কোটি টাকার ভিখারি! হাত পেতে পেতেই শাহরুখ-সলমনকে টেক্কা মুম্বইয়ের ভারতের
World’s Richest Beggar, Bharat Jain: শূন্য থেকে শুরু করে শতকে পৌঁছেছেন ভারত। আজ তিনি বিপুল অর্থের মালিক। বিপুল মানে আক্ষরিক অর্থেই বিপুল।

রবীন্দ্রনাথের নোবেল, সচিনের দুর্ধর্ষ সেঞ্চুরি, কিশোরের দরদী গান কিংবা শাহরুখ খানের হৃদয় কাঁপানো রোম্যান্স। ভারতের কোর্টে এমন হাজার বল রয়েছে, যা পৃথিবীর সামনে দেশকে অনোন্য প্রমাণ করার পক্ষে যথেষ্ট। তবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে দেখুন, ভারতের ছবি হিসেবে গরিবির যে চেহারা আন্তর্জাতিক মহলের চোখে চশমার মতো এঁটে বসে আছে, তা মুছে ফেলা কার্যত অসম্ভব। কয়েক বছর আগেই অস্কারের মঞ্চে ঝড় তুলেছিল 'জয় হো' ছবিটি, কিংবা ধরুন ২০১৬ সালে মুক্তে পাওয়া 'লায়ন' ছবিটির কথাই, অস্কারের মঞ্চে পৌঁছেছিল সেই ছবিও। দু'টি সিনেমাতেই ভারতের গরিবি এবং ভিক্ষাবৃত্তির ছবি ধরা পড়েছিল স্পষ্টতই। বাহবাও কুড়িয়েছিল। কিংবা ভারতে তোলা জগৎবিখ্যাত ফটোগ্রাফগুলোর কথাই ভাবুন না। সেখানেও ভিখারি, অভাব কিংবা গরিবির ছবি না থাকলেই কিন্তু নয়। যত শিল্পবোধ, যত কৌলিন্য যেন ওই গরিবিতেই।
ভিক্ষুক প্রায় সব দেশেই থাকে। আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলিতেও খুঁজলেও ভবঘুরে বা ভিখারি কিছু কম মিলবে না। তার পরেও ফুটপাত জুড়ে ভিখারি এবং তৃতীয় বিশ্বের ভারতবর্ষের মধ্যে যে সুতোর সেতু রচনা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে, তা ভাঙা মুশকিল। ছোটবেলায় যে বৃদ্ধ ভিক্ষুক মানুষটি প্রভাতি গান গাইতে গাইতে মাধুকরী করতে বেরোতেন, তার সঙ্গে আজকের ভিক্ষার ধরন অনেকটাই বদলেছে। বদলেছে ভিক্ষা আদায়ের চেষ্টাও। এমনকী ভিক্ষা করেই যে হওয়া যায় কয়েক কোটি টাকার মালিক, তা-ও জানা গিয়েছে হালেই।
'জয় হো'-সহ বহু সিনেমার কল্যাণে এতদিনে আমরা জেনে গেছি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভিক্ষা আসলে এ দেশের বিশাল বড় ব্যবসা। যার পিছনে অনেকসময়ই থেকে যায় বড় কোনও বাহুবলী প্রতিভা। ভিক্ষাবৃত্তির কাঁধে ভর করেই চলে বিরাট লেনদেন, এমনকী নানা দুষ্কর্মও। কোথাও দুধের শিশুদের মাদক দিয়ে তাদের শিখণ্ডী করে চলে ভিক্ষার পেশা, কোথাও আবার জোর করে বানানো হয় প্রতিবন্ধী। যাতে মেলে সহানুভূতি এবং অবশ্যই ভিক্ষা। এই ভাবে নেপথ্যে কাজ করতে থাকে কুখ্যাত সব গ্যাং।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rich Beggars of India : সেই সম্পত্তি পাওয়া তো অনেকের কাছেই স্বপ্ন! সেখানে এই মানুষগুলি স্রেফ ভিখারি হয়েই কোটি কোটি টাকার মালিক!

তবে এ সব কিছুর পরেও এমন অনেক ভিক্ষুক রয়েছেন, যা পরিস্থিতির চাপে পড়ে ভিক্ষাবৃত্তির কাছে অবনত হন। তেমনভাবেই শুরুটা হয়েছিল মায়ানগরীর বাসিন্দা ভারত জৈনের। অভাবের তাড়নায় বেছে নিয়েছিলেন ভিক্ষাবৃত্তি। বাকি সমস্ত ভিক্ষুকদের দিনটা যেভাবে শুরু হত, ভারতের জীবনটা কোনও অর্থেই অন্যরকম ছিল না। সেই শূন্য থেকে শুরু করে শতকে পৌঁছেছেন ভারত। আজ তিনি বিপুল অর্থের মালিক। বিপুল মানে আক্ষরিক অর্থেই বিপুল।
ভারতের মোট অর্থের পরিমাণ সাড়ে সাত কোটির কাছাকাছি। মুম্বইয়ে নিজস্ব আবাসন ছাড়াও ঠাণেতে রয়েছে দুটি দোকান। প্রতিমাসে কম করে হলেও ৬০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ টাকা আয় করেন ভারত। কোনও শিক্ষিত চাকুরীজীবীর থেকে যা কোনও অংশে কম নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Vermicompost : কেঁচো থেকে সার তৈরি বিষয়টা একটি অদ্ভুত শুনতে লাগলেও, এটা সত্যিই। কলেজে পড়াকালীন এই বিষয়ে আগ্রহ অনুভব করেন উত্তরপ্রদেশের সানা খান
সকলে নয়, কেউ কেউ সঞ্চয়ী। কেউ দিনে দশ টাকা আয় করেও মাসের শেষে সেখান থেকে কিছু টাকা উদবৃত্ত রাখতে পারেন। আবার কেউ দিনে হাজার হাজার টাকা আয় করেও মাসের শেষে ঢু ঢু পকেট নিয়ে ঘুরে বেড়ান। বলাই বাহুল্য, ভারত প্রথম ক্যাটাগরিতেই পড়েন। দিনের পর দিন রোদ ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে মুম্বইয়ের সব জরুরি জায়গায় ভিক্ষা করেছেন ভারত। বিন্দু বিন্দু রোজগার একত্রিত করেছেন কষ্ট করে। তবে ভিক্ষার ব্যাপারে ভারতের মেধার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না কেউ। সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও দু-একশো টাকাও আয় করতে পারেন না বহু ভিখারি। ভারত সেখানে দিনের দশ-বারো ঘণ্টা ভিক্ষা করলেই আয় করে ফেলতেন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সেভাবেই টাকা জমিয়ে জমিয়ে মুম্বইয়ের মতো জায়গায় দুটি কামরার একটি ফ্ল্য়াট কিনেছেন তিনি। যার বর্তমান মূল্য ১.৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। ঠাণেতে রয়েছে তাঁর দু'টি দোকান, যেখান থেকে ভাড়া বাবদ মাসে ৩০ হাজার টাকা করে ঘরে তোলেন ভারত। স্ত্রী ও দুই পুত্র ছাড়াও পরিবারে রয়েছেন ভাই ও বৃদ্ধ বাবা। তাঁরা থাকেন মুম্বইয়ের প্যারেল এলাকার একটি এক কামরা ডুপ্লেক্সে। নিজের দুই সন্তানকেই কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা শেখাচ্ছেন ভারত।

ইতিমধ্যেই পরিবারের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ভারত। সেখান থেকে যা আয় হয়, তাতে সংসার ভালো মতেই চলে যায় তাঁর। আবার ভিক্ষার পথে যান ভারত, তেমনটা চান না পরিবারের লোকেরা। তবে পথ ছাড়তে নারাজ ভারত। তাই মাঝেমধ্যেই স্বল্প চেনা পাড়ায় বাটি হাতে দেখতে পাওয়া যায় ভারতকে।
অনেকেরই নিশ্চয়ই এতক্ষণে মনে হতে শুরু করেছে, কর্মঠ শরীর থাকতে কেন এমন ভিক্ষাবৃত্তির পথ। কিংবা প্রশ্ন উঠতেই পারে, স্বচ্ছলতা আসার পরেও কেন এমন ভিক্ষাবৃত্তি। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, উৎপল দত্তের সেই বিখ্যাত নাটক 'টিনের তলোয়ার'-এর একটি চরিত্রের কথা। ম্যানহোলের গর্ত থেকে মাথা বের করে মেথর বলেছিল, 'আমরা কলকাতার নিচে থাকি।' আর সেই মেথর শ্রেণিরই প্রতিনিধি যেন ভারত। একদিন অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি। মিশতে পারেননি সমাজের মূল স্রোতে। ছুঁতে পারেননি তথাকথিত 'এলিট'-দের বাউন্ডারি। বরং মান-সম্মানের মাথা খেয়ে তাঁদের সামনেই দাঁড়াতে হয়েছিল হাত পেতে। আর আজ তার জোরেই যখন বিপুল অর্থ, বিলাসবহুল বাড়ি, যথেষ্ট স্বচ্ছলতার অধিকার ছিনিয়ে এনেছেন ভারত, তখন সেই শিকড়কে ভুলতে নারাজ তিনি। আর সেটাই যেন সোশ্যাল এলিটিজমের মুখে সপাট এক থাপ্পড় তাঁর।
















