মানসের টেলিফোন নম্বর : অলোকপর্ণা

Bangla Short Story: রাজুর খেয়াল নেই, রাজুকে কেউ শিখিয়েও দেয়নি, এমনকী মা বাদে কেউ কখনও বলেনি, “ঠান্ডা লাগিও না”, তবু যে পাখি কীভাবে শেখে কুজন!

৩৬ ইন বার কাম রেস্টুরেন্টের পেচ্ছাপখানার আয়নাটা যাকেই পাকড়াচ্ছে তারই মুখ ভেঙেচুরে একশা করছে। চেহারার তাল সামলাতে পারছে না। একটু আগে ঠিক ওখানেই মানসের ভাঙাচোরা মুখ এসে কুলকুচি সেরে বিদায় নিয়েছিল। আর রাজু এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে আর সঙ্গে সঙ্গে রাজুর ভাঙাচোরা মুখ রাজুকে জিভ দেখাতে গিয়ে আরও ভেঙেচুরে যাচ্ছে। রাজু খিলখিল করে হাসে। রাজু মনে মনে ডিগবাজি খায়। এখন তার বুকের পকেটে সাতটা সংখ্যা ধকধক করছে।

হিসিদানিতে পা রেখেও উৎকণ্ঠায় হিসি হয় না, রাজু ফিরে আসে বেঞ্চে। সব কাজ, এমনকী শ্বাস প্রশ্বাস স্থগিত রেখেও সে একটিবার ছুটে যেতে চায় বিজুর পিসিও বুথে। সাতটা সংখ্যা বুকের মধ্যে ধানাইপানাই করে। কী বলবে সে টেলিফোনে? এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের তরল পেটে চালান করে দিলে পেটে পেটে কত কথা গজায়! কথার গাছ রাজু ভাবতে থাকে,

ওপাশ থেকে ফোন তুলে মানস বলবে, কে বলছেন?

রাজু ভণিতা করবে, বলো তো কে?

নাম না বললে ফোন এক্ষুনি কেটে দেব কিন্তু!- মানস শাসাবে।

আমি তোমার রাজু…

রাজু মনে মনে হুপ হুপ করে লাফ দেয়, মানসের টেলিফোন নম্বর বুকপকেটে ডগমগ।

ঘোড়ার গুয়ের গন্ধ রোদে রোদে কিশোর হচ্ছে গলিতে এখন, রাজু দ্রুত পাততাড়ি গোটায়। পেটে মদ ভনভন করতে আছে। এখানে সোঁদা গলিতে যে মেয়েই তাকে দেখবে সে-ই আবদার জানাবে ছবি আঁকানোর। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবে তাদের ডেরায়, তারপর তাদের ঘরের আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে এমনভাবে রাজুর দিকে তাকাবে যেন চোখে তাদের অনন্ত নালিশ। এঁকে ফেলতে পারলেই যেন রাজুর সাত খুন মাফ, সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ। অথচ রাজুর হাত আটকে যাবে আঁকার খাতায়। মাথা হবে নিচু। মুখ হবে চুন। রাজু বেরিয়ে আসবে মেয়েদের সেইসব ডেরা থেকে সাদাপাতা হয়ে। সকল উস্কানি উপেক্ষা করে রাজু পা চালায় হন হন। চলতে চলতে হঠাৎই আদর করে মানসের শীর্ণ কবজি মটকে দিতে ইচ্ছে হয় রাজুর। মানসের কোমর রাজুকে ভাবায়। মানসের কোমর রাজুকে উত্যক্ত করে। বুকের পকেট থেকে নম্বরগুলো হাত করে রাজুর পরাণপাখি যেন এই ওড়ে কি সেই ওড়ে। তলপেটে তার মদ জমে টইটম্বুর। কিন্তু এক মুহূর্ত বিলম্ব চলবে না। রাজু দ্রুত নিজেকে টপকাতে চায়।

ফোন তুলে হয়তো মানস বলে উঠবে, এতক্ষণ লাগল ফোন করতে?

বিজুর দোকান বন্ধ ছিল, স্টেশনে আসতে হল, আর দেরি হয়ে গেল… খুব কি দেরি হয়ে গেল?

মানসের হাসি রাজুর মুখে নকশা কেটে যায়।

আরও পড়ুন- কবিতা ও তার মাকড়সা: অলোকপর্ণা

বাঁদিকের রাস্তা ধরে তিন মিনিট গেলেই আবার ছেলেদের মুতখানা। কিন্তু বুকের পকেটে মানসের নম্বর খাবি খাচ্ছে। রাজু সন্তর্পণে পার হয়ে আসে হনুমান মন্দির। মন্দিরের গায়ে তারই হাতে আঁকা উড়ন্ত হনুমানের ছবি, কাঁধে গন্ধমাদন পর্বত। পর্বত ভরে আছে মহৌষধি, রাজু সেখানে কটা পাখিও এঁকেছিল, পানের পিকে যারা এতদিনে ঢাকা পড়ে গেছে। এলাকার আর পাঁচটা দেওয়ালের মতো এককোণায় যেখানে রাজু নিজের নাম লেখে সেখানটাও ঢেকে গেছে আগাছায়- রাজুর ইচ্ছে হয় ভোটের সময় সমস্ত দেওয়ালে দেওয়ালে মানসের ফোন নম্বর লিখে দিতে।

আর লিখতে,

“যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন”

রাজু যেকোনও প্রয়োজনে মানসকে যোগাযোগ করতে চায়। রাজুর যেকোনও প্রয়োজন মানস।

“শোনো না, পেঁয়াজ ফুরিয়ে গেছে, দোকান বন্ধ, তোমার আছে?”

“পঞ্জিকায় পাচ্ছি না, একাদশীটা কবে পড়েছে?”

“আছো?”

“মাসতুতো দাদার পিসতুতো বোনের নন্দাইয়ের ভাইয়ের ছেলের বাইক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, ও নেগেটিভ রক্ত প্রয়োজন, তোমার ব্লাডগ্রুপ কী?”

“নব ব্যারাকপুর থেকে দুপুর দুটোর পর শিয়ালদা যাওয়ার ট্রেন কটায়?”

“আছো?”

“আছো?”

“আছো?”

“নেই?”

পেটে মদ ঘেঁটে ঘ।

তবেই না আজ মানসের টেলিফোন নম্বর চেয়ে উঠতে পারল!

অন্যদিন হলে এতক্ষণে বাড়ি ফিরে মানসকে ভেবে নিজেকে নাড়াঘাঁটা করতে হতো রাজু ওস্তাদকে। আজ কুলকুচি করার আগে ৩৬ ইন বার কাম রেস্টুরেন্টের বাথরুমে মানস নিজেও রাজুকে নেড়েঘেঁটে দেখে গেছে। অতএব নিজেকে বিড়ির মতো সূক্ষ্মদেহী মনে হয় রাজুর। জাগতিক লেনদেনের বাইরে বসে সে যেন ধোঁয়া। এইমাত্র বেরিয়ে এল মানসের নাকমুখ থেকে, মানসের নাড়িভুঁড়ি বেয়ে, মানসের কলকব্জা হয়ে।

ওই দেখা যাচ্ছে বিজুর দোকান। এতক্ষণে মানস অবশ্যই নিজের আস্তানায় পৌঁছে গেছে। তবু তাকে চমকে দিতেই রাজু বলে উঠবে, “পৌঁছে গেছ?”

মানস বিস্ময় লুকোবে হেরে যাওয়ার ভয়ে, “কখন!”

“ঠান্ডা লাগিও না, যা বৃষ্টি হলো সন্ধ্যায়!”

এরপর মানসের আর আত্মসমর্পণ করা ব্যতীত উপায়ন্তর থাকবে না।

রাজুর খেয়াল নেই, রাজুকে কেউ শিখিয়েও দেয়নি, এমনকী মা বাদে কেউ কখনও বলেনি, “ঠান্ডা লাগিও না”, তবু যে পাখি কীভাবে শেখে কুজন! রাজুও সেভাবে রাজু হয়ে উঠেছে। তলপেট ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে গন্ধমাদন, রাজু বিজুর দোকানের দিকে ছোটে।

ছোট একখানি লাইন। সবার আগে চন্দন ডাক্তারের টেকো কম্পাউন্ডার। তারপর বাজারের ব্যাগ হাতে নাদুস বৌদি। তার পিছনে উসখুস করছে সুতনুর ভাই অতনু। তারপর বিশেষত্বহীন একজন মানুষ যার বয়সের গাছপাথর রাজু ঠাহর করতে পারছে না। এ মানুষ হারিয়ে গেলে শনাক্তকরণের চিহ্ন না থাকায় তাকে আর ফেরত পাওয়া যাবে না। লোকটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে অপেক্ষা করছে বুথ অবধি পৌঁছনোর । বুথের ভিতরে সাদা চুড়িদার পনেরো মিনিট ধরে বড্ড হাসছে। নির্ঘাৎ প্রেম করছে। আজকে রাজু তাকে ক্ষমা করে দেয়।

আজ বুকপকেট থেকে মানসের টেলিফোন নম্বর বুকের ভিতর উপদ্রুত হয়েছে। রাজু রোগগ্রস্তের মতো সাতটা সংখ্যা আওড়ায়। মূত্রথলি টসটস করে। পায়ে পা জড়িয়ে দণ্ডায়মান রাজু মজুমদার।

“স্যার কেমন আছেন?” রিনিরিনি গলা জানতে চায়। রাজু দেখে আঁকার ছাত্রী পল্লবী, মায়ের সঙ্গে নাচ শিখে ফিরছে। ত্রিভঙ্গমুরারি রাজু বলে, “ভালো, রবিবার দেরি করবি না কিন্তু!” পল্লবীরা সবকিছু শেখে, ওদের বাড়িতে ওর মায়ের না বাজানো হারমোনিয়াম আছে, আছে ওর বাপ দাদার শুকিয়ে হারিয়ে যাওয়া কালার প্যালেট।

পল্লবীরা চলে গেলে রাজু দেখে অতনু কীভাবে যেন বুথের ভিতর পৌঁছে গেছে। শান্ত লোকটা তখনই রাজুর দিকে ফেরে, “বিশেষ কাউকে ফোন করবেন?”
“আপনার তাতে কী?” আক্রমণাত্মক কেন যে হয়ে পড়ল সে, কিছুতে বোঝে না। প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরা গোল্ডফিশের মতো নম্বরগুলো যেন যত সময় যাবে, দমে যাবে। ভয়ে রাজুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। হিসি চেপে সে দেখে অতনু বেরোল বুথ থেকে। কী মনে করে যেন শান্ত লোকটা রাজুকে আগে যেতে দিল।

আরও পড়ুন- অদিতি যে ক’টি ভাষায় কথা বলে : অলোকপর্ণা

বুথের ভিতর একা রাজু।

কাচের দেওয়ালের ওপারে সবকিছুকে অ্যাকোয়ারিয়মের বাইরের জগৎ বলে ভুল হয়। রাজু মাছ ডায়াল করে এক দুই করে সাত সাতটা সংখ্যা। ফোন বেজে যায় বেলা অবেলায়। হয়তো দূরে আছে। ফের রাজু ডায়াল করে সাত ছয় পাঁচ চার তিন দুই এক। এবার দু'বার বেজে ওঠার পরেই ফোনটা কেউ ধরে ফেলে।

“হ্যালো, হ্যালো, মানস আছে?”

“কে মানস? কাকে চাইছেন?”

“আমি রাজু, মানসের বন্ধু, ও একটু আগেই আমায় ওর নম্বর দিয়ছে।”

“এখানে মানস বলে কেউ থাকে না।”

ফোন কেটে যায়।

রাজু শূন্যে ভেসে যায়। যেন মহাকাশচারী। কোথাও কেউ রাজুর একটা হাতও ধরে নেই। আর রাজু পৃথিবী থেকে দূরে, আরও দূরে সরে যাচ্ছে…

রাজুর ভিতর থেকে রাজু লিক হতে থাকে। চুপিসারে প্যান্ট, চটি, বুথের পাপোশ ভিজিয়ে রাজু খালাস হয়ে যায়। বুকের পকেট থেকে মানসের নম্বরগুলোর কোনও সাড়া পাওয়া যায় না আর। নিজেকে খালাস করার পর রাজু বোঝে ওদের দম ফুরিয়েছে।

More Articles