দেশের মুখ পুড়িয়েছে দিল্লি! জাতীয় 'রেপ ক্যাপিটাল'-এ কেন নীরব বিজেপি?
Rape Capital Delhi: করোনা মহামারীর মধ্যেই একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই এক করোনা রোগীকে ধর্ষণ করেছিল অ্যাম্বুলেন্স চালক।

দিল্লি! নামটা শুনলেই ভেসে ওঠে একটা এমন শহরের কথা যেখানে মানুষ প্রতিদিন যায় নিজের ভাগ্য ফেরাতে। প্রসিদ্ধ সৌধ থেকে শুরু করে দেশের সব থেকে বড় নেতাদের বাসস্থান, সবকিছুই রয়েছে এই দিল্লির বুকে। সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন সবকিছুই ভারতের দিল, দিল্লিতে। কিন্তু এই ছবির একটা অন্য দিকও রয়েছে, যে দিকটা দেখাতে ভারত হয়তো খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না। ভারতের জাতীয় রাজধানী হওয়ার পাশাপশি ভারতের 'রেপ ক্যাপিটাল'ও ভারতের এই প্রাণের শহর দিল্লি। ২০২০ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের এই রাজধানীতে প্রতি ৫ ঘণ্টা ১০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হন। শুধু মহিলারাই নন, বছর ১০-এর নাবালক শিশু থেকে শুরু করে ৮৬ বছরের বৃদ্ধাও যৌন লালসার শিকার হয়ে থাকেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-এ দিল্লিতে মহিলাদের উপরে অত্যাচারের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ১,১০০ জন মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়েছে। ২০২১ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ১,০৩৩। ২০২১ সালের তথ্যের সঙ্গে ২০২২ সালের পরিসংখ্যান হিসাব করলে এই ঘটনা ৬.৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মোটেও ভালো সংকেত নয়। অন্যদিকে, রাজধানীতে প্রায় ২,২০০ জন মহিলাকে অপহরণ করা হয়েছে, যা ২০২১-এর থেকে অনেকটাই বেশি। ২০২১ সালে সারা বছর ধরে ৩,৭৫৮ জন মহিলা অপরাধের সম্মুখীন হয়েছিলেন। আর ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনেকটাই বেশি বলা চলে। এছাড়াও, গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়ে থাকেন অনেক বেশি মহিলা। এই পরিসংখ্যান ৩০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ২০২২ সালেই এই সংখ্যাটা ২,৭০৪ হয়ে গিয়েছে। ২০২১-এ এই সংখ্যা ছিল ২,০৯৬।
দিল্লির ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে যদি কোনও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়, তবে অবশ্যই সেটি হবে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্ভয়া কাণ্ড। ঘটনাটা একটু মনে করিয়ে দেওয়া যাক। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে ওই তরুণী এবং তাঁর পুরুষ বন্ধু রাত ৯ টার পরে বাসে উঠেছিলেন। তারপরে বাসচালক এবং অন্য পাঁচ জন তরুণীকে গণধর্ষণ করে এবং তাঁর বন্ধুকে মারধর করে। পরে তাঁদের দু'জনকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়। পরে কয়েকজন পথচারী তাঁদের দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন এবং তাঁদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুরুতর আঘাত নিয়ে ১৫ দিন পর্যন্ত ওই তরুণী জীবিত ছিলেন। তাঁর বন্ধু বেঁচে আছেন ঠিকই কিন্তু এখনও সেই ভয়াবহ স্মৃতি তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। এই নির্যাতনের বীভৎসতা গোটা ভারতকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সংবাদ মাধ্যম তরুণীর নাম দেয় 'নির্ভয়া'।
অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, ফাঁসি দেখে দেশ তৃপ্ত হয়েছে কিন্তু এতে কি দিল্লিতে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা কমেছে? এর সহজ উত্তরটা, 'না'। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ষণের সংখ্যা আরও বেড়েছেই বলা চলে। আর সব থেকে খারাপ বিষয়টি হল, এই ধর্ষণের শিকার বেশিরভাগ মহিলাই তাঁদের ধর্ষকদের দোষী সাব্যস্ত হতে দেখেন না ভারতে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় দিল্লিতে ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বেশি। যেটুকু খবর সামনে আসে, তাতে হয়তো অপরাধের ছিটেফোঁটাও প্রমাণিত হয় না। মানবাধিকার কর্মী এবং আন্দোলনকারীরা বারবার বলে এসেছেন, দিল্লিতে ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ধর্ষণের সব খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না, শুধুমাত্র নৃশংস এবং সাড়া জাগানো ঘটনাগুলোর জায়গা হয়ে থাকে সংবাদপত্রের পাতায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Child Abuse in India: ভারতে কয়েক হাজার শিশু প্রতিবছর ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আর এই ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন করছেন শিশুটির খুব পরিচিত মানুষরাই।
করোনা মহামারীর মধ্যেই একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই এক করোনা রোগীকে ধর্ষণ করেছিল অ্যাম্বুলেন্স চালক। শুধুই কি মহিলাদের উপরে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে? শিশুদের উপরেও যৌন নির্যাতনের ঘটনা কম নয়। কিছুদিন আগেই চার বছরের এক শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছিল দেশের রাজধানী দিল্লিতে। পরের দিন ভোরে এলাকার একটি নির্জন পার্ক থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
২০২১ সালের অগাস্ট মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মাত্র নয় বছরের এক শিশুকন্যাকে শ্মশান ঘাটে ধর্ষণ করার পর ধর্ষকরা জোর করে তার দেহ জ্বালিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। নিহতের পরিবার ও এলাকার বাসিন্দারা এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করলে ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর দিল্লি পুলিশ একজন পুরোহিত এবং তার তিনজন সঙ্গীকে গ্রেফতার করে। দিল্লি সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়, এই ঘটনার দ্রুত বিচার করা হবে, কিন্তু এই ঘটনার মূল দোষীরা কি আদৌ শাস্তি পেল? সেই বিবরণ এখনও অধরাই।
ধর্ষকদের মোকাবিলায় ভারতের বিচার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
২০১২ সালের গণধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনার পর থেকে ভারতে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং যৌন হিংসার ইস্যু বেশি মনোযোগ পেতে শুরু করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেকেই এগিয়ে এসে নিজের বিরুদ্ধে ঘটা অত্যাচারের অভিযোগ দায়ের করেছেন পুলিশের কাছে। ২০১২ সালে এই সংখ্যাটা ২৫ হাজারের কিছু কম ছিল। ২০১৬ সালে ৩৮ হাজারের বেশি হয়ে যায় এই সংখ্যা। তবে ভারতের আদালত এবং বিচার ব্যবস্থা যে ধর্ষণকারীদের মোকাবিলায় খুব একটা কার্যকরী নয় তা নতুন করে বলার নয়। ২০১৭ সালের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রায় ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা সেই সময় পর্যন্ত ছিল বিচারাধীন। সে বছর কেবলমাত্র ১৮৩০০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল। অথচ ২০১২ সালে আদালত ২০,৬৬০টি মামলার নিষ্পত্তি করেছিল। সেই বছরের শেষ পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার মামলা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Two Finger Test: টু ফিঙ্গার টেস্টে কোনও মহিলার যোনিতে দু'টি আঙুল ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়, মহিলা ধর্ষিতা হয়েছেন কি না।
দোষী সাব্যস্ত করার হার কত?
২০০২ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে আদালতে ওঠা সমস্ত মামলার প্রায় ২৬ শতাংশ মামলায় অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সালের পরেই হঠাৎ করে এই গ্রাফ নিচের দিকে নামতে শুরু করে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই হার ২৫ শতাংশ হয়ে গিয়েছিল। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে আবার এই গ্রাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে প্রায় ৩২ শতাংশ মামলায় অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে থাকে আদালত।
তবে, কিছু জায়গায় আদালতের হাত বাঁধা। মামলাগুলি আদালতে পৌঁছতে যে পরিমাণ সময় লাগে এবং সম্ভাব্য সাক্ষী ও ভুক্তভোগী দুইয়ের উপর প্রায়শই যেরকম চাপ প্রয়োগ করা হয় সেই অবস্থায় অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়াও, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি যদি 'হাইপ্রোফাইল' বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কেউ হয়ে থাকেন তাহলে তাদের দোষ প্রমাণ করা আরও শক্ত হয়ে যায়। তার উপরে বর্তমান সময়ে জাতি ধর্মের বিষয়টি তো রয়েছেই।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়া আধ্যাত্মিক গুরু আশারাম বাপুর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণ মামলায় কমপক্ষে নয় জন সাক্ষীর উপরে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছিল। গত বছর ভারত সরকার জানিয়েছিল, ধর্ষণের মামলা তাড়াতাড়ি মোকাবিলা করার জন্য অতিরিক্ত এক হাজার ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট এবং ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সেসবও যে কতটা কার্যকরী সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে কেন তুলনা?
অন্যান্য উন্নয়শীল দেশের পরিসংখ্যান এবং প্রকাশিত রিপোর্টের সঙ্গে যদি ভারতের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুল্যমূল্য বিচার করা যায় তাহলে দেখা যায়, ভারতের ধর্ষণের মামলায় দণ্ডাদেশের হার অন্য কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কিছুটা হলেও বেশি। ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় করা একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, আদালতে মুখোমুখি হওয়া ধর্ষণকারীদের মাত্র ৮% দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যানও খুব একটা ভালো নয়। ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার সর্বসাকুল্যে মাত্র ১০%। সেখানেই ভারতে কিন্তু এই হার অনেকটাই বেশি।
তবে যেসব দেশে অপরাধের কারণে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার একটু বেশি, সেখানে একটি বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তা হলো হাতে গোনা কয়েকটি মামলা হয়তো আদালতে নিষ্পত্তি হয়। অর্থাৎ ধর্ষণের কারণে অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার অনেকটা কম। শুধু উন্নয়নশীল দেশে নয়, ব্রিটেনের একাংশেও পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া ধর্ষণের মামলার সংখ্যা এবং বিচারের ফলাফলের সংখ্যার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে।
২০২২ সালে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে দায়ের হওয়া ধর্ষণের ঘটনা আদালত পর্যন্ত যাওয়ার অনুপাত গত এক দশকের তুলনায় সর্বনিম্ন। দোষী সাব্যস্তের হার ৬০ শতাংশ হলেও অধিকাংশ মামলা আদালত পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই ধামাচাপা পড়ে যায়। সুইডেন এবং অন্যান্য দেশগুলি লিঙ্গসমতার জন্য বৈশ্বিক সমীক্ষায় অনেক ভালো স্কোর করলেও, ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার ওই দেশগুলোতে তুলনামূলক কম।
















