আঁশে ঢাকা, দাঁতহীন নিরীহ প্রাণী! ভারতের প্যাঙ্গোলিন কেন হু হু করে পাচার হচ্ছে বিদেশে?
Pangolin Poaching: বিভিন্ন রোগ নিরাময় করাতে নাকি প্যাঙ্গোলিনের আঁশ অব্যর্থ। প্যাঙ্গোলিনের মাংসও অত্যন্ত সুস্বাদু।

বিশ্বব্যাপী পাচার হওয়া বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে পিপীলিকাভূক এই প্রাণীটি। পোশাকি নাম প্যাঙ্গোলিন। কেউ মাংস ভালোবাসে, কেউ আঁশ, কেউ বা নখ। ফলে পাচারের বাজারে এই নিরীহ প্রাণীর কদরই আলাদা! গত চারবছরে শুধু ভারতেই ১২০০ টিরও বেশি প্যাঙ্গোলিন চোরাচালান ও পাচার করা হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত, গত চার বছরে ভারতের এই ব্যাপক প্যাঙ্গোলিন পাচারের খতিয়ান সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার ইন্ডিয়া (WWF India) এবং ট্রাফিক (TRAFFIC) নামের এক বেসরকারি সংস্থার, যা বিশ্বে অবৈধ বন্যপ্রাণীর বাণিজ্য নিরীক্ষণ করে, এক যৌথ সাম্প্রতিক প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারের ৩৪২টি ঘটনায় ১,২০৩টি প্যাঙ্গোলিন (জীবিত এবং মৃত) বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সহজেই অনুমেয়, পাচার হয়ে যাওয়া প্রাণীর প্রকৃত সংখ্যা অনেকটাই বেশি। ওই ৩৪২টি ঘটনায় ৮৮০ কেজির বেশি প্যাঙ্গোলিনের নানা অংশ এবং ১৯৯টি জীবন্ত প্যাঙ্গোলিন পাওয়া গেছে।
কেন এত সংখ্যক প্যাঙ্গোলিন পাচারের ঘটনা ঘটছে ভারতে? প্যাঙ্গোলিন প্রধানত চিন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আন্তর্জাতিক বাজারে বহুমূল্য প্রাণী। প্যাঙ্গোলিনের আঁশের জন্য তাদের শিকার করা হয়। প্যাঙ্গোলিনের আঁশ প্রাচীন কিছু ওষুধের উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন রোগ নিরাময় করাতে নাকি প্যাঙ্গোলিনের আঁশ অব্যর্থ। প্যাঙ্গোলিনের মাংসও অত্যন্ত সুস্বাদু। ফলে ঔষধি গুণের জন্য এই মাংস খাওয়ার চলও বিপুল।
২০১৮ সালে প্রকাশিত TRAFFIC-এর একটি বিশ্লেষণ বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৬,০০০টি প্যাঙ্গোলিন শিকারের সন্ধান মেলে। গত বছর, TRAFFIC দেখেছে, এশিয়ার মধ্যে ভারতে ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্যাঙ্গোলিন ধরা পড়েছে ২৮৭ বার। ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই) ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৩৩৬.৯ কেজি প্যাঙ্গোলিনের আঁশ বাজেয়াপ্ত করেছে বলেও জানা গেছে। WWF-TRAFFIC জানাচ্ছে, ভারতের মধ্যে ওড়িশায় সর্বাধিক সংখ্যক প্যাঙ্গোলিন বাজেয়াপ করা হয়েছে। ৭৪ টি বাজেয়াপ্তর ঘটনায় ১৫৪টি প্যাঙ্গোলিন উদ্ধার হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dreams of Animals: কীভাবে ঘুমন্ত প্রাণীদের মনের মধ্যে ঢোকা যায় সেই কাজটি ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়।
২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জীবিত প্যাঙ্গোলিন এবং তাদের নানা অংশ যেমন আঁশ, মৃতদেহ, চামড়া, নখ, মাংস, হাড় এবং অন্যান্য অংশ বাজেয়াপ্ত করা হয়। সর্বাধিক সংখ্যক জীবিত প্যাঙ্গোলিন ওড়িশা থেকে উদ্ধার করা হয় (৪৫টি ঘটনায় ৫০টি প্যাঙ্গোলিন মেলে), এরপরেই মহারাষ্ট্রে ২৭ টি ঘটনায় ৩২টি প্যাঙ্গোলিন উদ্ধার হয়।

প্যাঙ্গোলিন ভারতের একমাত্র পরিচিত স্তন্যপায়ী প্রাণী যাদের দেহ বিশাল কেরাটিন আঁশে ঢাকা। প্যাঙ্গোলিন দাঁতহীন, নিশাচর, গর্তের মধ্যে বাস করে। প্রধানত পিঁপড়ে আর উইপোকা খায় প্যাঙ্গোলিন। বিশ্বব্যাপী প্যাঙ্গোলিনের ৮ টি প্রজাতি রয়েছে, চারটি আফ্রিকায় ও চারটি এশিয়ায়। ভারতে এর মধ্যে দু'টি প্রজাতির বাসস্থান - ভারতীয় প্যাঙ্গোলিন মানিস ক্রাসিকাউডাটা এবং চিনা প্যাঙ্গোলিন মানিস পেন্টাডাক্টিলা। ভারতীয় প্যাঙ্গোলিন মেলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কায়। ভারতে প্যাঙ্গোলিনের এই প্রজাতি ছড়িয়ে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ, অসম, বিহার, ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাত, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মেঘালয়, ওড়িশা, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Snake Venom: হানি ব্যাজারের চামড়াই এত মোটা যে সাপের বিষ দাঁতের পক্ষে সম্ভব নয় সেই চামড়া ভেদ করা
চিনা প্যাঙ্গোলিন পাওয়া যায় বাংলাদেশ, ভুটান, চিন, হংকং, ভারত, লাও পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক, মায়ানমার, নেপাল, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে। ভারতে, অরুণাচল প্রদেশ, অসম, বিহার, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গেও কিছু কিছু মেলে এই চিনা প্রজাতি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যাঙ্গোলিন আসলে যা শিকারী এবং শিকার দুই-ই। সেই কারণেই বিশাল পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে এই প্রাণীদের। প্যাঙ্গোলিন পোকামাকড় খেয়ে তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্যাঙ্গোলিনকে 'ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার' নামেও ডাকা হয়। প্যাঙ্গোলিন মাটিতে গর্ত তৈরি করে যা মাটির জৈব পদার্থ সঞ্চালনে সাহায্য করে, মাটির আর্দ্রতা এবং বায়ুচলাচল বৃদ্ধি করে গাছের বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে। প্যাঙ্গোলিনের তৈরি গর্ত এই বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে অন্যান্য প্রজাতির আশ্রয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়। স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ এবং অমেরুদণ্ডী প্রাণী সহ ৩০টিরও বেশি প্রজাতি প্যাঙ্গোলিনের গর্ত বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বলে জানা গিয়েছে।
ভারতে, ভারতীয় প্যাঙ্গোলিন এবং চিনের প্যাঙ্গোলিন দু'টিকেই ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইনের তফসিল ১-এ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাই এই প্যাঙ্গোলিনের শিকার, বাণিজ্য বা তাদের দেহের অঙ্গ এবং অন্য কোনও অংশের কোনও ধরনের ব্যবহার নিষিদ্ধ। ২০১৭ সাল থেকে সমস্ত প্যাঙ্গোলিন প্রজাতি Convention on International Trade in Endangered Species (CITES)-এর পরিশিষ্ট ১-এ তালিকাভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তাদের বাণিজ্যও নিষিদ্ধ। আইনের এত প্যাঁচ, এত সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও প্যাঙ্গোলিন নিয়ে অবৈধ ব্যবসার রমরমা দেশে। প্যাঙ্গোলিন উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করছে ভারতের এই প্রাকৃতিক সম্পদ, বিপন্ন সম্পদ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। বিদেশের বাজারের খিদে মেটাতে জ্যান্ত হোক, মৃত হোক, স্রেফ আঁশ হোক- কিছুই বাকি নেই বিক্রির। বিনিময়ে যদি বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাক, যাক না! যা গেছে, যা যাচ্ছে তা যাক...















