একের পর এক সিনেমায় ‘না’ সব্যসাচী চক্রবর্তীর, কেন এত বড় সিদ্ধান্ত নিলেন বাঙালির 'ফেলুদা'
Sabyasachi Chakroborty : বাঙালি তাঁর হাত ধরেই নতুন করে অভ্যস্ত হল ঘরোয়া গোয়েন্দা চরিত্রে। যিনি একদিকে আইকনিক, অন্যদিকে আইডল

একা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নন, বাঙালির কাছে তিনিও পরিচিত ‘ফেলুদা’ হিসেবেই। নায়ক সুলভ ছিল না কোনও দিনই, তবে আর যা ছিল সেটুকুই অনন্য। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, দরাজ গলার স্বর, অমন উচ্চতা, বাঙালির মনে গোয়েন্দা হিসেবে আইকনিক সব্যসাচী চক্রবর্তী। সম্প্রতি ঢাকা চলচ্চিত্র উৎসবের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তিনি। একটু সাক্ষাৎকারে নিজে মুখে বলেন, অবসর নেওয়ার কথা। সঞ্চালিকা তাঁর আগামী কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে সরাসরি বলেন, অভিনয়ের প্রস্তাব আসলেও আপাতত সবেতেই না করে দিচ্ছেন তিনি। তাঁর এই কথায় সিঁদুরে মেঘ ঘনায়। অবশ্য বেশি রহস্য না করেই ফেলুদা বলে দেন অবসর নিতে চান তিনি। আচমকা এমন সিদ্ধান্তে যেন আকাশ থেকে পড়েছে টলিপাড়ার সক্কলে। এমনকী তাঁর ছেলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও জানান এই বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানত না পরিবার।
সব্যসাচী চক্রবর্তী, বাঙালির ফেলুদা। এইটুকুই কাফি। জোছন দস্তিদারের ‘তেরো পার্বন’ সিরিয়াল দিয়েই অভিনয় জগতে পা রাখেন তিনি। তার পর একের পর এক অনবদ্য অভিনয়। ‘রুদ্রসেনের ডায়েরি’ নামক ধারাবাহিকে প্রথম গোয়েন্দা হিসেবে পরিচিতি অন তিনি। সেই অভিনয়ে একটা মাইলফলক তৈরি করলেন তিনি। বাঙালি অভ্যস্ত হল ঘরোয়া গোয়েন্দা চরিত্রে। যিনি একদিকে আইকনিক, অন্যদিকে আইডল। অতঃপর ‘ফেলুদা’ চরিত্র। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর মতো রূপের ঝলক তাঁর ছিল না কোনও দিনই, কেবল অভিনীত দক্ষতা দিয়েই মন কাড়লেন দর্শকদের। সৌমিত্র হয়ে ধারা তৈরি করেছিলেন তিনি তাকে নিয়ে গেলেন অন্য মহিমায় ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এতজন পরিচালক, এত অভিনেতার ভিড়ে এই দু'টি চরিত্রের রোমাঞ্চ, যে কোনও পর্দার জন্যই ধ্বংস হয়ে গেছে।
একের পর এক অনবদ্য অভিনয়, ‘অন্তর্ধান’, ‘চতুরঙ্গ’, ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন’, ‘মহুলবনির সেরেং’, ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’, ‘টীনটোরেটর যীশু’, ‘রক্তমুখি নীলা’, ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’, ‘গোরস্থানে সাবধান’ উপহার দিয়েছেন অসাধারন চলচ্চিত্র। শুধু সিনেমায় নয়, ছোট পর্দাতেও সমান দক্ষতা ছিল তাঁর। একাকী অরণ্যে, উড়নচন্ডী, দ্বিরাগমন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাশাপাশি অভিনয় করেছেন বেশ কিছু হিন্দি ও তামিল ছবিতে। যেমন স্কেচ, পুলি, সিংগম থ্রি, লিংগা প্রভৃতি।
সদা হাস্যময়, দিলখোলা মানুষ সব্যসাচী। ভালোবাসেন বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে। সময় সুযোগ পেলেই ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়েন ফেলুদা। বাস্তব জীবনে যেমন রহস্য ভালোবাসেন ঠিক তেমনি পর্দায় ফেলুদা চরিত্রে রহস্যের জল ছিঁড়তে পারেন স্বমহিমায়। তবে বাঙালির ফেলুদার তো বয়স বাড়ে না, কিন্তু মানুষ সব্যসাচীর বয়স বাড়ে বৈকি! তাই ঠিক সময় নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন আইকনিক চরিত্র থেকে। বলেছিলেন, ‘ফেলুদার চরিত্রে আর নয়’। তবে অন্যান্য চরিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। সম্প্রতি ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী। এই প্রথমবার ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন তিনি। সব্যসাচী অভিনীত ছবি ‘জেকে ১৯৭১’ শনিবার প্রিমিয়ার হয়েছে চলচ্চিত্র উৎসবে। ছবির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ফাখরুল আরেফীন খান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রদোষচন্দ্র মিত্র অথবা ফেলুদা বাঙালির খুব প্রিয় এক চরিত্র। ফেলুদার ব্যাপারে প্রায় সব তথ্য বাঙালির নখদর্পণে থাকলেও তার পরিবারের ব্যাপারে বেশি কিছু জানা যায় না।
ওপার বাংলাতে গিয়েই প্রথম বোমাটা ফাটান অভিনেতা। তার পর থেকেই চর্চায় তিনি। সকলেরই মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে কেন এত বড় সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি? অভিনেতা অবশ্য অকপট এই বিষয়ে। বয়স লুকিয়ে নিজেকে ছোট প্রমাণ করতে চান না তিনি। বললেন, বয়স তো হচ্ছে এবার অবসর জরুরি। গ্ল্যামার দুনিয়াটা এমনই যেখানে প্রতিনিয়ত নিজেকে নায়ক হিসেবে ধরে রাখতে চান সকলে। রূপ গেলেই নাকি চাকরি বাতিল! অথচ সেই তালিকায় একেবারেই ব্যতিক্রম বেণুদা। নতুনদের জায়গা ছাড়তে চান তিনি। পাশাপাশি বলেন, কোভিড হওয়ার পর থেকেই শরীর দুর্বল,তাই কাজ থেকে বিরতির সিদ্ধান্ত তাঁর।
অভিনয় জগৎ এমন একটা জায়গা যেখানে তথাকথিত অবসর বলে কিচ্ছু হয় না। তাবড় তাবড় অভিনেতারা আমৃত্যু মঞ্চ আঁকড়ে থেকেছেন। সেখানে একেবারেই অন্য পথ দেখলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। কাজ যখন নিজে থেকে অবসর দেবেই না, তখন নিজেই নিজেকে অবিদির দিতে চাইলেন তিনি। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জেকে ১৯৭১’ ছবিটিই কি তবে তাঁর শেষ কাজ? আশঙ্কায় একপ্রকার সিলমোহর চাপালেন নিজেই। ‘জেকে ১৯৭১’, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সিনেমা। ছবির প্রেক্ষাপট, ২৮ বছর বয়সী এক দুরন্ত সাহসী যুবককে নিয়ে। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান। ছবিতে এক পাকিস্তানি পাইলটের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘ফেলুদা’ খ্যাত সব্যসাচী চক্রবর্তী।
‘বুড়ো হয়ে গিয়েছি’, নিজে মুখে বয়সের এমন স্বীকারোক্তি সত্যিই চমকপ্রদ। সব্যসাচী নাম যেন এখানে এসেই সার্থকতা পায়। দুই ছেলেই প্রতিষ্ঠিত অভিনয় জগতে। আর পাঁচটা চাকুরীজীবী বাঙালি বাবার মতোই এখন তাঁর রিটায়ারমেন্ট-এর সময়। নিজের মতো করে কাটাতে চান এই সময়টা। অবসরের পর কী কী করবেন, একটা পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। অভিনেতা জানিয়েছেন, পছন্দের খাবার খাবেন, ঘুমাবেন, বই পড়বেন, টেলিভিশন, ওটিটি দেখবেন, খেলা দেখবেন আর অবশ্যই আজীবন যে নেশা তাঁকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে, ঘোরা আর ছবি তোলা,সেটাও চালাবেন পুরোদমে।
এই আচমকা অবসরের খবর অবাক করায় বটে, তবে অভিনেতাকে নতুন করে চেনা যায়। ঠিক যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটা কবিতার মতো। কবিতার নাম, ছাড়পত্র। “এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান”। জায়গা আঁকড়ে ধীরে রাখার মধ্যে কোনও সার্থকতা যে নেই অভিনেতা সেকথা বোঝেন। তাই এমন সিদ্ধান্ত। অভিনয় জগৎকে এবার খানিক দূর থেকে প্রত্যক্ষ করবেন তিনি। বুঝবেন, উপলব্ধি করবেন। পর্দায় না হোক, অভিভাবকের মতো তিনি থাকবেন টলিপাড়ার অন্দরে।
















