মহাভারতের শমীবৃক্ষ এখনও পূজিত হয় এই রাজ্যেই!
The Shami Brikhsha : মহাভারতের বিরাটপর্বে পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে নিজেদের অস্ত্রগুলি যে শমীবৃক্ষের কোটরে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই বৃক্ষটিই অবস্থিত এ-রাজ্যে। বরেন্দ্রভূমিতে।

যদি পৌঁছে যাওয়া যায় মহাভারতের দেশে,কেমন লাগবে? খুব বেশি দূরে যেতে হবে না, কিংবা সময় ভ্রমণ করে অতীতেও ফিরতে হবে না। এই রাজ্যেই লুকিয়ে আছে এমন একটি জায়গা, যেখানে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক টুকরো মহাভারত। আসলে, মহাভারতের বিরাটপর্বে পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে নিজেদের অস্ত্রগুলি যে শমীবৃক্ষের কোটরে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই বৃক্ষটিই অবস্থিত এ-রাজ্যে। বরেন্দ্রভূমিতে। দক্ষিণ দিনাজপুরে।
শমীবৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম Prosopis cineraria। Fabacea পরিবারের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ। মূলত 'খেজরি' নামেই পরিচিত। মরু অঞ্চলের উদ্ভিদ হওয়া সত্ত্বেও বরেন্দ্রভূমিতে কীভাবে এলোতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সবথেকে উল্লেখযোগ্যের বিষয় হলো এই অঞ্চলে কেবল এই একটি মাত্রই শমীবৃক্ষের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থেকে জানতে পারা যায়,
শমী তিক্ত কটু শীতা কাশায়া রেচ লঘু
কফকাশাভ্রমস্বসাকুষ্ঠরসা কৃমিজিত স্মৃতা
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Temple of Rakshas in India: এ-দেশের পাঁচটি মন্দিরের কথা এক্ষুনি বলা যায়, যেখানে দেবতার বদলে পূজিত হন রাক্ষস-রাক্ষসী কিংবা পুরাণগল্পের কোনো অনিষ্টকারী চরিত্র। সেসব মন্দিরেও সাধারণ মানুষ আসেন। নিত্য, পূজা-অর্চনা হয়।
অর্থাৎ শমীবৃক্ষ তিক্ত, কটু স্বাদের যা কাশি, কফ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথা ঘোরানো, কৃমি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি রোগের ঔষধ। অর্থাৎ এই গাছের মহৌষধী গুণ প্রচুর। আবার এই গাছের আরেক পৌরাণিক কাহিনিও রয়েছে। ছোটবেলা থেকে রাজশেখর বসুর মহাভারত আমরা সকলেই পড়েছি। পাশা খেলায় হেরে গিয়ে পঞ্চপাণ্ডব বারো বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সেই এক বছরের অজ্ঞাতবাস পর্বে পঞ্চপান্ডব বিরাটনগরে প্রবেশের পূর্বে শমীবৃক্ষে তাদের রাজবস্ত্র ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখে। এ-গল্প আমাদের সবার জানা। রাজশেখর বসু লিখেছেন,
রাজধানীতে উপস্থিত হয়ে যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা যদি সশস্ত্র হয়ে নগরে প্রবেশ করি তবে লোকে উদ্বিগ্ন হবে; অর্জুনের গাণ্ডীব, ধনু অনেকেই জানে, তা দেখে আমাদের চিনে ফেলবে। অর্জুন বললেন, শ্মশানের কাছে পর্বতশৃঙ্গে ওই যে বৃহৎ শমীবৃক্ষ রয়েছে তাতে আমাদের অস্ত্র রাখলে কেউ নিতে সাহস করবে না। তখন পাণ্ডবগণ তাঁদের ধনু থেকে জ্যা বিযুক্ত করলেন এবং দীর্ঘ উজ্জ্বল খড়্গ, তূণীর ও ক্ষুরধার বৃহৎ বাণ সকল ধনুর সঙ্গে বাঁধলেন। নকুল শমীবৃক্ষে উঠে একটি দৃঢ় শাখায় অস্ত্রগুলি এমনভাবে রজ্জুবদ্ধ করলেন যাতে বৃষ্টি না লাগে। তার পর তিনি একটি মৃতদেহ সেই বৃক্ষে বেঁধে দিলেন, যাতে পূতিগন্ধ পেয়ে লোকে কাছে না আসে। গোপাল মেষপাল প্রভৃতির প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, ইনি আমাদের মাতা, বয়স আশি বা একশো, মৃতদেহ গাছে বেঁধে রাখাই আমাদের কুলধর্ম।
এই শমীবৃক্ষই রয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুর থানার বৈরহাট্টা গ্রামের পাশ্ববর্তী হাতিডুবা গ্রামে। কথিত রয়েছে, মহাভারতে বর্ণিত বিরাটনগর ছিল এখানেই। বিরাটনগর থেকেই এসেছে বৈরহাট্টা নাম। আজও বৈরহাট্টা গ্রামে খননকার্য চালালে পাওয়া যায় পুরনো স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয়দের মতে, এই বৃক্ষ কয়েক হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাসের পাতায় কয়েক হাজার বছরের জীবন্ত দলিল হয়ে এখনও বেঁচে আছে। তার 'বৃদ্ধ' তকমা পেতে হয়তো আরো কয়েকশো বছরের অপেক্ষা!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kaliprasanna Singha : আজ থেকে দেড়শো বছর আগের বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন কালীপ্রসন্ন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’।

শমী বৃক্ষ
সেই শতাব্দী প্রাচীন মহীরুহ আজও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তিকে। ইটের উঁচু গোলাকার বেদিতে ঘেরা রয়েছে এই বৃক্ষ। স্থানীয় মানুষ রোজ সকাল, সন্ধ্যায় এসে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয় এই গাছের নীচে। প্রতি বছর ১লা বৈশাখ এখানে বিশেষ পূজা হয় ও সেই উপলক্ষ্যে মেলা বসে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসে।এই বৃক্ষস্থল বর্তমানে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। শমীবৃক্ষের পাশে থাকা দিঘির চারপাশে তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য কটেজ। জেলার সদর শহর বালুরঘাট থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে করে প্রথমে হরিরামপুর, তারপর সেখান থেকে ছোটো যে কোনো গাড়িতে করে হাতিডুবা গ্রাম। সেখানেই রয়েছে এই শমীবৃক্ষ।

বৃক্ষপূজা
কথায় বলে, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। এই বৃক্ষই সেই শমীবৃক্ষ কি না, পঞ্চপান্ডব এখানে এসেছিল কি না, সেই তর্কে না গিয়ে স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাসের ওপর ভর করে চলে যাওয়া যায় এই জায়গায়। পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের একটি প্রস্তরফলকও চোখে পড়ে, তাতেও জায়গা করে নিয়েছে এই স্থানীয় ‘বিশ্বাস’। অবশ্য এই বিশ্বাস আর স্থানীয় নয়। ১৯৮৮ সালে ভারতের ডাকবিভাগ থেকে এই শমীবৃক্ষের ছবি সম্বলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ওই যে বলে না, যা আছে মহাভারতে, তাই আছে এই ভারতে।















