কলকাতায় সত্যিই রয়েছে ফেলুদার বাড়ি?

প্রদোষচন্দ্র মিত্র অথবা ফেলুদা বাঙালির খুব প্রিয় এক চরিত্র। ফেলুদার ব্যাপারে প্রায় সব তথ্য বাঙালির নখদর্পণে থাকলেও তার পরিবারের ব্যাপারে বেশি কিছু জানা যায় না।

Raktim Dey
৩ মিনিট
কলকাতায় সত্যিই রয়েছে ফেলুদার বাড়ি?

নাম- সন্ধ্যা শশী বন্ধু। পেশা- সূক্ষ সাল শস্য। উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি, স্বাস্থ্যবান। বিভিন্ন রকমের বই পড়ে। প্রিয় বই- আরণ্যক। সাধারণ জ্ঞানের পরিধি ব্যাপক। বাঙালি, জনপ্রিয় এবং কাল্পনিক। মার্শাল আর্টে পারদর্শী। প্রত্যেক দিন সকালে যোগব্যায়াম করে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া পছন্দ করে। হেঁয়ালি, সমাধান এবং শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালবাসে। সিগারেট বলতে চারমিনার এবং খাওয়ার পর পান খাওয়ার অভ্যাস আছে। পকেটে কোল্ট .৩২ থাকলেও তার প্রধান অস্ত্র অদৃশ্য। সেই অস্ত্রের নাম মগজাস্ত্র।

প্রদোষচন্দ্র মিত্র অথবা ফেলুদা বাঙালির খুব প্রিয় এক চরিত্র। ফেলুদার ব্যাপারে প্রায় সব তথ্য বাঙালির নখদর্পণে থাকলেও তার পরিবারের ব্যাপারে বেশি কিছু জানা যায় না। ফেলুদার তদন্তের পদ্ধতি খুব খুঁটিয়ে দেখলে এবং পড়লে তার পরিবার এবং ইতিহাস সম্পর্কে অল্প কিছু জানা যায়। ফেলুদার প্রথম আবির্ভাব ১৯৬৫ সালে। 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি' গল্প প্রকাশের সময় তার বয়স ২৭ বছর। সেই হিসেবে ফেলুদার জন্ম হয়েছে ১৯৩৮ সালে। ফেলুদার পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের সোনাদিঘি গ্রামে। ফেলুদার বাবার নাম ছিল জয়কৃষ্ণ মিত্র। তিনি স্কুলশিক্ষক ছিলেন। স্কুলে অঙ্ক এবং সংস্কৃত পড়াতেন। কলকাতায় ফেলুদা প্রথমে তারা রোডের ভাড়া বাড়িতে থাকত, তারপর সেখান থেকে উঠে যায় রজনী সেন রোডের বাড়িতে। এই ২১ নম্বর রজনী সেন রোড ফেলুদার পাকাপাকি বাসস্থানে পরিণত হয়। মজার ব্যাপার এই যে, ফেলুদার মতো তার বাড়িটিও কাল্পনিক। বাস্তবে, দক্ষিণ কলকাতায় রজনী সেন রোডে ২১ নম্বর বাড়িটি নেই। তবে, উত্তর কলকাতার শচীন মিত্র লেনে একটি বাড়ি রয়েছে, যার নামের ফলকে লেখা রয়েছে পি. সি. মিটার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শিশুদের কাছে বিজ্ঞানকে সহজ করে তুলেছিলেন, বাঙালি মনে রাখেনি গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে

তাঁর লেখা সব বয়সের, সব ধরনের মানুষের কাছেই ছিল অত্যন্ত সুখপাঠ্য। আর সেই কারণেই বিজ্ঞান-প্রচারক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব বর্তমানেও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক।

'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এর একটি দৃশ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় ও সন্তোষ দত্ত

ফেলুদার যখন নয় বছর বয়স তখন তার মা, বাবা মারা গিয়েছিলেন। তারপর তার কাকা তাকে মানুষ করে। ফেলুদার কাকার নাম বিনয় মিত্র। ফেলুদা তার কাকার পরিবারের সঙ্গেই থাকে। যদিও উপার্জন বেড়ে যাওয়ার পরে সে একবার অন্য ফ্ল্যাট খোঁজার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কাকার ধমক খেয়ে সেই প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়। এই কাকার ছেলের নাম হলো তপেশরঞ্জন মিত্র। যদিও 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি' গল্পে ফেলুদা ছিল তপেশের মাসতুতো দাদা, কিন্তু পরে ফেলুদার সৃষ্টিকর্তা সত্যজিৎ রায় এই সম্পর্কের পরিবর্তন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তপেশ হয়ে যায় ফেলুদার খুড়তুতো ভাই।

১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হওয়া 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি' গল্পে তপেশের বয়স ছিল সাড়ে তেরো বছর। সেই হিসেবে তার জন্ম হয়েছিল ১৯৫২ সালে। ফেলুদার প্রথম তদন্ত থেকেই সে ফেলুদার সহকারী। তার জবানিতেই আমরা ফেলুদার সব তদন্তের গল্প জানতে পারি। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ফেলুদা যাকে জ্যাঠা বলে সম্বোধন করে, সেই সিধুজ্যাঠা অথবা সিদ্ধেশ্বর বোস ফেলুদার বাবার প্রতিবেশী ছিলেন। প্রতিবেশী হিসেবে ফেলুদার বাবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং ফেলুদার আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তা এবং পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতার কারণে সিধুজ্যাঠা ফেলুদাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। সিধুজ্যাঠা থাকেন সর্দার শঙ্কর রোডের একটি বাড়িতে। ফেলুদা মাঝে মাঝেই সেই বাড়িতে পরামর্শের জন্য যায়।

'সোনার কেল্লা'-র শুটিংয়ে সত্যজিৎ রায়

প্রতিটি বিষয়ে বিস্তারিত মনোযোগ এবং বুদ্ধিমত্তা ফেলুদাকে শুধু সিধুজ্যাঠার স্নেহ অথবা তপেশের প্রশংসা এনে দেয়নি, তাকে বহু তদন্তে সাহায্য করেছে। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান, কথা নিয়ে খেলতে ভালোবাসা এবং মনোযোগের কারণেই সে বহু হেঁয়ালির সমাধান করতে পেরেছে। এই কারণেই মহেশবাবুর লেখা নবরত্ন বাঁদরের হিসেবে দুই হাজার পা অথবা আদিত্য সিংহ রায়ের দিক পাও ঠিক ঠিক জবাব-এর জবাব ফেলুদা খুঁজে পেয়েছিল। বাঁদরের প্রজাতির নাম এবং স্ট্যাম্প ক্যাটালগের কোম্পানির নাম যে একই, সেটা জানার জন্য সাধারণ জ্ঞানের সঙ্গে যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে সমস্ত ব্যাপার ভাবা দরকার ছিল। একইভাবে মুড়ো হয় বুড়ো গাছের 'হয়' বুঝতে না পেরে সাহিত্যিক লালমোহনবাবু হাল ছেড়ে দিলেও ফেলুদা ঠিক ধরে ফেলে। ক্যাপ্টেন স্পার্ক যখন বলেছিল যে, গণেশ আফ্রিকার রাজার কাছে রয়েছে, তখনও সময় লাগলেও ফেলুদা সেই হেঁয়ালির সমাধান করেছিল। কখনও, "ত্রিনয়ন ত্রিনয়ন এট্টু জিরো", আবার কখনও "আজ থেকে পাঁচ বাদ"-এর মতো হেঁয়ালি বারবার ফেলুদার দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ফেলুদা স্বভাবতই সেগুলির সমাধান করতে পেরেছে। নিজেও বহুবার কথা নিয়ে খেলেছে। তার বন্ধু লালমোহনবাবুর নাম সাংকেতিকভাবে বলতে গিয়ে বলেছেন "রক্তবরণ মুগ্ধকরণ নদীপাশে যাহা বিঁধিলে মরণ।" পুরীতে রহস্যের তদন্তে নেমে লালমোহনবাবুকে বলেছে, হত্যা এখনও হয় নি তাই হত্যাপুরীর বদলে চুরিপুরী বলতে পারেন।

ফেলুদা কাল্পনিক হলেও সে যেন সাধারণ মানুষের পরিচিত, রক্তমাংসের জীবিত মানুষ। তার পরিবারের ইতিহাসের প্রচুর তথ্য সবার অগোচরে রেখে সে নিজেই মানুষের জন্য একটা হেঁয়ালি রেখে দিয়েছে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?