World Inequality Report 2026: ১ শতাংশের হাতেই বিশ্বের অর্ধেক মানুষের চেয়ে বেশি সম্পদ?

World Inequality Report 2026: শুধু সম্পদ নয়, আয়ের ক্ষেত্রেও একই রকম বৈষম্য চোখে পড়ে। বিশ্বের ধনী ১০ শতাংশ মানুষের মোট আয় এত বেশি যে তা প্রায় বাকি ৯০ শতাংশ মানুষের মোট আয়ের সমান।

inscript
৪ মিনিট
World Inequality Report 2026: ১ শতাংশের হাতেই বিশ্বের অর্ধেক মানুষের চেয়ে বেশি সম্পদ?

একদিকে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান, মহাকাশ জয় এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার, অন্যদিকে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬ এই দুই বিপরীত চিত্রের মধ্যেকার দূরত্বটাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। রিপোর্টে এও তুলে ধরা হয়েছে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। এই প্রতিবেদন বলছে, আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য।

আজকের পৃথিবীতে সম্পদ ও আয়ের বণ্টন এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে বৈষম্য আর আড়াল করার মতো বিষয় নয়। এটি সংখ্যায় ধরা পড়ে, গ্রাফে উঠে আসে এবং প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের জীবনে তার ছাপ ফেলে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সম্পদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ। বিপরীতে, পৃথিবীর নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যারা সংখ্যায় প্রায় ৪১০ কোটি, তাদের হাতে রয়েছে সামগ্রিক সম্পদের নামমাত্র অংশ।

এই চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ০.০০১ শতাংশ মানুষ, সংখ্যায় মাত্র কয়েক হাজার, যে পরিমাণ সম্পদের মালিক, তা পৃথিবীর ৫০ শতাংশ মানুষের মোট সম্পদের থেকেও অনেক বেশি। অর্থাৎ আজকের অর্থনীতিতে সম্পদ ধীরে ধীরে উপরের দিকেই জমছে, আর নিচের স্তরের মানুষ পিছিয়েই পড়ছে।

আয় ও সম্পদের ফারাক

শুধু সম্পদ নয়, আয়ের ক্ষেত্রেও একই রকম বৈষম্য চোখে পড়ে। বিশ্বের ধনী ১০ শতাংশ মানুষের মোট আয় এত বেশি যে তা প্রায় বাকি ৯০ শতাংশ মানুষের মোট আয়ের সমান। এর অর্থ হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছচ্ছে না। এই প্রবণতা গত কয়েক দশকে আরও জোরালো হয়েছে। আশির দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে উদারীকরণ, কর্পোরেট সুবিধা বৃদ্ধি এবং ধনীদের জন্য কর ছাড়ের নীতি বৈষম্যকে আরও সমস্যায় ফেলছে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে মানুষের কল্যাণের দায়িত্ব কমিয়ে বাজারের উপর ভরসা করেছে, আর এর সুফল পেয়েছে মূলত ধনী ও পুঁজির মালিকেরা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইলন মাস্ক কিংবা আম্বানি নন, বিশ্বের সর্বকালের 'ধনীতম' ব্যক্তি ইনিই! তাঁর 'সম্পত্তি' কত, জানেন?

Richest Man of All Time : এই গল্প শুনলে অবাক হয়ে যাবেন। ভিরমিও খেতে পারেন। রাতারাতি সাধারণ একজন মানুষ এত টাকার মালিক হতে পারেন!

ভারত: প্রবৃদ্ধির আড়ালে অসমতা

রিপোর্টে উঠে এসেছে, দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও ভারতে সেই উন্নয়নের লাভ সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছয়নি। বরং গত কয়েক দশকে আয় ও সম্পদের ফারাক আরও বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ মাত্র দশভাগের এক ভাগ জনগোষ্ঠী দেশের অর্ধেকেরও বেশি আয় নিজের দখলে রেখেছে। বিপরীতে, নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের ভাগে আসে মোট আয়ের মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ। এই ফারাক স্পষ্ট করে দেয় যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অধিকাংশ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি।

সম্পদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৪০ শতাংশ। শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে জমা হয়েছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদ। অন্যদিকে, দেশের অর্ধেক মানুষের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ এতই কম যে তা সামাজিক নিরাপত্তা বা ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য যথেষ্ট নয়।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির উপর। একদিকে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য-শিক্ষার খরচ সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে। আর গরিব মানুষের পক্ষে আর্থিকভাবে এগিয়ে যাওয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য

প্রতিবেদনটি বৈষম্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে, লিঙ্গভিত্তিক অসমতা। বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি কাজ করেন, কিন্তু সেই কাজের বেশির ভাগেরই কোনো পারিশ্রমিক মেলে না। ঘরের কাজ, সন্তান প্রতিপালন ও পরিচর্যার মতো শ্রম সমাজকে সচল রাখে ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির হিসাবের খাতায় এই পরিশ্রমের প্রায় কোনো মূল্যই ধরা পড়ে না।

রিপোর্টিতে উঠে আসে, নারীরা গড়ে সপ্তাহে পুরুষদের তুলনায় বেশি সময় কাজ করেন। কিন্তু মজুরি ও আয়ের ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এমনকি বিনা মজুরির শ্রমের আর্থিক মূল্য যোগ করলেও নারীদের মোট আয় পুরুষদের সমান হয় না। এতেই প্রমাণ হয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু শ্রেণিগতই নয়, লিঙ্গভিত্তিকও।

পরিবেশ ও জলবায়ু

অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশগত বৈষম্যও। প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী মানুষরাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। বিশ্বের নিচের ৫০ শতাংশ মানুষ মোট কার্বন নিঃসরণের খুব সামান্য অংশের জন্য দায়ী, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের উপরই সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

অন্যদিকে, ধনী ১০ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের সিংহভাগের জন্য দায়ী। বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং শিল্পভিত্তিক উৎপাদন পরিবেশকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবু জলবায়ু সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

অসমতা কি অনিবার্য? ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬ এ উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল। কর ব্যবস্থা যদি প্রগতিশীল হয়, সামাজিক সুরক্ষা যদি শক্তিশালী হয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্র যদি বিনিয়োগ বাড়ায়, তবে বৈষম্য কমানো সম্ভব। প্রতিবেদনটি ধনী ও অতিধনীদের উপর কার্যকর কর আরোপ, উত্তরাধিকার কর চালু, সামাজিক পরিষেবায় রাষ্ট্রের ভূমিকা জোরদার করা এবং নারীর শ্রমের স্বীকৃতির মতো নীতিগত পরিবর্তনের কথা বলেছে। এগুলো কল্পনা নয়, বরং বিভিন্ন দেশে যাচাই করা তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা রিপোর্ট।

শেষে বলতেই হয়, বৈষম্য ক্রমে এমন এক স্তরে পৌঁছচ্ছে, যেখানে তা গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতি এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। এই অসমতা মানুষেরই তৈরি, নীতিরই ফল। সুতরাং মানুষ চাইলে, নীতির বদল ঘটিয়ে, এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পথ বেছে নিতে প্রস্তুত?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।