একই মানুষের বহু যৌনসম্পর্কে আগ্রহ, কেন এমন হয়!

ইউরোপ এবং এশিয়ার বিস্তীর্ণ জঙ্গলে প্রেইরি ভোলস বলে একধরণের খুদে স্তন্যপায়ীদের দেখা যায়, ইঁদুরেরই জাতভাই বলা চলে। এরা যখন নিজেদের সঙ্গী খুঁজে পায়, তাদের সঙ্গে সারা জীবন একসাথে কাটিয়ে দেয়, একসাথে বাসা বাঁধে, একে-অপরের সঙ্গে সময় কাটায়, সন্তানের জন্ম দেয়।

অন্য দিকে আরেক রকমের ভোলস, মনটেন ভোলস নাম তাদের - এই প্রেইরি ভোলসদেরই নিকট আত্মীয় বলা চলে, তারা আবার এই আজীবন ঘর বাঁধার ধার ধারে না। তারা ওই একটি সঙ্গীর সঙ্গে একবারই যৌন ভাবে মিলিত হয়, মানে নতুন প্রজন্মের ভাষায় যাকে বলে ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ড।

কিন্তু এই সারা জীবনের মত একসঙ্গে থাকার আগে একটি কষ্টকর ধাপ পেরোতে হয় প্রেইরি ভোলসদেরই - সেই ধাপটিতে  টানা চব্বিশ ঘন্টা ধরে এদের যৌন মিলনের পর্ব চলে। হ্যাঁ, চব্বিশ ঘন্টা! আর তার পরেই তারা চিরকাল এক সঙ্গে থাকা শুরু করে। কিন্তু কী এমন ঘটলো যৌনমিলনের সময় যা এই পুরুষ ও স্ত্রী প্রেইরি ভোলসদের সারাজীবন অবিচ্ছেদ্দ্য করে তোলে?

১৯৯৯ সালে ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথের তৎকালীন ডিরেক্টর ড: থমাস আর. ইন্সেল প্রথম পরীক্ষা করে দেখেন, যৌন মিলনের সময় এদের শরীরে ক্ষরিত হয় অক্সিটোসিন। এই হরমোন দুটি স্তন্যপায়ীকে একসাথে থাকতে, এবং সম্পর্ক ও বিশ্বাসের ভিত তৈরি করতে সাহায্য করে; এবং অবশ্যই প্রজনন ও সন্তান লালন-পালনে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি ক্ষরিত হয় ভেসোপ্রেসিন নামের আরেকটি হরমোন। এই দুই হরমোনের উপস্থিতি ও ক্ষরণই এদের একগামী করে তোলে।একগামীতার পেছনে কিন্তু এর পাশাপাশি কাজ করে ডোপামাইন নামের আরেকটি হরমোন, যাকে চলতি কথায় "হ্যাপি হরমোন" বলে।

মানুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না - মহিলাদের ক্ষেত্রে অক্সিটোসিন এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ভেসোপ্রেসিনই কারণ একগামিতার পেছনে।

একটা কথা মানতেই হবে, আমরা যা করি, যে ভাবে চলি - অর্থাৎ আমাদের সমস্ত আচার-আচরণে সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশিও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকে আমাদের জিনের।

ভোলসদের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয় না। প্রেইরি ভোলস আর মন্টেন ভোলসের জিন শতকরা নিরানব্বই শতাংশ মিল আছে, ওই এক শতাংশ জিনের অমিলেই দুই আত্মীয়ের আচার-আচরণ বা জীবন-ধারণে এত পার্থক্য দেখা যায়।

এই দুই নিকট আত্মীয়ের জিনের কাজ-কারবার খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে ধরা পড়লো অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিন প্রেইরি ভোলসদের শরীরে যৌন মিলনের সময় তৈরি হলেও, মন্টেন ভোলসের ক্ষেত্রে এই দুটি হরমোনের ক্ষরণ বাধা পায়। আর অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিনের অভাবে মন্টেন ভোলসের যৌন সঙ্গী নির্বাচনও ওই খুব সাময়িক ঘটনার মত হয়ে যায় - ওই সেই ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ডের মত।

মানুষের ক্ষেত্রে একগামিতা নির্ধারণ করার পেছনে যদি অক্সিটোসিন ও ভেসোপ্রেসিনের হাত থাকে, তাহলে বহুগামীতা - যা কিনা একগামীতার উল্টো - সেক্ষেত্রেও কি অক্সিটোসিন ও ভেসোপ্রেসিনের প্রভাব থাকছে?

তারও উত্তর দেবে আমাদের জিন। মানুষ বহুগামী হবে কিনা, তা ঠিক করে দেয় তার জিন, সেই জিনের প্রকাশ অর্থাৎ জিনের কাজের ধরন ও একাধিক হরমোন - এবং এই তিনটি মূল বিষয়ের পাশাপাশি অবশ্যই পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপরেও মানুষের বহুগামিতা নির্ভর করে।

আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা রয়েছে, পুরুষদের মধ্যে বহুগামীতার প্রবণতা ও অন্যদিকে নারীর একগামী হওয়ার প্রবণতা বেশী। নারীর একগামিতা মানে এই নয় যে সে আজীবন একটি পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়, বরং একগামীতার ব্যাখ্যায় নারী একই সঙ্গে একাধিক পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় না।

মহিলাদের মধ্যে একগামিতার প্রবণতা বেশি হলেও, তাদের মধ্যে বহুগামিতার ঘটনা বিরল নয়, এমনকি অস্বাভাবিকও নয়। ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডের সাইকোলজিস্ট ব্রেন্ডেন জি়য়েশট গবেষণা করে দেখেন, মহিলাদের মধ্যে একটি বিশেষ জিনের (ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর জিন) রকমফের হলেই এরকম ঘটনা ঘটছে । এই জিনের মূল কাজ আমাদের নার্ভে ভেসোপ্রেসিনের প্রবেশের যে দরজা বা রিসেপ্টর, সেই দরজার কাজকে নিয়ন্ত্রণ করা। মহিলাদের শরীরে নির্দিষ্ট এই জিনটির অন্তত পাঁচটি রকমফের (বা ভ্যারিয়েন্ট), তাদের বহুগামীতার পেছনে দায়ী। সুইডেনের ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটের গবেষক হেস ওয়ালামের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর জিনের রকমভেদের পাশাপাশি, অক্সিটোসিন রিসেপ্টর জিনও দায়ী মহিলাদের বহুগামীতার পেছনে।

 ভেসোপ্রেসিন আর অক্সিটোসিন নার্ভকোশের দরজা বা রিসেপ্টর দিয়ে নার্ভকোশের ভেতর ঢুকতে না পারলে, এই রাসায়নিক দুটি কাজও করতে পারবে না। আর এরা কাজ না করতে পারলেই বহুগামিতার প্রবণতা তৈরি হবে। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিলো মন্টেন ভোলসের ক্ষেত্রে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে কিন্তু ভেসোপ্রেসিন জিন এবং বহুগামীতার মধ্যে কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাননি ড: জি়য়েটশ। অথচ হেস ওয়ালামের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে দেখা গেছে যে সমস্ত পুরুষদের শরীরে  ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর জিনের রকমভেদ পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে বহুগামীতার প্রবণতা বেশি। শুধু তাই নয়, সেই সব পুরুষের সঙ্গীরা জানিয়েছেন যে তাদের বিবাহিত জীবন সুখের নয়। কিন্তু এই দৃষ্টান্ত থেকে এটা পরিষ্কার নয় যে, তাদের বিবাহিত জীবন সুখের নয় বলেই তারা বহুগামী নাকি বহুগামী বলেই বিবাহিত জীবন সুখের নয়। পাশাপাশি এটাও পরিষ্কার নয় ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর জিনের রকমফেরই একমাত্র দায়ী কিনা তাদের বহুগামিতার পেছনে , নাকি পাশাপাশি  অসুখী দাম্পত্য জীবনও এর কারণ । তবে এখানে ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর জিন যে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত তা কিন্তু পরিষ্কার।

এবার আসা যাক ডোপামিনের কথায়।  ডোপামিন ক্ষরণ না হলে যেমন দুটি মানুষের মধ্যে যেমন কোনো রকম মেলবন্ধন তৈরি হতে সমস্যা হয়, অতিরিক্ত ডোপামাইন ক্ষরণ হলেও কিন্তু আবার বহুগামিতার প্রবণতা দেখা যায়। অক্সিটোসিন কিন্তু ডোপামিনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে সমস্ত মানুষ শৈশবে মানসিক আঘাত বা ট্রমার শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে অক্সিটোসিন ক্ষরণ ঠিক মত হয় না, আর এর ফলে অস্বাভাবিক বেশি হারে ডোপামিন ক্ষরণ হয়। শৈশবে ট্রমার শিকার যারা, তাদের মধ্যে বহুগামিতার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। বর্তমানে আমরা বিভিন্ন কারণে শৈশবের ট্রমা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে শিখেছি, খোলাখুলি কথা বলতে শিখেছি যৌনতা নিয়েও।

এমন নয় যে বহুগামিতা কেবল বিগত কয়েক শতকে দেখা যাচ্ছে, আদিম মানুষ আদতে বহুগামীই ছিলো। মোটামোটি চার লক্ষ বছর আগে থেকে মানুষের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এই প্রবণতা কমে ও একগামীতার প্রবণতা বাড়ে। বহুগামীতা এখনও প্রকট পুরুষ পাহাড়ি গোরিলাদের মধ্যে।  বিবর্তন ও জেনেটিক্সের সংজ্ঞা দিয়ে বললে, গোরিলা তো আদতেই মানুষের নিকটাত্মীয়ই।

আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা রয়েছে, পুরুষদের মধ্যে বহুগামীতার প্রবণতা বেশি।  যদি বিবর্তনের লেন্স দিয়ে এর যুক্তি খোঁজা হয় তাহলে দেখা যাবে পুরুষ শুক্রাণু তৈরি করে অনেক বেশি, তাই তার কর্ষণের প্রবণতা বেশি এবং একসাথে একাধিক  ডিম্বাণু নিষিক্ত করার ক্ষমতাও  তার আছে । অন্য দিকে নারী, আবারও যদি অভিযোজন ও বিবর্তনের লেন্স দিয়ে দেখা হয়, দেখা যাবে তার মধ্যে একগামী হওয়ার প্রবণতা বেশি। কারণ তার জনন কোশের সংখ্যা মাত্র একটি আর সেই জনন কোশের নিষেক একটি মাত্র শুক্রাণু দিয়েই হয়, একাধিক শুক্রাণু দিয়ে নয়।

সমাজের কথা ছেড়ে দিয়ে, অভিযোজনগত দিক থেকে দেখলে অন্তত তা-ই বহুগামীতার কারণ। পাশাপাশি জিন এবং হরমোনের ভূমিকা তো আছেই।

বহুগামিতার কারণে অনেকক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক ক্ষতিও হয় গভীর ভাবে। অন্যদিকে সংখ্যাটা খুব কম হলেও অনেক সমাজেই  আবার নারী ও পুরুষ উভয়ের বহুগামিতাকেই সুস্থ ভাবে মেনে নেওয়া হয়, সঙ্গীরাও একে-অপরের একাধিক সঙ্গী নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহুগামিতাকে নিন্দের চোখে দেখা হলেও, শেষমেশ কারণগুলো তো মূলত বৈজ্ঞানিক।

 

More Articles

;