বাংলাদেশে পেপারব্যক-প্রেমীদের দুর্দিন
Bangladesh Paperback Books : পশ্চিমা দেশে যেমন পেপারব্যাক সাধারণত আঠার বাঁধাইয়ের, বাংলায় সেলাই-করা পেপারব্যাকই বেশি। বঙ্গদেশে কি ভাল আঠা পাওয়া যায় না?

পেপারব্যাক মৃতপ্রায়। বাংলাদেশে তো বটেই। হয়তো, পশ্চিমবঙ্গেও। অর্থাৎ বাংলা পেপারব্যাকের দিন ফুরিয়েছে। শেষের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছিল সেও প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর হলো। এখনও দু'একজন অত্যুৎসাহী প্রকাশকের হাতে দু' একখানা পেপারব্যাক বেরোয়, কিন্তু তা বিকোয় না তেমন। ঢাকার এক প্রকাশনা সংস্থা দিন কয়েক আগে একই বইয়ের দুটো সংস্করণ বের করেছিল— বোর্ড-বাঁধাই, ইংরেজিতে যাকে আমরা হার্ডকভার হিসেবে চিনি, আর সুলভ, ইংরেজিতে যাকে পেপারব্যাক বলা যায়। বোর্ড-বাঁধাইয়ের বইয়ে দামি হোয়াইটপ্রিন্ট কাগজ আর সুলভে সস্তার নিউজপ্রিন্ট। দামের ফারাকও শ' তিনেক টাকার ওপরে। তারপরও দেখা গেল, দশটা বই বিক্রি হলে তার আটটা বোর্ড-বাঁধাই আর দুটো সুলভ। কিন্তু কেন?
প্রকাশকদের ধারণা, লোকে পেপারব্যাককে বই বলে মনেই করে না। অথচ গেল শতকের সাত-আটের দশকে, এমনকী নয়ের দশকের মাঝামাঝি ইস্তক, কী অবলীলায় পেপারব্যাক বের হতো ঢাকা থেকে। পাঠকেরাও, বিশেষত তরুণরা যাদের হাতে রেস্ত বেশি নেই, নির্বিবাদে পেপারব্যাকই কিনত। আটের দশকের শেষের দিকে চিত্রটা নজরে পড়ার মতো করে বদলাতে শুরু করে। বাংলাদেশের বাজার তখন কিংবা তার কিছুদিন পর হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন কিংবা জাফর ইকবালের। এর আগে বইয়ের রঙিন মলাট মানেই স্পট কালার। এল সি-এম-ওয়াই-কের যুগ। ভাবটা এমন যে, চার রঙের মোটা মলাট না হলে আবার বই কীসের! আর যা গোল করে পেঁচিয়ে মাছি মারা যায় এমন পেপারব্যাক ঘরে সাজিয়ে কৌলীন্য দেখানো যায় না। এক পরিচিত লেখক দিন কয়েক আগে বলছিলেন যে, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর একটা বই পেপারব্যাক হিসেবে বের হোক। প্রকাশক রাজি হননি, বই বিক্রি হবে না বলে।
পশ্চিমা বইয়ের বাজারে পেপারব্যাকের রকমফের হয়। বিলেতে C format বা রয়্যাল আকারের বই ছাপা হয় সাধারণত হার্ডকাভারে প্রথম সংস্করণের জন্য— ফিকশন হোক বা নন-ফিকশন। এই আকারে অবশ্য পেপারব্যাকও বের হয়। হার্ডকাভার বের হওয়ার ছ-মাস বা এক বছর পর প্রকাশক হয়তো তার চেয়ে ছোট B format আকারে কিংবা তার চেয়েও ছোট A format আকারে বইটির পেপারব্যাক সংস্করণ বের করে। বিলেতে C format-এ ট্রেড পেপারব্যাক বের হলেও, মার্কিনিদের কাছে ট্রেড পেপারব্যাক মানে আদতে B format। A format-এ ছাপানো পেপারব্যাকের নাম মাস-মার্কেট পেপারব্যাক। দু'ধরনের পেপারব্যাকেই সফটকভার, মোটা কাগজ বা পেপারবোর্ডের কভার।
তবে ট্রেড পেপারব্যাকে কাগজের মান মাস-মার্কেট পেপারব্যাকের কাগজের মানের থেকে ভাল। ট্রেড পেপারব্যাকে হরফের আকার বড়, পড়তে সুবিধে। মাস-মার্কেট পেপারব্যাকে হরফের আকার ছোট, পৃষ্ঠার মার্জিনও অস্বস্তিকরভাবে ছোট হতে পারে; পড়তে অসুবিধে তো বটেই, টেকেও সবচেয়ে কম দিন, কিন্তু দামও সবচেয়ে কম। পশ্চিমা বইয়ের বাজারে মাস-মার্কেট পেপারব্যাকের সামাজিক মূল্য একটু কম। এদের পাওয়াও যায় সুপারমার্কেটে, রেল স্টেশনে বা বিমান বন্দরে। একটা সময় ছিল যখন মাস-মার্কেট পেপারব্যাক সাহিত্য জগতে অনেকটা ব্রাত্য ছিল; অবশ্য বলা হয় যে, সে দোষ এখন অনেকটাই কেটে গেছে। আর হার্ডকাভারের পরেই সাহিত্য সমালোচকদের পছন্দ ট্রেড পেপারব্যাক। বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য মাস-মার্কেট পেপারব্যাক আর ভালো সমালোচনা পেতে হলে অন্তত ট্রেড পেপারব্যাক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Paperback Books and Bengali Readers: সত্যিই তো মাথা থেকে কর্তার ভূত ঝেড়ে না ফেলতে পারলে, কীভাবেই বা নতুন লেখা পাঠকের সামনে আসবে। আমার বিশ্বাস সমান্তরাল প্রকাশনার অক্সিজেন পেপারব্যাক।
হার্ডকাভারের বই ছাপা হয় দামি কাগজে, অন্তত পশ্চিমা দেশগুলোয় অ্যাসিড-বিহীন কাগজে, যেন সময়ের ভারে কাগজ নষ্ট না হয়ে যায়; সঙ্গে বোর্ডপেপারের মলাট আর ভালো বাঁধাই; বইটি যেন অনেকদিন টেকে। জ্ঞানেন্দ্রমোহনের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ হার্ডকাভারেই ছাপানো উচিত। কারণ, অত দাম দিয়ে কেনার পর অনেকদিন না টিকলে ক্ষতি। আবার পেপারব্যাকে ছাপা হলে, দামের কারণে যারা খণ্ড দু'টি কিনতে পারছে না তারাও হয়তো কিনতে পারত। সঙ্গে তো হার্ডকাভার থাকছেই, যারা খরচ করতে পারে তাদের জন্য। আবার ১৯৭০ সালে ঢাকার সোসাইটি ফর পাকিস্তান স্টাডিজের ছাপানো উইলিয়াম গোল্ডস্যাকের A Mussalmani Bengali-English Dictionary আমার বইয়ের তাকে শোভা পাচ্ছে; পেপারব্যাক, যদিও জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানের মতো ঢাউস বই নয়; এখন আর পাওয়া যায় না। কিন্তু পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও, বইটি বহাল তবিয়তে আছে।

বাংলা বইয়ের বাজারে পেপারব্যাক সংজ্ঞার দিক পশ্চিমা পেপারব্যাক থেকে আলাদা এবং তার রকমফের হয় না। মলাট মোটা কাগজের আর ভেতরে পাতা নিউজপ্রিন্টের বা কমদামের হলেই তা বাঙালির পেপারব্যাক বা সুলভ সংস্করণ। তার সঙ্গে পাতার আকার বা মানের তেমন কোনও যোগ নেই। পশ্চিমা দেশে যেমন পেপারব্যাক সাধারণত আঠার বাঁধাইয়ের, বাংলায় সেলাই-করা পেপারব্যাকই বেশি। বঙ্গদেশে কি ভাল আঠা পাওয়া যায় না? আবার, বাংলায় আজকাল বিলেতি কায়দায় পেপারব্যাক বাঁধাইয়ের বইয়ে দামি হোয়াইটপ্রিন্ট দেখা যায়, কেবল মলাটটিই সফটকভার। একজন প্রকাশকের বক্তব্য যে, যারা পড়তে চান, মানে আদতেই পড়তে চান এবং সেটা কম খরচে, তাদের কাছে পেপারব্যাকই সই। কম পয়সায় বেশি বই কেনা যায়, বইয়ের তাকে বেশি বই রাখা যায়, সহজে ঝোলায় নিয়ে ঘোরা যায়। বঙ্গদেশে হার্ডকভারের একটা সমস্যাও আছে। প্রকাশকরা প্রায়ই বাজে মানের বোর্ড দিয়ে মলাট বানায়; একটু ঠাসাঠাসি করে বইয়ের তাকে রাখলেই, যত্নে ঘাটতি পড়লে সহজেই পোকায় কেটে ফেলে। যদিও বলা হয় যে, পেপারব্যাক হার্ডকভারের মতো বেশি দিন টেকে না কিন্তু একটু যত্ন করলেই পেপারব্যাকের জন্য চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর বা তারও বেশি টেকাটা তেমন ব্যাপার না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Paperback: ভারতবর্ষের মতো দেশ যেখানে বই কেনা প্রায় বিলাসিতা, সেখানে পেপারব্যাকের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েকটি ভারতীয় প্রকাশ-ভবন ইংরেজি বইয়ের অনেক উল্লেখযোগ্য পেপারব্যাক সংস্করণ প্রকাশিত করেছেন-- এই প্রসঙ্গে জয়কো, ভারতীয় বিদ্যাভবন, রূপা ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য।
আমার কাছেই বাংলাদেশের স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ অর্থাৎ মুক্তধারার ছাপানো আতোয়ার রহমানের ‘গল্প যখন ভাষা নিয়ে’ আছে। বইটি প্রথমে ১৯৭৬ সালে হার্ডকভারে বের হয়; হোয়াইটপ্রিন্টে ছাপা; দাম আট টাকা। বইটি দ্বিতীয়বার ছাপা হয় ১৯৮০ সালে, তখন বোর্ড-বাঁধাইয়ের দাম ১৮ টাকা; আর মোটা কাগজের মলাটে বাঁধাই আর নিউজপ্রিন্টে ছাপা সুলভ সংস্করণের দাম ১১ টাকা। আমি কিনেছিলাম ১৯৮২ সালের দিকে। তেমন যত্ন না করাতে, সেলাই করা পাতাগুলো ঢিলে হয়ে গেছে, পুটের নীচের দিকটা খানিকটা ছিঁড়ে গেছে; কিন্তু বইটি আরও ত্রিশ বছর টিকে যেতেই পারে। সে সময়ে গায়ের দামের সাত টাকার ফারাকটা না থাকলে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতো বইটি কেনার জন্য। মুক্তধারা একই বইয়ের দুই সংস্করণ ছাপত। পৃষ্ঠার নম্বর এদিক-ওদিক হবার জো নেই। একই চেজ থেকে ছাপা। যে টাকায় দুটো বোর্ড-বাঁধাই বই কেনা যেত, সে টাকায় তিনটে সুলভ সংস্করণ। এভাবেই আটের দশকে ছাড়িয়ে নয়ের দশক অবধি আমাদের বই পড়তে পড়তে বেড়ে ওঠা। বেশিরভাগটাই পেপারব্যাক।
ছয়ের দশকে ঝিনুক পুস্তিকা ছিল, ঢাকায়— বই ছাপত নিউজপ্রিন্টে, মলাট একটু মোটা কাগজের। বাংলাদেশের যুদ্ধ-পরবর্তী গরিবির দিনেও মধ্যবিত্ত বাড়িতে দেখা মিলত বালাম-বালাম রবীন্দ্র, শরৎ এবং নজরুল রচনাবলী। সাতের দশক নাগাদ পাওয়া যেত গীতবিতান, সঞ্চিতা, হলদেটে মলাটে, খুব কম দামে। সাতের দশকের মাঝামাঝি ছাপানো মহম্মদ আকরাম খাঁর ‘মোস্তফা চরিতের’ দেখা পাওয়া যেত অনেকের বাড়িতে। বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম' দু'খণ্ডে পাওয়া যেত। শোনা যায়, ঝিনুক পুস্তিকার নাকি অনুমোদন ছিল পশ্চিমবঙ্গের অনেক বই ছাপার ব্যাপারে। পূর্ব পাকিস্তানে দিনগুলোয়, এমনকী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও, ঢাকায় দেদার পশ্চিমবঙ্গের বাংলা বইয়ের চোরাই ছাপা হতো। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকে। যুদ্ধের পর, পাকিস্তান সরকার পাকিস্তানে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বইয়ের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, নীহাররঞ্জন গুপ্ত বা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বইয়ের নকল ছাপা এবং এর বেশিরভাগটাই পেপারব্যাক, মলাটও ততটা মোটা কাগজের নয়। বাজারে বেশ কাটত।
ছয়ের দশক থেকে নয়ের দশক অবধি সেবা প্রকাশনী তার রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনি আর বিদেশি ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদে মোটা কাগজের মলাট আর নিউজপ্রিন্টের পেপারব্যাকেই মজিয়ে রেখেছিল কিশোর-তরুণদের। দশক সাড়ে তিনেক আগে এক একটি বইয়ের দাম পড়ত পাঁচ থেকে সাত টাকা। এখন দাম বেড়ে শ'দেড়েক বা তারও বেশি। অবশ্য সেবা প্রকাশনীও তার চিরচরিত পেপারব্যাকের আদল বদলেছে। ঝিনুক পুস্তিকা, মুক্তধারা বা সেবা প্রকাশনী কেউই কম ব্যাবসা করেনি পেপারব্যাক ছাপিয়ে। বরং দেখিয়েছে, চাহিদা তৈরি করে, কম দামে বই বাজারে ছেড়েও লাভ করা যায় এবং পাঠকদের লাভের দিকটাও দেখা যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Paperback Books of France: পেপারব্যাক বইয়ের শিরদাঁড়া দুমড়ে মুচড়ে পড়া যায়, পাতাভাঁজ করা যায়। পছন্দের জায়গায় পেন পেন্সিল বুলিয়ে দাগও কেটে রাখা যায় চাইলে।
বেকার বা সদ্য চাকরি শুরু করা তরুণ, ছাত্র, মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের পেপারব্যাক তখন পাওয়া যেত রেল স্টেশনের দোকানে, পশ্চিমা বাজারে যেমন মাস-মার্কেট পেপারব্যাক স্টেশনে বা বিমানবন্দরে পাওয়া যায়। প্রায় প্রতি স্টেশনেই এ রকম দু' একটা দোকান থাকত। যখন ছোট ছিলাম, সেবা প্রকাশনীর বই স্টেশনের দোকানে কিনতে যেতাম প্রায় প্রতি মাসে। এই ধরনের প্রকাশনা সংস্থার নিজস্ব বিপণন ব্যবস্থা ছিল। মুক্তধারার বিপণন ব্যবস্থা অবশ্য নয়ের দশকের শেষে এসে ভেঙে পড়েছিল; তবে তার কারণ ব্যবস্থাপনার খামতি। মুক্তধারা বাংলাদেশের একমাত্র সফল বই ব্যাবসার প্রতিষ্ঠান যে নিজের সাফল্যের ভার বইতে না পেরে নিজেই বসে পড়েছে।

কিন্তু যেদিন থেকে লেখক এবং প্রকাশকরা কাজে নয় বরং অর্থে এক লাফে অনেকটা বড় হতে চেয়েছে, সেদিন থেকে পেপারব্যাক-প্রেমীদের দুর্দিন শুরু হয়েছে। লেখকরা সস্তার লেখক হতে চাইছেন না, ২০২৩-এর একুশে বইমেলার সময়ে এক লেখককে এরকমই বলতে শোনা গেছে। এক প্রকাশক বলছিলেন যে, সাধারণ লোকে যেহেতু বই প্রধানত সাজিয়ে রাখার জন্য কেনে, পড়বার জন্য নয়, তাই তারা বোর্ড-বাঁধাই বই-ই কেনে। প্রকাশকরাও চাকচিক্যে মজে গিয়ে দেখতে-ভালো হার্ডকভার বের করতে শুরু করেছে, তা সে বইয়ের বিষয়বস্তু যাই হোক। বইয়ের প্রকাশ বইমেলা কেন্দ্রিক হয়ে ওঠার কারণেই সম্ভবত প্রকাশকরা কম শ্রমে বেশি বা সর্বোচ্চ লাভের আশায় হার্ডকভারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অনেক প্রকাশনা সংস্থার সারা বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া নিজস্ব বিপণন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। কারণ, বইয়ের ব্যাবসা তখন দু' এক মাসের এবং তাতেই হয়তো বছরের খরচ উঠে আসে। তাতে হ্যাপাও কম। পেপারব্যাকের তুলনায় হার্ডকভারের দাম অনেক বেশি; তাই লাভও বেশি। দু' একজনকে এও বলতে শোনা গেছে যে, এখন বেশিরভাগ উপন্যাসই পরিধিতে নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। একটি ৮০-৯০ পৃষ্ঠার উপন্যাস বোর্ড-বাঁধাই না করলে দেখে পত্রিকা বলে মনে হবে; এটাও অপ্রয়োজনে হার্ডকভারে বই ছাপার কারণ।
পরবর্তীকালে প্রকাশকদের বেশিরভাগই আর পেপারব্যাকের কথা চিন্তা করেননি, না ঢাকায়, না কলকাতায়; কেবল বইয়ের দাম বাড়িয়ে গেছেন। অথচ পেপারব্যাকের নকল কম হয়। হুমায়ূন আহমেদ বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বইয়ের নকল ছাপার কথা শোনা গেলেও, মুক্তধারা বা সেবা প্রকাশনীর বই নকল হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। মাঝে কলকাতায় দু' একটি সংস্থা একই বইয়ের বোর্ড-বাঁধাই এবং সুলভ সংস্করণ বের করেছিল। কিন্তু দেখা গেল, লোকে বোর্ড-বাঁধাই বইটি বেশি কিনছে; এর একটা কারণ বোধ করি দুটোর দামের ফারাকটা খুবই কম ছিল। অর্থাৎ, প্রকাশকরাও চাইছিলেন বোর্ড-বাঁধাই বইটিই বিক্রি হোক। এরপরও ঢাকায় এখনও দু' একটি প্রকাশনা সংস্থা আছে যারা কেবল পেপারব্যাক বই-ই বের করতে চায়।
প্রকাশকদের পেপারব্যাক বের না করার এবং পাঠকদের পেপারব্যাক না কেনার আরেকটা কারণ ইদানীং বৈদ্যুতিন বাজারে দেখা গেছে। কম দামি কাগজে পেপারব্যাক বের করে দাম একশো-র নীচে রাখলে, তার পরিবহণের খরচও প্রায় কাছাকাছি পড়ে। পণ্য পরিবহণের খরচ বইয়ের দামের কাছাকাছি হলেই, পাঠকরা মনে করে যে সে ঠকে যাচ্ছে। প্রকাশক এবং ক্রেতার পেপারব্যাক-সংক্রান্ত অনীহার পেছনে এটিও একটি ছোট কারণ বলে মনে করেন কয়েকজন প্রকাশক।
ঢাকার বেশ কিছু প্রকাশক এবং তাদের চেয়ে কমসংখ্যক পাঠক এখনও মনে করছেন ছাপার উপকরণের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে পেপারব্যাকই খানিকটা স্বস্তি দিতে পারে পাঠককে। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন পাঠক বাদ দিলে, বাকিরা কি এগিয়ে আসবে? লেখক এবং প্রকাশকরা এগিয়ে না এলে কিছুই হবে না। বই বিক্রির হালচাল দেখে মনে হয় না যে পেপারব্যাকের দিন আবার ফিরবে। পেপারব্যাক-প্রেমীরাও কি প্রায় মৃত?
















