বরফ চাপা পড়ে মৃত ৫০! শতাব্দীর বীভৎসতম তুষারঝড়ের যে তাণ্ডব দেখল মার্কিন মুলুক
US Blizzard: কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা তুষারঝড়ে বরফ চাপা পড়েছেন মানুষ। যানবাহনের মধ্যে এবং বরফের তলা থেকে শুধুই উঠে আসছে মৃতদেহ।

গাড়িতে গাড়িতে জানলায় টোকা দিচ্ছেন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীরা। কেউ কি আছে? কেউ কি বেঁচে আছে? গাড়ির মধ্যে বসে বসেই তুষারসমাধিতে চলে গেছেন মানুষ। শতাব্দীর বীভৎসতম তুষারঝড়ে নিমেষে প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ জন মানুষ, সংখ্যা বাড়তে পারে আরও! নিউইয়র্কের জরুরি কর্মীরা সোমবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মানুষদের উদ্ধার করতে, যদিও উদ্ধার হচ্ছে জমে যাওয়া দেহই শুধু। অবিরাম চলা তুষারঝড়ে সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে প্রায় ৫০ জনের দেহ মিলেছে, ক্রিসমাসের উদযাপনে মিশেছে স্বজন হারানোর আর্তনাদ, মিশেছে ভয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বের কিছু অংশে তুষারঝড় এখনও অব্যাহত। বেশ কয়েকদিন ধরেই মার্কিন মুলুক গ্রাস করেছে ব্লিজার্ড নামের এই তুষারঝড়, যার ফলে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট তো ঘটেইছে, স্তব্ধ হয়েছে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাও। নয়টি রাজ্য জুড়ে কমপক্ষে ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী।
বিগত বহু বছরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ তুষারঝড়ের ঘটনা ঘটেছে। উত্তর থেকে ঠান্ডা, শুষ্ক মেরু বায়ু দক্ষিণ থেকে উষ্ণ, আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে ধাক্কা খেলে সংঘর্ষ হতে বাধ্য, আর এই সংঘর্ষের কারণেই তুষারঝড় দেখা দেয়। যখন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ঠান্ডা, আর্দ্র হাওয়া পূর্ব দিকে রকি পর্বতমালা এবং বিশাল সমভূমিতে চলে যায় এবং উষ্ণ, আর্দ্র বাতাস মেক্সিকো উপসাগর থেকে উত্তর দিকে উঠে আসে তখন তুষারঝড়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়। টেক্সাস প্যানহ্যান্ডেল থেকে গ্রেট লেক এবং মিডওয়েস্ট পর্যন্ত এই তাণ্ডব চলতে পারে।
অন্য যেকোনও ঝড়ের মতোই তুষার ঘূর্ণিঝড়ও তৈরি হয় যখন বিভিন্ন বায়ুর ভরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সাধারণত, ঠান্ডা এবং শুষ্ক বায়ু উত্তর দিক থেকে নিচে চলে যায় এবং উষ্ণ, আর্দ্র বায়ু গ্রীষ্মমণ্ডল থেকে উঠে আসে। উষ্ণ বায়ু দ্রুত বৃদ্ধি পায় আর ছড়িয়ে পড়ে, মেঘ তৈরি করে, বায়ুচাপ কমায় এবং একটি ঝড়ের রূপ নেয় যা নিম্নচাপের কেন্দ্রের চারপাশে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সঞ্চালিত হয়। ঝড় দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে মানেই বেশি পরিমাণে উষ্ণ বাতাস ঝড়ের ঘূর্ণির মধ্যে এসে পড়ছে। ঝড়ের উপরের দিক থেকে যতটা বায়ু ভিতরের দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে তার থেকে বেশি বাতাস বের হয়ে গেলেই বাতাসের চাপ আরও কমে যায়। এই ব্লিজার্ডকে আবহাওয়াবিদরা বোমা সাইক্লোনও বলছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Air pollution in Delhi: ভারতের রাজধানীর ধোঁয়া চিত্র বদলাচ্ছে না। সাম্প্রতিক দূষণের পরিমাণ দেখে চমকে উঠছেন সাধারণ মানুষ।
বোমা সাইক্লোন কী?
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, 'বোমা ঘূর্ণিঝড়'-এর সবচেয়ে স্পষ্ট সংজ্ঞা হল, এটি একটি মধ্য-অক্ষাংশীয় ঝড় যার কেন্দ্রীয় বায়ুচাপ প্রতি ঘণ্টায় এক মিলিবার হারে হ্রাস পায়, আর এই হ্রাস পাওয়ার কাজটি চলতে থাকে ন্যূনতম ২৪ ঘণ্টার জন্য। উল্লেখ্য, স্বাভাবিক বায়ুচাপ প্রায় ১,০১০ মিলিবার। কিন্তু ঝড়ের সময় বায়ুর চাপ অনেক নিচে নেমে যায়। আসলে, চাপ যত কম, ঝড় তত শক্তিশালী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে যে তুষারঝড়ের তাণ্ডব ঘটেছে সেখানে বায়ুর চাপ ১,০০৩ মিলিবার থেকে ৯৬৮ মিলিবারে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই ৩৫ মিলিবার বায়ুচাপ হ্রাসকে 'এক্সপ্লোসিভ বম্বোজেনেসিস' বলা হয়ে থাকে।
নিউইয়র্ক রাজ্যের প্রশাসন জানিয়েছে, ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি! বিশেষ করে বাফেলোতে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা তুষারঝড়ে বরফ চাপা পড়েছেন মানুষ। যানবাহনের মধ্যে এবং বরফের তলা থেকে শুধুই উঠে আসছে মৃতদেহ। প্রচণ্ড এই তুষারঝড়ের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ১৫,০০০-এরও বেশি মার্কিন বিমান বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে বাফেলো।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cyclone Mandous: একাধিক ঝড়ের কবলে বারবার আশঙ্কিত হয়েছে তামিলভূম। এবার ফের মান্ডাসকে কেন্দ্র করেও তৈরি হয়েছে সেই আশঙ্কায়।

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, "অবশ্যই এটি শতাব্দীর ভয়াবহতম তুষারঝড়। পশ্চিম নিউইয়র্কের কিছু শহর রাতারাতি ৩০ থেকে ৪০ ইঞ্চি (০.৭৫ মিটার থেকে ১ মিটার) বরফে ঢেকে গেছে।"
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে আরও ১৪ ইঞ্চি বাড়তে পারে বরফ। সারা শহরটাই সাদা বরফের মোটা আস্তরণের তলায়, অনলাইন ব্যবস্থা পর্যুদস্ত! সূত্র বলছে, ১৯৭৭ সালে এমনই এক ভয়াবহ তুষারঝড়ের সাক্ষী ছিলেন মানুষ, সেবারের ওই কুখ্যাত ঝড়ে বাফেলোর প্রায় ৩০ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন, সংখ্যাটা এবার আরও বেশি।
ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা এবং অন্যান্য বিপর্যয় মোকাবিলা দলগুলি তুষার ঢাকা গাড়ি এবং বিদ্যুৎবিহীন বাড়ি থেকে শত শত মানুষকে উদ্ধার করেছে, তবে কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন আর কোনও রকম যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না।
বাফেলোর বাসিন্দা হোচুল বলছেন, উদ্ধারের সময় শহরের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যেতে হয়। যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনও এলাকা। রাস্তার পাশে বরফে চাপা পড়ে আছে যানবাহনগুলি। উঁচু বাড়িগুলো অন্ধকার, বরফের গ্রাসে। প্রকৃতির বীভৎসতম খেলা। চরম আবহাওয়ার কারণে ৪৮ টি সংলগ্ন মার্কিন রাজ্যে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে। মেক্সিকো সীমান্তে টেক্সাসের নতুন উদবাস্তুরা আশ্রয় খোঁজার লড়াই করেছে।
এই বীভৎস ঠান্ডার মাঝে বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছেন প্রায় ১.৭ মিলিয়ন মানুষ। বিদ্যুতের একটি সাবস্টেশন ১৮ ফুট বরফের নিচে চাপা পড়ে গেছে। বাফেলোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শহরের বেশিরভাগ অংশেই গাড়ি চালানোর নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর রয়েছে।















