবে নেওয়া মানে তো সিনেমাটিই তৈরি হয়ে যাওয়া। সেই আশাতেই প্রহর গুনছেন ভক্তরা।
















