মহাভারতের শমীবৃক্ষ এখনও পূজিত হয় এই রাজ্যেই!

The Shami Brikhsha : মহাভারতের বিরাটপর্বে পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে নিজেদের অস্ত্রগুলি যে শমীবৃক্ষের কোটরে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই বৃক্ষটিই অবস্থিত এ-রাজ্যে। বরেন্দ্রভূমিতে।

Anindya Sarkar
৩ মিনিট
মহাভারতের শমীবৃক্ষ এখনও পূজিত হয় এই রাজ্যেই!

যদি পৌঁছে যাওয়া যায় মহাভারতের দেশে,কেমন লাগবে? খুব বেশি দূরে যেতে হবে না, কিংবা সময় ভ্রমণ করে অতীতেও ফিরতে হবে না। এই রাজ্যেই লুকিয়ে আছে এমন একটি জায়গা, যেখানে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক টুকরো মহাভারত। আসলে, মহাভারতের বিরাটপর্বে পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে নিজেদের অস্ত্রগুলি যে শমীবৃক্ষের কোটরে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই বৃক্ষটিই অবস্থিত এ-রাজ্যে। বরেন্দ্রভূমিতে। দক্ষিণ দিনাজপুরে।

শমীবৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম Prosopis cineraria। Fabacea পরিবারের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ। মূলত 'খেজরি' নামেই পরিচিত। মরু অঞ্চলের উদ্ভিদ হওয়া সত্ত্বেও বরেন্দ্রভূমিতে কীভাবে এলোতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সবথেকে উল্লেখযোগ্যের বিষয় হলো এই অঞ্চলে কেবল এই একটি মাত্রই শমীবৃক্ষের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থেকে জানতে পারা যায়,

শমী তিক্ত কটু শীতা কাশায়া রেচ লঘু

কফকাশাভ্রমস্বসাকুষ্ঠরসা কৃমিজিত স্মৃতা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতের যেসব মন্দিরে দেবতার বদলে পূজিত হন রাক্ষস!

Temple of Rakshas in India: এ-দেশের পাঁচটি মন্দিরের কথা এক্ষুনি বলা যায়, যেখানে দেবতার বদলে পূজিত হন রাক্ষস-রাক্ষসী কিংবা পুরাণগল্পের কোনো অনিষ্টকারী চরিত্র। সেসব মন্দিরেও সাধারণ মানুষ আসেন। নিত্য, পূজা-অর্চনা হয়।

অর্থাৎ শমীবৃক্ষ তিক্ত, কটু স্বাদের যা কাশি, কফ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথা ঘোরানো, কৃমি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি রোগের ঔষধ। অর্থাৎ এই গাছের মহৌষধী গুণ প্রচুর। আবার এই গাছের আরেক পৌরাণিক কাহিনিও রয়েছে। ছোটবেলা থেকে রাজশেখর বসুর মহাভারত আমরা সকলেই পড়েছি। পাশা খেলায় হেরে গিয়ে পঞ্চপাণ্ডব বারো বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সেই এক বছরের অজ্ঞাতবাস পর্বে পঞ্চপান্ডব বিরাটনগরে প্রবেশের পূর্বে শমীবৃক্ষে তাদের রাজবস্ত্র ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখে। এ-গল্প আমাদের সবার জানা। রাজশেখর বসু লিখেছেন,

রাজধানীতে উপস্থিত হয়ে যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা যদি সশস্ত্র হয়ে নগরে প্রবেশ করি তবে লোকে উদ্‌বিগ্ন হবে; অর্জুনের গাণ্ডীব, ধনু অনেকেই জানে, তা দেখে আমাদের চিনে ফেলবে। অর্জুন বললেন, শ্মশানের কাছে পর্বতশৃঙ্গে ওই যে বৃহৎ শমীবৃক্ষ রয়েছে তাতে আমাদের অস্ত্র রাখলে কেউ নিতে সাহস করবে না। তখন পাণ্ডবগণ তাঁদের ধনু থেকে জ্যা বিযুক্ত করলেন এবং দীর্ঘ উজ্জ্বল খড়্‌গ, তূণীর ও ক্ষুরধার বৃহৎ বাণ সকল ধনুর সঙ্গে বাঁধলেন। নকুল শমীবৃক্ষে উঠে একটি দৃঢ় শাখায় অস্ত্রগুলি এমনভাবে রজ্জুবদ্ধ করলেন যাতে বৃষ্টি না লাগে। তার পর তিনি একটি মৃতদেহ সেই বৃক্ষে বেঁধে দিলেন, যাতে পূতিগন্ধ পেয়ে লোকে কাছে না আসে। গোপাল মেষপাল প্রভৃতির প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, ইনি আমাদের মাতা, বয়স আশি বা একশো, মৃতদেহ গাছে বেঁধে রাখাই আমাদের কুলধর্ম।

এই শমীবৃক্ষই রয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুর থানার বৈরহাট্টা গ্রামের পাশ্ববর্তী হাতিডুবা গ্রামে। কথিত রয়েছে, মহাভারতে বর্ণিত বিরাটনগর ছিল এখানেই। বিরাটনগর থেকেই এসেছে বৈরহাট্টা নাম। আজও বৈরহাট্টা গ্রামে খননকার্য চালালে পাওয়া যায় পুরনো স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয়দের মতে, এই বৃক্ষ কয়েক হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাসের পাতায় কয়েক হাজার বছরের জীবন্ত দলিল হয়ে এখনও বেঁচে আছে। তার 'বৃদ্ধ' তকমা পেতে হয়তো আরো কয়েকশো বছরের অপেক্ষা!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'নারী' চরিত্রে অভিনয় থেকে 'মহাভারত'-এর তর্জমা, বাঙালির হুতোম প্যাঁচা কালীপ্রসন্ন সিংহের অচেনা জীবন

Kaliprasanna Singha : আজ থেকে দেড়শো বছর আগের বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন কালীপ্রসন্ন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’।

শমী বৃক্ষ

সেই শতাব্দী প্রাচীন মহীরুহ আজও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তিকে। ইটের উঁচু গোলাকার বেদিতে ঘেরা রয়েছে এই বৃক্ষ। স্থানীয় মানুষ রোজ সকাল, সন্ধ্যায় এসে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয় এই গাছের নীচে। প্রতি বছর ১লা বৈশাখ এখানে বিশেষ পূজা হয় ও সেই উপলক্ষ্যে মেলা বসে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসে।এই বৃক্ষস্থল বর্তমানে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। শমীবৃক্ষের পাশে থাকা দিঘির চারপাশে তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য কটেজ। জেলার সদর শহর বালুরঘাট থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে করে প্রথমে হরিরামপুর, তারপর সেখান থেকে ছোটো যে কোনো গাড়িতে করে হাতিডুবা গ্রাম। সেখানেই রয়েছে এই শমীবৃক্ষ।

বৃক্ষপূজা

কথায় বলে, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। এই বৃক্ষই সেই শমীবৃক্ষ কি না, পঞ্চপান্ডব এখানে এসেছিল কি না, সেই তর্কে না গিয়ে স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাসের ওপর ভর করে চলে যাওয়া যায় এই জায়গায়। পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের একটি প্রস্তরফলকও চোখে পড়ে, তাতেও জায়গা করে নিয়েছে এই স্থানীয় ‘বিশ্বাস’। অবশ্য এই বিশ্বাস আর স্থানীয় নয়। ১৯৮৮ সালে ভারতের ডাকবিভাগ থেকে এই শমীবৃক্ষের ছবি সম্বলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ওই যে বলে না, যা আছে মহাভারতে, তাই আছে এই ভারতে।

লিখেছেন
Anindya Sarkar
Anindya Sarkar
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।