যার ভরসায় খালি হাতে যুদ্ধ লড়েছে সাধারণ মানুষ, বর্ষসেরা মানুষের খেতাব পেলেন জেলেনস্কি
Time person of year 2022 Volodymyr Zelenskyy: টাইম ম্যাগাজিন জানাচ্ছে, যেভাবে জিও-পলিটিক্সকে প্রভাবিত করেছেন জেলেনস্কি, তা গত কয়েক দশকে কেউ করতে পারেনি।

যদি আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে আমায় জিজ্ঞেস করা হতো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট কে, তাহলে নিঃসন্দেহে গুগলের শরণাপন্ন হতে হত। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষকেই তা করতে হত। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, কঠিন সময় কঠিন মানুষের জন্ম দেয়। ভ্লাদিমির জেলেনস্কির ক্ষেত্রেও কথাটি ১০০ শতাংশ প্রযোজ্য। বছরের গোড়ায় রুশ আগ্রাসনের শিকার ইউক্রেন। তারপর থেকে অনবরত গোলা বর্ষণ আর রক্তপাত। রুশ হামলায় যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউক্রেন জুড়ে এখন লাশের স্তূপ, খুন, বারুদের গন্ধ, রক্তধারার স্রোত। তার মাঝেও দেশকে দাপটের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি। ডেভিড ও গোলিয়াথের এই অসম যুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালাচ্ছে ইউক্রেন। চাইলে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি পালাতেই পারতেন, কিন্তু তিনি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁকে দেখে লড়াই করার উদ্যম পাচ্ছে আপামর ইউক্রেন। তাঁর অদম্য সাহসকে কুর্নিশ জানাচ্ছে আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি-সহ বিভিন্ন দেশ।
২০১৮-১৯ সালে তৎকালীন ইউক্রেন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন জেলেনস্কি। পেয়েছিলেন বিপুল জনসমর্থন। ফলত ২০১৯ সালে কিয়েভে শুরু হয় জেলেনস্কির যুগ। এর আগে একজন কমেডিয়ান ছিলেন জেলেনস্কি। মনে করা হয়েছিল, রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইটা একতরফা হবে, তবে তা হয়নি। পাল্টা প্রত্যাঘাত করেছে ইউক্রেন এবং কিছুটা সাফল্যও পেয়েছে। কূটনৈতিক আঙিনায় লড়ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কিও। ফলত, তিনিই টাইম ম্যাগাজিনের তরফে ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষিত হয়েছেন।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সরগরম পরিস্থিতির মধ্যেই নিজের দেশের দুই উচ্চপদস্থ আধিকারিককে অপসারণ করলেন ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি।
এবছর ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণ করে দেয় রাশিয়া। এরপর থেকেই ভয়ংকর, নারকীয় এক যুদ্ধের সাক্ষী পৃথিবী। গোটা ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে পুতিনের সেনা। এমনকী অভিযোগ, সাধারণ বসতি এলাকা, হাসপাতাল, স্কুলেও রুশ গোলাবর্ষণ চলেছে। নির্বিচারে খুন করা হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে, ধর্ষিতা হচ্ছেন অসংখ্য। যুদ্ধ মানেই প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি। দু'পক্ষেই ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা নেহাত কম নয়। ঘরছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ইউক্রেনের উদবাস্তুদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রসংঘ। রাশিয়ার ভেতরেও পুতিনের এই আগ্রাসী মনোভাবের তীব্র নিন্দা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বে বন্দিত হচ্ছেন ভ্লাদিমির জেলেনস্কি। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই প্রথমে ব্যাকফুটে থেকেও পরে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে যুদ্ধ জয়ের পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে ইউক্রেন। রুশ সেনার উপর অপ্রত্যাশিতভাবে প্রত্যাঘাত করেছে ইউক্রেন। ইতিমধ্যেই রুশ অধিকৃত বিভিন্ন এলাকা থেকে রুশ সেনাবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে ইউক্রেনের সৈন্যরা। তবে পুতিনের রাশিয়া দাবি করেছে কোনওমতেই তারা সেনা সরাবে না। তাদের আরও দাবি, ইউক্রেনের যে অংশে রাশিয়া দখল করেছে, তা রাশিয়ার বলেই মেনে নিতে হবে পশ্চিমি বিশ্বকে। স্বভাবতই রাশিয়ার এই দাবিকে সমর্থন জানাচ্ছে না ইউএনও বা ন্যাটো। তবে জেলেনস্কি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।

সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে সামরিক ও কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ৪৪ বছরের জেলেনস্কি। দেশের ভয়শূন্য চিত্তের প্রেসিডেন্টের সাহসে ভর করে বহু সাধারণ ইউক্রেনবাসীকে খালি হাতে রুশ সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে দেখা গিয়েছে। নিজেদের বাড়ির বিভিন্ন দৈনন্দিন জীবনের জিনিস দিয়েই তারা ছন্নছাড়া করে দিচ্ছেন রুশ সেনাকে। কখনও রাতের অন্ধকারে আক্রমণ হচ্ছে, তো কখনও আবার গেরিলা পদ্ধতিতে। অত্যাধুনিক ট্যাঙ্কের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। কয়েকদিন আগে ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, একদল ইউক্রেনীয় যুবক জিপ নিয়ে গিয়ে রুশসেনার ট্যাঙ্ক দখল করে নিয়ে চলে আসছেন। এতদিন পর্যন্ত এই সব দৃশ্য সিনেমাতেই দেখা গিয়েছে। কিন্তু ওই যে, ‘Tough time brings out tough people’। এই প্রত্যাঘাত একমাত্র সম্ভব হয়েছে ভ্লাদিমির জেলেনস্কির জন্যই। যে কারণে যথার্থভাবেই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের এই তরুণ প্রেসিডেন্টকে ‘টাইম পার্সন অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে বেছে নিল টাইম ম্যাগাজিন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা

টাইম ম্যাগাজিন জানাচ্ছে, যেভাবে জিও-পলিটিক্সকে প্রভাবিত করেছেন জেলেনস্কি, তা গত কয়েক দশকে কেউ করতে পারেনি। এছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছেড়ে না পালিয়ে কিয়েভে থেকে তিনি যেভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাও প্রশংসা কুড়িয়ে নিয়েছে টাইম ম্যাগাজিনের। রুশ আগ্রাসনের সামনে মাথা নত না করে, পুতিনের চোখে চোখ রেখে জেলেনস্কির এই লড়াই তাঁকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছে বিশ্ববাসীর মনে। যুদ্ধের করুণ পরিস্থিতির মাঝেও বিশ্বকে ও নিজের দেশকে যেভাবে গোপন এলাকা থেকে রোজ বার্তা দিয়ে মনোবল তিনি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তাও নজর কেড়েছে ম্যাগাজিনের। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে টাইমস ম্যাগাজিনের এডিটর জানিয়েছেন,
“আমরা শুধুমাত্র প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে সম্মান জানাচ্ছি না, আমরা সম্মান জানাচ্ছি আপামর ইউক্রেনবাসীকে। আমাদের এই সম্মান সমগ্র ইউক্রেনবাসীর লড়াইয়ের স্পিরিটের জন্যে। আমরা সম্মান জানাই বিশ্বের সেই সকল মানুষকে যারা পর্দার পিছনে থেকেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে ক্রমাগত সাহায্য করে চলেছেন।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জেলেনস্কির পাশাপাশি চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কও ছিলেন এই খেতাবের অন্যতম দাবিদার। তবে শেষমেষ, যথার্থ ব্যক্তিকেই এই বছরের সেরা মানুষের সম্মান দিচ্ছে টাইমস ম্যাগাজিন।
















