ফুর্তির জন্য শান্তিনিকেতনই কেন বাঙালির 'হট ফেভারিট'?

Shantiniketan: প্রকৃতপক্ষে বোলপুর মহকুমায় যতটা জমি আছে তার বিশ গুণ আছে জমির কারবারি মায় দালাল। রাস্তাঘাটে কারও সঙ্গে দেখা হলেই বলে, "সস্তার জমি আছে। কেউ নিলে বলবেন।"

Ladly Mukhopadhaya
৪ মিনিট
ফুর্তির জন্য শান্তিনিকেতনই কেন বাঙালির 'হট ফেভারিট'?

সামগ্রিকভাবেই বোলপুর শহর বিস্রস্ত এবং বেলাগাম এক অবস্থার মধ্যে আছে বলেই মনে হয়। অথচ এর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বোলপুর বীরভূম জেলার একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র অর্থাৎ মহকুমা। এই মফসসল শহরে চোদ্দ বছর আগের আদমসুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ছিল আশি হাজারের সামান্য বেশি। এই শহরের ক্ষেত্রে বোলপুর পৌরসভার সঙ্গে আরও চারটি ব্লক সংযুক্ত যার অনেকটাই মফসসল থেকে গ্রামাঞ্চল অবধি বিস্তৃত। ফলে এই অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষকে বোলপুর শহরে নানা কাজে যাতায়াত করতে হয়। শান্তিনিকেতন পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠার ফলে আশেপাশের জেলা ও বিশেষ করে কলকাতার বহু মানুষ আসেন এখানে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে সব মিলিয়ে সম্ভবত প্রায় এক কোটির উপর মানুষের চাপ নিতে হয় এই মহকুমা শহরটিকে। সেই কারণেই পরিষেবার দিকটি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই মাঝারি শহরটিতে নানা সময়ে অত্যধিক যানজটের অবস্থা তৈরি হয়। কখনও কখনও পুলিশ বড় বড় মালবাহী গাড়ি থামিয়ে রাখে (তোলা তোলে?) বলে যানবাহন ভয়ঙ্কর মন্থর হয়ে পড়ে এবং যার ফলশ্রুতি হিসাবেও যানজটের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এবার শুরু করি বোলপুরের স্টেশনের রাস্তা যেটি মূল শহরের দিকে বা শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের দিকে যাচ্ছে তার অবস্থা দিয়ে। বিগত চার দশক ধরেই এই অত্যন্ত সরু রাস্তাটি ক্রমে আরও সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তার প্রধান কারণ, দোকানদারদের জবরদখল করে রাস্তার ওপর ডালি বা মালপত্র রাখা। আর দ্বিতীয়ত বাজার সংলগ্ন সারি সারি দোকান থাকার ফলে এখানে কেনাকাটার জন্য প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। এই রাস্তার দু'ধারে অসংখ্য সাইকেল, স্কুটার, বাইক, টোটো এমনকী গাড়িও দাঁড় করিয়ে রাখা হয় কোনওরকম আইন কানুন না মেনে। এর ফলে নিয়মিত ট্রেন আসার সময় সে এক নরকগুলজার! এক কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। পৌরসভা বা স্থানীয় প্রশাসন বছরের পর বছর নিত্যযাত্রীদের এই দুর্ভোগ দেখে যাচ্ছে। এর কোনও প্রতিকার নেই, কোনও কার্যকরী পদক্ষেপও নেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পলাশের ডাল ভাঙা, মদের মোচ্ছব | শান্তিনিকেতনে দোলখেলার শ্মশানযাত্রা

Shantiniketan Dol Utsab: বসন্ত পঞ্চমীর প্রভাতে শান্তিনিকেতন আশ্রমে প্রথম এই ঋতু উৎসব বা বসন্ত উৎসবের সূচনা করেন রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এ তো গেল শহরে ঢোকার গল্প! তারপর রাস্তার দু'ধারের দখলিকৃত জায়গাতেই রয়েছে সারি সারি দোকান। সেখানেও একইভাবে এলোমেলো বেআইনি পার্কিং। অন্যসব জেলার মতোই এখানেও এই সমস্ত দায়িত্বটাই সিভিক ভলান্টিয়ারদের হাতে। কিন্তু তারা তো এ গাড়ি সে গাড়ি থেকে টাকা তুলতেই ব্যস্ত! ফলে রাস্তার বেসামাল অবস্থা। মাঝে মাঝে স্থানীয়দের পথ অবরোধ করতে দেখা যায়। পুলিশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে সরিয়ে দেয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এ নিয়ে, আবার বলব, প্রশাসনের কোনও হেলদোল নেই। অবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি তৈরি হয় নানা উৎসব-পার্বণ ও মেলাখেলার সময়। রাস্তায় গাড়ি তো দূর অস্ত, হেঁটেও পার হওয়া যায় না। এক্ষেত্রে সোনাঝুরির হাটের সামনের রাস্তাটা উল্লেখযোগ্য। দুপুর থেকে সন্ধ্যা সাতটা-আটটা অবধি মারাত্মক যানজটের কোনও প্রতিকার নেই।

অনেকেই বলে, পুরনো সব ভালো আর নতুন সব খারাপ বলাটাও এক ধরনের ব্যাধি। কিছু মানুষ অযথা সমালোচনা করে থাকে। এর কিছুটা সত্য মেনে নিলেও সম্পূর্ণ মানা সম্ভব নয়। নতুন যা কিছু তা যে অনেকাংশেই বেশ অসুবিধার সৃষ্টি করছে তা অগ্রাহ্য করি কী করে? এই যে চোখের সামনে আদিবাসীদের গ্রামগুলো দৃশ্যতই পাল্টে গেল তার পেছনের কারণগুলো তাহলে কী? একটা সময় এই সমস্ত সাঁওতাল গ্রাম দেখতেও পর্যটকেরা আসত। গ্রামের ছবি তোলার আদর্শ অঞ্চল হিসেবে পরিগণিত হতো একসময়। আজ কোন ছবি ভেসে ওঠে? কংক্রিটের জঙ্গল দেখতে ভালো লাগে কিনা জানি না। তার জন্য এত পথ পেরিয়ে আসার কী দরকার? ঘরে বসে অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, রামিঙ্কর, বিনোদবিহারীদের ছবি তাহলে ইতিহাস হয়েই থাক, যার আর কোনও ধারাবাহিকতা থাকবে না। নতুন প্রজন্ম কংক্রিটের গ্রামই আঁকুক।

আসলে গাছে গাছে শোভিত জঙ্গলের ধারে কিংবা ভেতরে বনবাসীদের যে গ্রামগুলো ছিল, ছিল মাটির বাড়ি আর তার গায়ে আদিবাসীদের আঁকা দেওয়ালচিত্র, তা আর চোখে পড়ে না। সেইসব গ্রামের সত্তর শতাংশই এখন কোঠা বাড়ি। মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতনে একতলার উর্ধ্বে কোনও বাড়ি চাননি। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন রবীন্দ্রভবন দোতলা করলেন তখন রবীন্দ্রনাথ ছেলের ওপর রাগ করে কিছুদিন শান্তিনিকেতন ছেড়ে সুরুলের জমিদার বাড়িতে থাকা শুরু করেছিলেন। সে তো আজ বিস্মৃত কাহিনি। বর্তমানে শান্তিনিকেতনে তো একটার পর একটা দোতলা, তেতলা বাড়ি নির্মিত হচ্ছে। তা কার নির্দেশে? কাদেরই বা মস্তিষ্কপ্রসূত এই কাণ্ডকারখানা! একবারও কেউ ভেবে দেখল না রবীন্দ্রনাথ কী চেয়েছিলেন বা কেন চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রভাবধারার এমত বিসর্জন কি সত্যিই কাঙ্খিত ছিল?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পর্যটনের বহর প্রবল! তবু ভালো হাসপাতাল, রাস্তা নেই সাধের শান্তিনিকেতনে

Shantiniketan: আড়কাঠি বালিমাফিয়া ক্রমাগত বালি তুলে পাচার করছে। এখানেও ব্যবহৃত হচ্ছে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্ম।

প্রকৃতপক্ষে বোলপুর মহকুমায় যতটা জমি আছে তার বিশ গুণ আছে জমির কারবারি মায় দালাল। রাস্তাঘাটে কারও সঙ্গে দেখা হলেই বলে, "সস্তার জমি আছে। কেউ নিলে বলবেন।" এই দালালরাই আবার একটাই জমি পাঁচজনকে বেচে দিচ্ছে। তা নিয়ে বিস্তর অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মদ, মাংস এবং ... হোটেল-রিসর্টময় শান্তিনিকেতন এখন যেখানে দাঁড়িয়ে

Shantiniketan Hotels & Resorts: আমোদগেঁড়ে শহুরে বাঙালি এই অঞ্চলে পৌঁছেই মদের দোকানে ছোটে। ক্যানাল পাড়ে, সামান্য বেঁচে থাকা জঙ্গলে, খোয়াইয়ের আনাচেকানাচে, কোপাইয়ের ধারে চলে মোচ্ছব।

অন্যদিকে কলকাতা শহরের লোকজনদের সঙ্গে কথা হলেই বলে, "সন্ধানে কোনও জমি আছে?" কেউ কিন্তু এখানে থাকতে চায় না। চায় একটা বিনোদন গৃহ তৈরি করতে। কেন যে শান্তিনিকেতনে এসেই আমোদ প্রমোদে গা ভাসাতে হবে ঠিক বুঝতে পারি না। একটা শ্রেণির অনেক টাকা। তারা ফুর্তির জন্য খরচ করতে চায়। কিন্তু ওই যে লিখলাম, কেন শান্তিনিকেতন বা বোলপুরেরই সর্বনাশ করতে হবে তার কোনও যথাযথ কারণ আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। ইতিমধ্যেই কিন্তু কয়েক হাজার বাড়ি বাবুরা তালাবন্ধ করে ফেলে রেখেছে। বছরে কচ্চিৎকদাচিৎ আসেন আমোদ প্রমোদের নিমিত্তে।

বল্লভপুরের অন্তর্গত যে খেলেডাঙ্গা গ্রাম, তার পাশ দিয়ে জমি চলে গেছে নদী বরাবর। সেখানে নির্বিশেষে নামে-বেনামে চাষের জমি, খাস জমি আর আদিবাসীদের জমি লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। এখানকার প্রভাবশালী জমি মাফিয়ারা নদীর চর কব্জা করে ফ্ল্যাট বাড়ি, রিসর্ট আর কটেজ তৈরি করছে। এতে নদীর নাব্যতা খর্ব হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত এক বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কিছু বলার নেই, কিছু করার নেই। সামগ্রিকভাবে যে সুন্দর লালমাটির রাস্তা ছিল বোলপুর তথা শান্তিনিকেতনের বৈশিষ্ট্য, আজ আর তার কোনও অস্তিত্বই নেই। আচ্ছা, এই যে লালমাটির রাস্তা তা কি 'হেরিটেজ' নয়?

তা নিয়ে কি প্রশাসনের কোনও মাথাব্যথা আছে? না কি শুধুই কামিয়ে নেওয়ার পন্থা হিসেবে সিমেন্ট আর পিচের রাস্তা তৈরি হলো?

এর কোনও উত্তর নেই। ফলে এভাবেই চলবে গাছ কাটা, জমি মাফিয়াদের বাড়বাড়ন্ত চলবে, আদিবাসীদের জীবনযাত্রা পাল্টে যাবে, শহর বাসযোগ্য থাকবে না। তাহলে এভাবেই চলতে থাকবে? এর উত্তরও জানা নেই। হয়তো তাহারা বা উহারা বলতে পারবে। আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকব আমরা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।