মোদি সরকারের নোটবন্দি কি আদৌ বৈধ? সুপ্রিম কোর্টের যে রায়ে ফের মাথাচাড়া দিল পুরনো বিতর্ক

Supreme Court on Demonetisation India : কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মোট ৫৮টি মামলা দায়ের করা হয়।

Aritra Som
৩ মিনিট
মোদি সরকারের নোটবন্দি কি আদৌ বৈধ? সুপ্রিম কোর্টের যে রায়ে ফের মাথাচাড়া দিল পুরনো বিতর্ক

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর। রাত বিরেতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভারতের জনগণ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তাঁদের পকেটে এটিএম থেকে সদ্য তোলা যে ৫০০, ১০০০ টাকার নোট আছে, সেটি আর বাজারে চলবে না! তড়িঘড়ি খবরের চ্যানেলে, ডিজিটাল পোর্টালগুলোয় চোখ চলে গিয়েছিল সবার। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদির সরকার রাতারাতি নোটবন্দি বা নোট বাতিলের কথা ঘোষণা করে। পুরনো ৫০০ টাকা বাতিল, ১০০০ টাকার নোট আর থাকবে না বাজারে। বদলে নতুন ৫০০ এবং ২০০০ টাকার নোট চলে আসবে বাজারে।

২০১৬ সালের সেই দিনটির পর পেরিয়ে গিয়েছে ছয় বছর। নতুন একটি বছর ২০২৩-এ দাঁড়িয়ে রয়েছে গোটা পৃথিবী। তবুও ছ’বছর আগের সেই দিনটির কথা অনেকেই ভুলতে পারেননি। এটিএম দোকানের বাইরে বিশাল লম্বা লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, ব্যাঙ্কে বারবার ঢুঁ মারা – ওই সময় গোটা ভারতের দিনযাপনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল এসব। চরম ভোগান্তির মুখে পড়েন অনেকে। ৫০০, ২০০০-এর পর অন্যান্য নোটগুলির রঙেও পরিবর্তন এসেছে। নোটবন্দি নিয়ে বাজারে শুরু হয় নানা রকম তত্ত্ব, তথ্যের খেলা।

২০২৩ সাল সবে পা ফেলেছে। তার মধ্যে ফের বাজার সরগরম সেই নোটবন্দি নিয়ে। কারণ? কেন্দ্রীয় সরকারের নোটবন্দির সিদ্ধান্ত ঘিরে বিস্তর জলঘোলা তৈরি হয়। কালো টাকা উদ্ধারের জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, আদৌ কতটা উদ্ধার হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মোট ৫৮টি মামলা দায়ের করা হয়। সেই সমস্ত মামলাগুলিকে একসঙ্গে করে ২ জানুয়ারি নিজেদের মতামত দেয় দেশের শীর্ষ আদালতের পাঁচজন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দ্বিতীয় দফার নোটবন্দি হয়ে গেছে চুপিসারেই! বিভীষিকার দিন ফিরবে আবারও?

Demonetisation: সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যখন শলা-পরামর্শ নেওয়া হয়নি কারও, ছ’বছর পর তার ব্যর্থতা স্বীকারের দায়বদ্ধতাই বা থাকবে কেন!

কী রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট?

এই প্রশ্নে বছরের শুরুতে স্বস্তির মুখে কেন্দ্রীয় সরকার। বিচারপতিদের বিশেষ বেঞ্চ বিজেপি সরকারের নোটবন্দির সিদ্ধান্তকে ‘সঠিক’ বলেই ঘোষণা করল। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার আলোচনা হয়েছিল। দীর্ঘ ছ’মাস ধরে দুই পক্ষই নোটবন্দি নিয়ে আলোচনা করে। উল্লেখ্য, সেই আলোচনার সমস্ত সূত্র, কাগজপত্র পেশ করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেসব পর্যবেক্ষণের পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো ব্যাপারটাই অত্যন্ত ভেবেচিন্তে করা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
লক্ষ কোটি টাকা ফিরল না আজও! নোটবন্দির ছ'বছর পর কী অবস্থা ঋণখেলাপিদের

Demonetisation: বর্তমানে ঋণখেলাপিদের অবস্থা কীরকম? কেউ কি আদৌ কিছু ফেরত দিয়েছেন না কি এখনও অধরাই রয়েছেন?

তবে এই রায়দানে বাধা কি একেবারেই আসেনি? না, এসেছে। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বারবার আদালতের হস্তক্ষেপের দাবি তুলেছিলেন। তাঁর মতে, নোটবন্দির সিদ্ধান্ত আর বাতিল বা অবৈধ বলে ঘোষণা করা যাবে না। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে জন সাধারণের অত্যন্ত সমস্যা হয়েছিল। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিস্তর হয়রানির শিকার হতে হয়। তাই দেশের শীর্ষ আদালতকে এখানে হস্তক্ষেপ করতে হবে। অন্তত ঠিক না ভুল, সেই সিদ্ধান্ত জানানো উচিত।

পাশাপাশি বিচারপতিদের বেঞ্চেও মতানৈক্য হয়। শীর্ষ আদালতের এই বিশেষ বেঞ্চের ৪-১ রায়ে নোটবন্দিকে ‘সঠিক’ বলে ঘোষণা করা হয়। বিচারপতি বিভি নাগারত্ন নোটবন্দির বিরোধিতা করেন। তিনি বেশকিছু বিষয় সবার সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার কখনও একার সিদ্ধান্তে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনতে পারে না। হয় আলাপ আলোচনার পর রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা করা হবে, নয়তো সংসদের মধ্যে ভোটাভুটি করে সিদ্ধান্ত জানানো উচিত ছিল। তার জায়গায় আচমকা প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে ঘোষণা করলেন। এই ব্যাপারটি নিয়ে বিরোধিতা করেন জাস্টিস নাগারত্ন।

বিচারপতি নাগারত্ন আরও বলেন যে, ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর রাতারাতি ৫০০, ১০০০ নোট বাতিলের ঘোষণা করা হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাবতীয় সিদ্ধান্ত দ্রুতগতিতে নেওয়া হয়। কিন্তু এই নোটবন্দির পর মানুষ যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হবে, সেগুলো কি একবারও খেয়াল করেছে কেন্দ্র? আরবিআই বা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলিও কি সেসব ভেবে রেখেছিল? জাস্টিস নাগারত্নের কথায়, এই প্রশ্নের উত্তর নেই। তাছাড়া কেন্দ্র ও আরবিআইয়ের মধ্যে যে ফাইলগুলি চালাচালি হয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে ‘as desired by the Central Government’, অর্থাৎ ‘কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছানুসারে’। সেখানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কোনও ভূমিকা কি আদৌ আছে? বিচারপতি নাগারত্ন বলেছেন, ওই সময় আইনের নিয়মের ওপরে চেপে বসেছিল ক্ষমতা ও তার দম্ভ।

বিতর্ক, পাল্টা তর্কের মধ্যেও রায় বিজেপি সরকারের পক্ষেই গিয়েছে। এখন ফের দেশের রাজনীতির ময়দানের বিষয় হবে নোটবন্দি ও সুপ্রিম কোর্টের রায়? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সেদিকেই তাকিয়ে।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।