বৃষ্টিতে গোটা মরুভূমি হয়ে ওঠে আয়না, 'স্বর্গ' কোথায় জানেন?
Salar de Uyuni: বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে না পড়তেই রূপ খোলতাই হয় লবণাক্ত সমভূমির। আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে আসতে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আয়না। বাড়তে থাকে পর্যটকদের ভিড়।

পৃথিবী জুড়ে এমন অনেক কিছুই রয়েছে, যার ব্যখ্যা পাওয়া কঠিন। না, বন্ধু হোরাশিওকে খুব কিছু মিথ্যা বলেননি হ্যামলেট। আজও পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্য রয়েছে, যার উত্তর প্রকৃতির কাছেই রয়েছে কেবল। আর সেই কারণেই বোধহয় পৃথিবীতে প্রকৃতির উপর সর্বশক্তিমান আর কিছুই নেই। দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, শিল্প অনুকরণ। তবে প্রকৃতির সামনে বোধহয় মানুষের সমস্ত কিছু সৃষ্টি, সমস্ত আবিষ্কারই অনুকরণ, বানিয়ে তোলা।
সভ্যতার প্রয়োজনে, নিজেদের প্রয়োজনে মানুষ অনেক কিছুই গড়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির সাহায্যে বানিয়ে তুলেছে বিলাসবহুল নগরজীবন। শুধু বেঁচে থাকার প্রয়োজনটুকুই নয়, বিলাস-ব্যাসন সব কিছুর ব্যবস্থাই সে করেছে। এই ধরা যাক, প্রসাধনের প্রয়োজনে আয়নার ব্যবহার। সে তো বিজ্ঞানের দান ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু এ-ও এক অনুকরণ। দীঘির জলে মানুষের প্রতিবিম্ব, সেও তো এক ধরনের আয়নাই। তবে প্রকৃতির মাঝখানে রয়েছে এর চেয়েও বড় আয়না। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধুই প্রতিবিম্ব। একে অবিশ্বাস্য বললেও যেন কম বলা হয়।
তবে প্রকৃতি আপন মর্জির মালিক। ইচ্ছা হলে সে আপনার পায়ের সামনে ঝরিয়ে দেবে সমস্ত রূপ। ইচ্ছে না হলে হাজার প্রযুক্তি, হাজার বিজ্ঞানের সাহায্যেও তার মতি ফেরাতে পারবেন না আপনি। এমন অজস্র প্রাকৃতিক আশ্চর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পৃথিবীর আনাচ-কানাচে। তেমনই এই প্রাকৃতিক আয়না।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal panchayat polls 2023: সামগ্রিক ভাবে পঞ্চায়েত নির্বাচনে নামমাত্র আসনে জয় এলেও এবারে ভোট-শতাংশ বেড়েছে সিপিএমের।
বলিভিয়ার দক্ষিণে লবনাক্ত সমতলভূমি সালার দে ইউনি। খালি চোখে দেখতে মরুভূমিক মতোই। শুধু বালির বদলে রয়েছে সাদা লবণ। এই জায়গাটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ হাজার ফুট উঁচুতে। সেখানে রয়েছে আলতিপ্লানো নামে একটি মালভূমি। পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মালভূমি আলতিপ্লানো। তার উপরেই প্রায় ১০,৫৮২ বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে এই সালার দে ইউনি সমভূমি। ভূখণ্ডের হিসেবে আন্দিজ পর্বতমালার খুব কাছেই এর অবস্থান। যতদূর জানা যায়, এই সালার শব্দের অর্থ স্প্যানিশে লবণের সমতল। সেখান থেকেই এ হেন নামকরণ।
পৃথিবীতে হাতে গোনা এমন লবণাক্ত সমভূমি রয়েছে, তার মধ্যে আয়তনের নিরিখে সালার দে ইউনি বৃহত্তম। এমনি সাধারণ রোদ্দুরের দিনে নিজের সমস্ত রূপ সমস্ত ধর্ম কোথায় যেন লুকিয়ে রাখে সমভূমি। তখন খুঁজলেও মিলবে না আয়নার চিহ্নমাত্র। কিন্তু একটু বৃষ্টি হতে না হতেই সকলের সামনে প্রকট হয়ে ওঠে সেই আয়নাভূমি। তখন সেই গোটা অঞ্চলটিকে কাচের তৈরি বলেই ভ্রম হয়। এমনিতে রোদেলা দিনে ওই লবণাক্ত ভূমির উপরে এক ধরণের ষড়ভূজাকৃতির দাগ দেখা যায়। দেখে মনে হবে, কোনও জ্যামিতিক যেন যত্ন করে এঁকেছেন সেসব চিহ্ন। বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, এই এলাকায় জল বাষ্পীভূত হয়ে লবণ স্ফটিকে পরিণত হয়। আর সেই কারণেই সালার দে ইউনির সারা গায়ে অমন মৌমাছির চাকের মতো দাগ দেখতে পাওয়া যায়। পর্যটকদের কাছে সে-ও কিছু কম আকর্ষণ নয়।

বৃষ্টি হতে না হতেই সালার দে ইউনি নিজের আসল রূপে ধরা দেয়। মাটি ফুঁড়ে কোথা থেকে যেন সামনে চলে আসে বিশালাকার এক আয়না। তখন তাঁকে আয়তনে মাপা এক কঠোর কাজ যেন। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, বছর পর বছর ধরে নুন জমে জমেই তৈরি হয়েছে ওই বিশালাকার লবণাক্ত সমভূমির।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Smallest Country, Sealand: প্রিন্সিপ্যাল অব সিল্যান্ডে থাকেন মাত্র ২৭ জন নাগরিক। ইংল্যান্ড থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এই ছোট্ট দেশের রয়েছে নিজস্ব পতাকা, নিজস্ব সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে এমনকী নিজস্ব মুদ্রাও।
তবে চিরকালই যে এমনটাই ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে সমতল নয়, ওই এলাকায় ছিল মিনচিন নামে এক সুবিশাল হ্রদ। তবে মানুষ যত বেশি সভ্যতর হয়ে উঠতে লাগল, প্রকৃতির সমস্ত রূপ যেন বদলে যেতে লাগল। পরিবেশ পাল্টে গেল। পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল প্রাগৈতিকৃহাসিক ওই মিনচিন হ্রদও। ক্রমে শুকিয়ে গেল সমস্ত জল। কিন্তু প্রকৃতি শূন্য রইল না। হ্রদ মরে গেলে প্রকৃতির বুকে জেগে রইল এক সুবিশাল সমভূমি। যার নাম সালার দে ইউনি।

শুধু কি বিস্ময় আর ভৌগোলিক ইতিহাস। এই সমভূমি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বহু উপকথা ও স্থানীয় বিশ্বাস। যেমনটা সমস্ত প্রাচীন জায়গা জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। সালার দে ইউনির পাশেই রয়েছে তনুপা, কুসুকু এবং কুসিনা নামে তিনটি আগ্নেয়গিরি। স্থানীয় বিশ্বাস, এরা শুধুই আগ্নেয়গিরি নয়। অনেক অনেক কাল সেখানে বাস করতেন ওই তিন নামের তিন দৈত্যাকৃতির মানুষ। প্রণয়ের ফাঁদে পড়েন কুসুরু আর তনুপা। বিয়ে হয় তাঁদের। এইপর্যন্ত গল্পে সবই সুখের। সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন গল্পে ঢুকে পড়ে তৃতীয় ব্যক্তি। হঠাৎ একদিন কুসুকু পালিয়ে যান কুসিনাকে নিয়ে। তনুপার কানে যখন এ খবর গেন, তখন তিনি সন্তানকে স্তন্যপান করাতে ব্যস্ত। স্বামীর কুকীর্তির কথা শুনে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তনুপা। দুধের সঙ্গে গিয়ে মিশল তার চোখের জল। সেখান থেকেই তৈরি হল এই সালার তথা লবণের সমতল। স্থানীয় আয়মারা সম্প্রদায়ের কাছে এই তনুপা তাঁদের দেবী। স্থানীয়দের কাছে এই লবণভূমি সালার দি তনুপা বলেও তাই বেশ পরিচিত। খনিজের দিক থেকেও বেশ সমৃদ্ধ এই এলাকা। নুন তো মেলেই, তার পাশাপাশি লিথিয়াম-সহ বহু খনিজ পদার্থের খনি ওই এলাকা। বিশ্বের পঞ্চাশ থেকে সত্তর শতাংশ লিথিয়ামের উৎসই নাকি ওই সালার দে ইউনি। আর এই অফুরন্ত খনিজ সম্পদের নেপথ্যে তাঁদের দেবী তনুপার আশীর্বাদ রয়েছে বলেই মনে করেন আয়মারারা।

সারা বছরটা মোটামুটি শুষ্কই থাকে সালার দে ইউনি। সে সময় তা যে কোনও মরুভূমির মতোই শুষ্ক। ডিসেম্বর থেকে মার্চ, এই সময়টাই মূলত বৃষ্টির। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে না পড়তেই রূপ খোলতাই হয় লবণাক্ত সমভূমির। আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে আসতে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আয়না। বাড়তে থাকে পর্যটকদের ভিড়। ওই সময়টায় সালার দে ইউনির সূর্যদয়-সূর্যাস্তের অভিজ্ঞতা বলে বোঝানোর নয়। একই পৃথিবীতে একই সঙ্গে দু-দু'টো সূর্য ডুবে গেল, মিশে গেল একে অপরের সঙ্গে। তেমনই তারায় ভরা রাত। গোটা গ্যালাক্সিটাই এক লহমায় নেমে আসে যেন মাটির কাছে।
যারা পুণ্য-পাপে বিশ্বাসী, তারা পরলোকের জন্য পয়েন্ট জমাতে থাকেন গোটা জীবন। তাতে ইহকাল কতসময় ঝরঝরে হয়ে যায়। এ জীবনের পরে কোথাও না কোথাও স্বর্গ রয়েছে, পুণ্যের নিক্তি মেপে তবেই মেলে সেই স্বর্গের টিকিট। আর সেই পরকালের লোভে মানুষ সারাজীবন কতকিছু জমায়। অথচ চোখ খুলে দেখা হয় না ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু। পণ্ডিতেরা ঠিকই বলেন, স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে, তা এখানেই, এই মায়াবি পৃথিবীতেই। বাকি সবটাই যে মায়া...
















