"আমি আপনার স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাই" : নির্ভীক প্রেমিক জগজিৎ সিং রইলেন আড়ালেই

Jagjit Singh Chitra Singh Love Story: জগজিৎ আর চিত্রার সন্তানের মৃত্যুর পর ভেস্তে গিয়েছিল জীবনের বাগিচা।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
"আমি আপনার স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাই" : নির্ভীক প্রেমিক জগজিৎ সিং রইলেন আড়ালেই

উনসে নজরে ক্যায়া মিলি, রওশন ফিজায়ে হো গ্যয়ি

আজ জানা প্যায়ার কি, জাদুগরি ক্যায়া চিজ হ্যায়

প্রেমের 'নরমিয়ৎ'-কে তিনি ছুঁয়েছিলেন কণ্ঠের স্পর্শে। একইসঙ্গে কী অপূর্ব বিষণ্ণতা তাঁর গলায়, আবার কী তীব্র সমর্পণ। প্রেমের জাদুগরিকে শান্ত করে বসিয়েছিলেন নিজস্ব বৈঠকখানায়। আর বিষাদকে রেখেছিলেন ব্যক্তিগত সিন্দুকে। একটি মৃত্যু এসে এলোমেলো করে দিয়েছিল সেই সিন্দুক, খাঁ-খাঁ করে দিয়েছিল বৈঠকখানা। গজল শিল্পী জগজিৎ সিং সেই বিষণ্ণতার পেয়েলায় তবু সুর ঢেলেছেন, প্রাণকে খুঁজেছেন সুরের আলেখ্যেই। সংসার জানেনি, "ক্যায় গম হ্যায় জিসকো...” লুকিয়ে রেখেছিলেন জগজিৎ। অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। সেই জমানাতে 'প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া'-কে বাস্তব করে ফেলেছিলেন তিনি। সামাজিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে ভালোবেসেছিলেন 'পরস্ত্রী'-কে। চিত্রা সিংকে বিয়ে করেছিলেন জগজিৎ। দু'জনেই গানের খনি, সুরের আকর। নিজ নিজ কর্মজীবনের শীর্ষে ছিলেন তাঁরা। শুধু একটি মৃত্যু এসে...

জগজিৎ আর চিত্রার সন্তানের মৃত্যুর পর ভেস্তে গিয়েছিল জীবনের বাগিচা। এই ব্যক্তিগত শোক তাঁদের সঙ্গীতযাত্রাকে থমকে দেয়। চিত্রা চিরতরে গান গাওয়া ছেড়ে দেন। জগজিৎ সিং বেশ কিছুকাল থমকে থাকার পরে ফিরে আসেন। একাধিক শোক সয়ে, বিষাদ মেখে ২০১১ সালে চলে যান তিনিও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'হামে কাশ তুমসে মোহব্বত...', কেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেল মধুবালা-দিলীপকুমারের প্রেম?

গত শতকের ছয়ের দশকে দর্শকদের আলোড়িত করেছিল মুঘল-এ-আজম। হলগুলোতে থিকথিক করছিল লোক। নানা শ্রেণির দর্শক মজেছিলেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের সেই মুহূর্তে। কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন।

১৯৬৭ সালে প্রথম দেখা চিত্রা আর জগজিতের। খানিক 'উনসে নজরে ক্যায়া মিলি...'-র মতোই! একজন সঙ্গীত পরিচালকের রেকর্ডিংয়ে গিয়ে প্রথম দেখা চিত্রা আর জগজিতের। বিভিন্ন গায়কদের নিয়ে একসঙ্গে একটি কাজ করতে চেয়েছিলেন ওই পরিচালক। কিন্তু চিত্রা নারাজ। জগজিৎ সিংয়ের সঙ্গে গান গাইতে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না তিনি। চিত্রা ভেবেছিলেন জগজিতের গলা খুব ভারী। তাঁর সঙ্গে ডুয়েট গাইতে গেলে ব্যাপারটা মোটেও সুখশ্রাব্য হবে না। এমন এক সময়ে চিত্রার সঙ্গে জগজিতের আলাপ যখন তিনি ইতিমধ্যেই বিবাহিত। যদিও স্বামী দেব প্রসাদ দত্তের সঙ্গে সম্পর্ক ঠেকেছিল তলানিতে। দেব প্রসাদ আর চিত্রার এক কন্যাও ছিল, মনিকা। স্বামীর সঙ্গে চিত্রা থাকছিলেন না সেই সময়। জগজিৎ সিং চিত্রাকে ভালোবেসে ফেলেছেন ততদিনে। বিয়ের প্রস্তাব দিলেন সরাসরি। চিত্রা নাকচ করে দিলেন নিজের পরিস্থিতি জানিয়ে। জগজিৎ নাছোড়। সটান চলে গেলেন চিত্রার তৎকালীন স্বামী দেব প্রসাদ দত্তের কাছে! জগজিৎ সিং সোজা প্রস্তাব পাড়লেন দেব প্রসাদের কাছে, "আমি আপনার স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাই।" বাকিটা ইতিহাস।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্পাই নাকি প্রেমিক? পারমাণবিক বোমার সূত্র ‘পাচারের অভিযোগে’ মরতে হয়েছিল যাঁদের

The Rosenberg Trial: ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল রোজেনবার্গ দম্পতিকে। জুলিয়াস রোজেনবার্গ ও এথেল রোজেনবার্গ। পরমাণু বোমার সূত্র পাচারে একমাত্র প্রাণদণ্ড পাওয়া আসামী।

জগজিৎ সিং এবং চিত্রা সিংয়ের সম্পর্কের বুনন ছিল ভীষণ গভীর। প্রেম এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের শিকড় চাড়িয়ে গিয়েছিল নির্ভরতার গহিনে। বাইরের জগতে জগজিৎ চিত্রা হলেও, নিজস্ব সময়ে একে অপরকে 'বিশেষ' নামে ডাকতেন তারা। চিত্রাই একবার বলেছিলেন, জগজিৎ 'মাম্মি' বলে ডাকতেন তাঁকে, আর চিত্রা তাঁকে ডাকতেন 'পাপা' বলে! আসলে যখন বাবু (তাঁদের প্রয়াত পুত্র বিবেক) বেঁচে ছিলেন, চিত্রা প্রায়ই বলতেন 'যাও, পাপাকো বুলাও’। সেই থেকে একে অপরকে সন্তানের ডাকেই ডাকতেন তাঁরা। অথচ দু' চোখে হারাতেন যাকে, সেই সন্তান হারিয়ে গেল চিরতরে।

১৯৯০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে একমাত্র ছেলের মৃত্যু জগজিৎ সিং এবং চিত্রা সিংকে ভেঙে দেয় ভেতরে ভেতরে। সেই বছরের জুলাই মাসে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান বিবেক। সন্তানের মৃত্যুর পরে গান গাওয়া ছেড়ে দেন চিত্রা। আর বাবা? এক বছরের বিরতি নিয়েছিলেন জগজিৎ। ব্যক্তিগত দুঃখকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে বেছেনিলেন সঙ্গীতকেই। ১৯৯১ সালে, জগজিৎ সিং একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন 'হোপ' নামে। 'আব খুশি হ্যায় না কোই গম', 'খুদা হাম কো অ্যাইসি খুদাই না দে' এবং 'তানহা তানহা হাম রো লেঙ্গে'-র মতো গানগুলিতে সন্তানহারা এক বাবাকে খুঁজে পেলেন শ্রোতারা। পেলেন দুঃখকে কণ্ঠে ধারণ করা এক শিল্পীকে। ২০০৩ সালে পদ্মভূষণে ভূষিত হলেন জগজিৎ সিং।

তবে বিশ্বস্ত শোক যাকে ভালোবাসে, তাঁকে ছেড়ে যায় না। ছেলের মৃত্যুর যন্ত্রণা কাটতে কাটতেই ২০০৯ সালের মে মাসে আরেকটি মৃত্যু। চিত্রার মেয়ে মনিকা আত্মহত্যা করেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে মনিকাকে দেখেছেন জগজিৎ! তাঁর কন্যাসমই ছিলেন মনিকা। মনিকার মৃত্যুর দুই বছর পর জগজিৎ সিংও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, মুম্বইয়ের শানমুখানন্দ হলে একটি অনুষ্ঠানে গাওয়ার কথা ছিল। শুরুর ঠিক আগে জ্ঞান হারান। ২ সপ্তাহ পর লীলাবতী হাসপাতালে মারা যান জগজিৎ। শোকের সুর নিয়ে চিরতরে চলে যান এক শান্ত স্থিতধী শিল্পী, চিরতরে।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।