স্বপ্নে রেওয়াজ করে পাখিরা! জানেন, ঘুমিয়ে কী কী স্বপ্ন দেখে প্রাণীরা?

Dreams of Animals: কীভাবে ঘুমন্ত প্রাণীদের মনের মধ্যে ঢোকা যায় সেই কাজটি ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
স্বপ্নে রেওয়াজ করে পাখিরা! জানেন, ঘুমিয়ে কী কী স্বপ্ন দেখে প্রাণীরা?

সব প্রাণীই ঘুমোয়, তা সে জলচর হোক, পাখি হোক, ডাঙায় বাস করা পশু হোক! কিন্তু মানুষ বাদে এই যে বিপুল প্রজাতির ব্যাপক সংখ্যক প্রাণী, তারা কি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে? অ্যারিস্টটল তাঁর 'দ্য হিস্ট্রি অব অ্যানিম্যালস’-এ লিখেছেন, "এটা মনে হতে পারে যে শুধু মানুষই স্বপ্ন দেখে! নাহ, আসলে ঘোড়া, কুকুর, বলদ, ভেড়া, ছাগল এবং সব চতুষ্পদী প্রাণীই স্বপ্ন দেখে এবং কুকুর ঘুমের মধ্যে ঘেউ ঘেউ করে উঠছে মানে সে স্বপ্ন দেখছে।" তাঁর গবেষণা পদ্ধতি হয়তো পরিশীলিত ছিল না ততখানি, কিন্তু অ্যারিস্টটল খুব একটা ভুলও বলেননি। তা, প্রাণীরা কীসের স্বপ্ন দেখে? মানুষ যেমন জটিলতম গভীরতায় ঢুকে পড়ে ঘুমের মধ্যে, প্রাণীরাও কি তাই?

প্রাণীরা কী স্বপ্ন দেখে তা বলা মুশকিল কিন্তু তারা যে স্বপ্ন দেখে তা তো সহজেই বোঝা যায়। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এই কাজটি বুঝতে চেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, দু'টি পদ্ধতিতে। এক, ঘুমের চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাণীদের শারীরিক আচরণের দিকে নজর দেওয়া। দুই, প্রাণীদের ঘুমন্ত মস্তিষ্ক আমাদের ঘুমন্ত মস্তিষ্কের মতো একইভাবে কাজ করে কিনা তা খতিয়ে দেখা।

কীভাবে ঘুমন্ত প্রাণীদের মনের মধ্যে ঢোকা যায় সেই কাজটি ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়। সেই সময়েই বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হতে থাকে যে, মানুষজন কীভাবে স্বপ্নে চলাফেরা করে। বিষয়টা খুবই কৌতূহলের কারণ REM-এর (rapid eye movement) সময়, আমাদের পেশি সাধারণত অসাড় থাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঁদরেরই জাত ভাই! তবে কেন মানুষের মতো বুদ্ধি ধরে না অন্য কোনও প্রাণীই?

Human Brain: মস্তিষ্কে নিউরোনের অন্তর্জাল বা নিউরোনাল নেটওয়ার্ক সাধারণত আমাদের অভিজ্ঞতা এবং অভ্যেসের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ব্রেন প্লাস্টিসিটি

গবেষকরা বুঝতে পেরেছিলেন, প্রাণীদের মধ্যেও এরকম একটি অবস্থা তৈরি করতে পারলে তারা কীভাবে স্বপ্ন দেখে তা বোঝা গেলেও যেতে পারে। ১৯৬৫ সালে, ফরাসি বিজ্ঞানী মিশেল জুভেট এবং জে এফ ডেলরমে দেখতে পান, বিড়ালের মস্তিষ্ক থেকে ব্রেনস্টেমের একটি অংশ, যাকে পন বলা হয়, সরিয়ে নিলে REM অবস্থায় থাকাকালীনও দেহ অসাড় হচ্ছে না। গবেষকরা এই অবস্থাটিকে REM without atonia বা REM-A বলে অভিহিত করেন। এই অবস্থায় শুয়ে থাকার পরিবর্তে বিড়ালরা চারপাশে হেঁটে বেরিয়েছিল এবং আক্রমণাত্মক আচরণও করেছিল।

এতে স্পষ্ট হয়, জেগে থাকার সময় তারা যা যা করে, সেসবেরই স্বপ্ন দেখছে বিড়ালরা। কিছু বিড়াল ঘুমের মধ্যে শিকার ধরার সময়ের আক্রমণের মতো আচরণ করে, যেন তারা স্বপ্নে ইঁদুর তাড়া করছে। কুকুরের ক্ষেত্রেও একই রকম স্বপ্ন দেখা গেছে। কিছু কিছু মানুষকেও স্বপ্নের মধ্যে কাজ করার ভঙ্গি করতে দেখা গেছে। তারা সাধারণত REM স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার নামক একটি রোগে ভোগেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব স্লিপ ডিসঅর্ডারস (ICSD) অনুযায়ী, "ঘুষি মারা, লাথি মারা, লাফানো এবং বিছানা থেকে দৌড়ানোর মতো আচরণ করে থাকেন এই ব্যক্তিরা। এই মানুষদের সঙ্গে যারা ঘুমোয় তারা হামেশাই আহতও হন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মানুষ এক ছোবলেই ছবি! তবে কোন রহস্যে সাপের তীব্র বিষেও বেঁচে যায় বন্য প্রাণীরা?

Snake Venom: হানি ব্যাজারের চামড়াই এত মোটা যে সাপের বিষ দাঁতের পক্ষে সম্ভব নয় সেই চামড়া ভেদ করা

যদিও শারীরিক কার্যকলাপই স্বপ্ন বোঝার চেষ্টার একমাত্র উপায় নয়। গবেষকরা এখন ঘুমনোর সময় প্রাণীদের মস্তিষ্কের কোষগুলির বৈদ্যুতিক এবং রাসায়নিক কার্যকলাপও দেখতে পারেন। ২০০৭ সালে, এমআইটি বিজ্ঞানী কেনওয়ে লুইস এবং ম্যাথিউ উইলসন হিপ্পোক্যাম্পাস নামে ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটি অংশে নিউরনের কার্যকলাপ রেকর্ড করেন, যা স্মৃতির গঠন এবং এনকোডিংয়ের সঙ্গে জড়িত। যখন ইঁদুরগুলি দৌড়চ্ছিল তখন প্রথম তাদের মস্তিষ্কের কোশগুলির কার্যকলাপ রেকর্ড করেন বিজ্ঞানীরা। তারপরে ঘুমনোর সময়ও একই নিউরনের কার্যকলাপ লক্ষ্য করা হয়। দৌড়ানোর সময় এবং REM চলাকালীন তাঁরা আবিষ্কার করেন, ইঁদুররা জেগে থাকা অবস্থায় যা করছিল, ঘুমের মধ্যেও একই।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানীরা এক ধরনের পাখিদের মস্তিষ্কেও একই বিষয় আবিষ্কার করেন। এই পাখিরা গানের সুর মস্তিষ্কে নিয়ে জন্মায় না; তাদের গান গাইতে শিখতে হয়। যখন এই পাখিরা জেগে থাকে, তখন জেব্রা ফিঞ্চ নামক পাখিদের মস্তিষ্কের সামনের কিছু অংশের নিউরোন, যাকে বলা হয় রোবুটাস আর্কিস্ট্রিয়াটালিস, তা বিশেষ সুর গাওয়ার পরে কাজ করতে শুরু করে। গবেষকরা সেই নিউরোনের প্যাটার্নের উপর ভিত্তি করে কোন সুরটি গাওয়া হয়েছিল তা নির্ধারণ করতে পারেন। পরে, যখন পাখিরা ঘুমিয়ে পড়ে, তাদের মস্তিষ্কের সেই অংশের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ ফের লক্ষ্য করেন বিজ্ঞানীরা। নিউরোনগুলি এমনভাবেই কাজ করছিল যেন পাখিটি মিষ্টি গান গাইছে, যেন ঘুমের মধ্যে গানের রেওয়াজ করছে!

বিড়ালদের আচরণ কি সত্যিই স্বপ্ন বিশ্লেষণ করতে পারে! ইঁদুররা কি জানে তারা ঘুমের মধ্যে এসব করে? পাখিরাও কি বুঝতে পারে যে তারা স্বপ্নে রেওয়াজ করছে? ঘুম ভেঙে স্বপ্ন কি মনে থাকে তাদের? কঠিন সেই উত্তর খোঁজা! মানুষও অনেক সময় ঘুমের মধ্যে বুঝতে পারে না এটা স্বপ্ন কী না। তবে জেগে উঠলেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রাণীরা কি স্বপ্নের পৃথিবীকে বাস্তব থেকে আলাদা করতে পারে? স্বপ্নের এই বিচিত্র জগত এখনও রহস্যই, মানুষের ক্ষেত্রেও চলছে গবেষণা, প্রাণীদের তো বটেই!

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।