ছিল না কোনও 'গডফাদার', লড়াই করে যেভাবে ভারতজয় দেশের তৃতীয় ধনীতম মহিলা রাধা ভেম্বু-র
Radha Vembu India's Third Richest Woman : উত্থানের পেছনে কোনও বড় হাত নেই, কোনও গডফাদার নেই। নিজের চেষ্টায় আজ এই জায়গায় পৌঁছেছেন রাধা ভেম্বু।

এক ঝলক দেখলে আর পাঁচজন ভারতীয় মধ্যবয়স্কা মহিলার থেকে খুব একটা আলাদা মনে হবে না। অফিসে যাচ্ছেন, কাজ করছেন, তারপর বাড়ি ফিরে সংসারও সামলাচ্ছেন। আমার আপনার পাশ দিয়েই হয়তো হেঁটে চলে যাবেন তিনি। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে এক ফোঁটাও বোঝা যাবে না, এই ভদ্রমহিলা একটি কর্পোরেট কোম্পানির অন্যতম মালিক! তাঁর সংস্থা দক্ষিণ ভারতের অন্যতম টেক কোম্পানি। এমনকী, একেবারে সাদাসিধা দেখতে এই ভদ্রমহিলার সম্পত্তির পরিমাণ শুনলে মাথায় হাত পড়ে যাবে! হ্যাঁ, কথা হচ্ছে রাধা ভেম্বু-কে (Radha Vembu) নিয়ে। এই মুহূর্তে ভারতের মহিলাদের তৃতীয় ধনীতম স্থানটি দখল করে রয়েছেন তিনি। সেইসঙ্গে তিনি ভারতের ধনীতম স্বনির্ভর, স্বয়ংসম্পূর্ণ মহিলাও বটে। যার উত্থানের পেছনে কোনও বড় হাত নেই, কোনও গডফাদার নেই। নিজের চেষ্টায় আজ এই জায়গায় পৌঁছেছেন রাধা ভেম্বু।
১৯৭২ সালে জন্ম রাধা ভেম্বুর। তাঁর পরিবার ছিল আর পাঁচটা ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই। বাবা মাদ্রাজ হাইকোর্টে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতেন। যা পেতেন, সেই আয়েই চলত সংসার। রাধা এবং তাঁর ভাইরাও সেই পরিস্থিতির মধ্যেই বড় হচ্ছিলেন। অর্থের প্রাচুর্য কখনই ছিল না সেখানে। বরং সেখানে ছিল মূল্যবোধ, শিক্ষা, একাগ্রতা ও বড় হওয়ার ইচ্ছে। ছোট থেকেই মেধাবী পড়ুয়া ছিলেন রাধা। বোধহয় বড়, আরও বড় হওয়ার স্বপ্নটা সেই ছোট্ট থেকেই পেয়ে বসেছিল। তবে বাঁকা পথে নয়, পরিশ্রম, নিষ্ঠা আর মূল্যবোধই ছিল তার ভিত্তি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিনের ইয়াং হুইয়ানকে টপকে বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে ধনী মহিলা সাবিত্রী জিন্দাল। শুক্রবার ব্লুমবার্গের প্রকাশিত ইনডেক্স অনুযায়ী সাবিত্রী জিন্দাল এশিয়া তথা ভারতের ধনীতম মহিলা এবং দেশের ধনকুবেরদের তালিকায় দশ নম্বরে রয়েছে তাঁর নাম।
চেন্নাইয়ের ন্যাশনাল হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে পড়াশোনা করেন রাধা ভেম্বু। তারপর নিজের যোগ্যতায় জায়গা পান আইআইটি মাদ্রাজে। ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যশালী ও নামী এই প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। স্নাতক হওয়ার আগেই একটি অন্য নেশা পেয়ে বসে তাঁর – ব্যবসা। নিজের বাড়ির ভেতরেই সেই স্বপ্নটি দেখা শুরু হয়। রাধার দুই ভাই, শ্রীধর ও শেখর ভেম্বু তখন নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির পথে হাঁটবেন বলে স্থির করেছেন। একটা নতুন সংস্থা, যা আরও কয়েক হাজার মানুষের ভাত জোগাড়ের ব্যবস্থা করবে। শ্রীধর ও শেখরের সেই স্বপ্নের সঙ্গে জুড়ে যান বোন রাধাও। ১৯৯৬ সাল। পথচলা শুরু হল জোহো কর্পের (Zoho Corp)।
তখনও স্নাতক হওয়ার এক বছর বাকি। ব্যবসা আর পড়া একসঙ্গে চালিয়ে নিয়ে গেলেন রাধা ভেম্বু। ১৯৯৭ সালে আইআইটি থেকে স্নাতক পাস করেন। তারপর জোহো কর্পই সর্বক্ষণের ধ্যানজ্ঞান। এই সংস্থার সবচেয়ে বড় অংশীদারও তিনি। মধ্যবিত্ত হওয়ার বাধা টপকে আকাশ ছোঁয়ার যাত্রার শুরু এটাই। ১৯৯৬ সালের পর পেরিয়ে গিয়েছে ২৬টি বছর। এখন জোহো কর্পকে সবাই একনামে চেনে। ভারতের অন্যতম কোটিপতি, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলির মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকবে এই প্রতিষ্ঠান। এই সফটওয়্যার সংস্থাটি ক্লাউড বেসড বিজনেস প্রোডাক্টের জন্য গোটা বিশ্বে পরিচিত। আজ এই কোম্পানির উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। কয়েক লাখ কোটি টাকার ব্যবসা তাদের, বিশ্বের ৯টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই সফটওয়্যার কোম্পানি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tirupati Balaji Temple Asset: তিরুপতি মন্দির সম্পদের দিক থেকে দেশের বৃহত্তম কোম্পানি যেমন উইপ্রো, নেসলে এবং ওএনজিসিকেও ছাড়িয়ে গেছে। সোজা কথায়, তিরুপতি মন্দির দেশের এই তিনটি বড় কোম্পানির থেকেও ধনী।
আর রাধা ভেম্বু? এই মুহূর্তে ভারতের তৃতীয় ধনীতম মহিলার তকমা তাঁর নামের পাশে। ফোর্বসের রিয়েলটাইম রিচ লিস্ট অনুযায়ী, রাধা ভারতের ধনীতম সেলফ মেড মহিলাও বটে। জোহো কর্পের পাশাপাশি জানকি হাই টেক অ্যাগ্রো ও হাইল্যান্ড ভ্যালি কর্পোরেশন প্রাইভেট লিমিটেড নামের দুটি সংস্থা সঙ্গেও জড়িত তিনি। এই মুহূর্তে জোহো মেইলের প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। ২৫০ জনের বিশাল একটা টিম একার হাতে সামলান তিনি। আক্ষরিক অর্থেই দশভূজা বলা যায় তাঁকে!
রাধা ভেম্বুর সম্পত্তির পরিমাণ? ২.৬ কোটি মার্কিন ডলার! ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২১,৫০০ কোটি টাকা! অথচ সেভাবে তাঁকে কখনও লাইমলাইটে দেখা যায় না। বরাবরের আড়ালপ্রিয় মানুষ তিনি। সংসার, সন্তান, কাজ নিয়েই ব্যস্ত তিনি। কাজই আসলে কথা বলে, কাজই থেকে যাবে, তার জন্যই যাবতীয় পরিচয় – এমন কথাই মানেন তিনি। তাই এত হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েও নিরুত্তাপ রাধা ভেম্বু। একইরকম সাধারণ। সেই পুরনো দিনের মতো, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটির মতো।















