"মুঝে জিন্দা রেহনা হ্যায়," অসুস্থ মধুবালাকে যেভাবে একা ফেলে গিয়েছিলেন কিশোর কুমার

Madhubala Kishore Kumar Relation: নয় বছর ধরে বিছানাতেই পড়েছিলেন মধুবালা, সমস্ত লাবণ্য, মোহ ছেড়ে চলে গিয়েছিল অভিনেত্রীকে।

Madhurima Dutta
৪ মিনিট
"মুঝে জিন্দা রেহনা হ্যায়," অসুস্থ মধুবালাকে যেভাবে একা ফেলে গিয়েছিলেন কিশোর কুমার

পর্দায় এক ঝলক চোখ তুলে তাকানো, অল্প ফাঁক করা ঠোঁটে মুক্তোর মতো দাঁতের সারি, অপার্থিব হাসি। ভুবন ভোলানো অমন রূপ আর দেখেনি ভারতীয় সিনেমার দর্শকরা। এক আস্ত প্রজন্মের কাছে, মধুবালা পর্দায় সাক্ষাৎ দেবী। অনেক তাবড় অভিনেত্রী এসেছেন, আসবেন, অনেক নায়িকা এসেছেন, মন জয় করেছেন কিন্তু মধুবালার মতো সম্মোহনী ক্ষমতা সম্ভবত আর কারওই ছিল না, নেইও। পর্দায় মধুবালার জন্নতজয়ী আবেদন আজও তরতাজা, আজও সমান আকর্ষণীয়। এমন মোহিনী রূপ যার, সেই নায়িকা সমস্ত আলো ফেলে চলে গিয়েছিলেন মাত্র ৩৬ বছর বয়সে। তাঁর সেই প্রাণবন্ত লাবণ্যই তাই আজও থিতু হয়ে আছে ভারতীয় সিনেপ্রেমীদের চোখে, মনে। মধুবালার বয়স বাড়ে না কোনওকালেই।

মধুবালার পর্দার ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সারাক্ষণ যেন রেষারেষি করে এগিয়েছে, অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। পর্দায় অমন মায়া মাখা হাসি, মুগ্ধতা এবং খুনসুটিময় চাহনি দিয়ে লক্ষ লক্ষ হৃদয় চুরি করেছেন মধুবালা। ক্লান্ত জীবনে তাজা বাতাস হয়ে এসেছেন মধুবালা, আর নিজে সারা জীবন শান্ত প্রেমের জন্য আকুল হয়েছেন, রোম্যান্স তাঁকে ছুঁয়ে চলে গিয়েছে অন্য পাড়ায়। মধুবালাকে আত্মীয় করে নেয়নি। অভিনেতা প্রেম নাথ, পরিচালক কিদার শর্মা এবং কমল আমরোহির সঙ্গে নাম জড়িয়েছে তাঁর, তবে কাঙাল তিনি হয়েছেন একজনেরই প্রেমে, দিলীপ কুমার। জীবনের একমাত্র প্রেম দিলীপ কুমারকে আজীবন ভালোবেসে গেলেন কিন্তু বিয়ে করতে পারলেন না মধুবালা। তারপর সম্পর্কে জড়ালেন কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারের সঙ্গে, প্রেম করে বিয়েও করলেন। নয় বছরের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তবু সুখের মুখ দেখলেন না মধুবালা।

দিলীপ এবং মধুবালার কেন বিয়ে হলো না তা নিয়ে বলিউডের অন্দরে নানান গুঞ্জন। অনেকেই বলেন, মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান ছিলেন মূল খলনায়ক। মধুবালার বোন জাহিদা ওরফে মধুর ভূষণ দাবি করেছিলেন, নয়া দৌড় সিনেমা তৈরির সময় আদালতের মামলা এবং তাদের নিজ নিজ অহং বোধের ফল ভুগতে হয়েছে এই প্রেমকে। দিলীপ নিজেই তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছিলেন, আতাউল্লাহ এই বিয়েকে ব্যবসায়িকভাবে দেখতে চেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বিষয় এমন তিক্ত হয়ে যায় যে মধুবালা আর দিলীপের সম্পর্কের সুতো ঢিলে হতে থাকে। তবে কেউ কাউকে না ভালোবেসে থাকতে পারেননি আজীবন। দিলীপের প্রেমের মোহই মধুবালাকে এগিয়ে দেয় কিশোর কুমারের সঙ্গে বিয়ের বাঁধনে বাঁধার পড়ার দিকে। ঝুমরু এবং চলতি কা নাম গাড়ির মতো সিনেমায় মধুবালার সহ-অভিনেতা ছিলেন কিশোর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
"এই ছেলেকে দিয়ে আমি গান গাওয়াব," বাথরুমে কিশোরের গলা শুনে বলেছিলেন শচীন কত্তা!

Kishore Kumar: ইন্ডাস্ট্রিতে একুশ বছর কেটে যাবার পরেও কিশোরকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিলেন না সুরকাররা।

চলতি কা নাম গাড়ি এবং হাফ টিকিটের শুটিংয়ের সময় মধুবালার সঙ্গে কিশোর কুমারের দেখা। কিশোরের সঙ্গে ততদিনে তাঁর প্রথম স্ত্রী রুমা গুহ ঠাকুরতার বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। শোনা যায়, মধুবালার বাবা-মায়ের জন্য কিশোর কুমার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন করিম আবদুল। তবে মধুবালাকে কিশোর কুমারের পরিবারে কখনই গ্রহণ করেনি। পরিবারের অশান্তি মধুবালার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। শোনা যায়, কিশোর ১৯৬০ সালে মধুবালাকে তাঁর অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁরা বিয়ে করে লন্ডন চলে যান। মধুবালার হার্টে একটি ছিদ্র (চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট) ধরা পড়ে। এই সমস্যায় মধুবালার শরীর অতিরিক্ত রক্ত তৈরি করত, যা তাঁর নাক এবং মুখ থেকে বেরিয়ে আসত। বিদেশে ডাক্তাররা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, মধুবালা গুরুতর অসুস্থ। খুব বেশি হলে বছর দুয়েক বাঁচবেন এই মোহময়ী অভিনেত্রী।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'হামে কাশ তুমসে মোহব্বত...', কেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেল মধুবালা-দিলীপকুমারের প্রেম?

গত শতকের ছয়ের দশকে দর্শকদের আলোড়িত করেছিল মুঘল-এ-আজম। হলগুলোতে থিকথিক করছিল লোক। নানা শ্রেণির দর্শক মজেছিলেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের সেই মুহূর্তে। কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন।

ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য থেকে ফিরে কিশোর ও মধুবালা আলাদা থাকতে শুরু করেন। পরিবার এই হিন্দু মুসলিমের বিয়ে মেনে নেয়নি কখনই। পরিবারের সঙ্গে বাড়ে দূরত্ব, অসুস্থতার কারণে ক্রমেই অস্থির হতে থাকেন মধুবালা, রেগে যেতে শুরু করেন। নয় বছরের বিয়েতে অসুস্থতা এসে বদলে দেয় রাস্তা। ১৯৬৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কিশোর মধুবালা বিবাহিত ছিলেন ঠিকই, তবে তাঁদের মধ্যে প্রেমের ছিটেফোঁটাও ছিল না।

মধুবালার বোন মধুর এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছিলেন, "মধুবালা নিজেই বলেছিলেন কিশোর আর মধুবালার পথ আলাদা হয়ে যাওয়ার পরেও দিলীপের প্রেমে পাগল ছিলেন তিনি। আসলে, কিশোর যখন মধুবালাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন দিলীপ কুমারের উপর ব্যাপক ক্ষোভ আর রাগ থেকেই খানিক শিক্ষা দিতে কিশোরকে করে নেন মধুবালা। ১৯৬০ সালে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। মধুবালার বয়স তখন ২৭ বছর।"

কিশোর সম্পর্কে বলতে গিয়ে মধুবালার বোন জানান, ডাক্তার জানিয়েই দিয়েছিলেন মধুবালা বেশিদিন বাঁচবেন না। কিশোর তাঁকে মুম্বইয়ের কার্টার রোডের একটি বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে একজন নার্স এবং একজন ড্রাইভার সহ মধুবালাকে একা ফেলে রেখে যান। প্রায় চার মাসে একবার মধুবালাকে দেখতে আসতেন। মধুবালার ফোন ধরতেন না। কিশোর মধুবালার প্রেমে পাগল ছিলেন ঠিকই কিন্তু লন্ডন থেকে ফিরে এসে মধুবালাকে অসুস্থতার মধ্যে ছেড়ে চলে যান। ভাল স্বামী ছিলেন না কিশোর। চিকিত্সকরা জানিয়েছিলেন মধুবালার সঙ্গে কোনও রকম যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন না কিশোর। তবুও এই অসুস্থতার সময় মানসিক সমর্থন প্রয়োজন ছিল মধুবালার। কিশোর কখনও দুর্ব্যবহার করেননি মধুবালার সঙ্গে, চিকিৎসার খরচ বহন করেছেন। কিন্তু পাশে থাকেননি মধুবালার।

নয় বছর ধরে বিছানাতেই পড়েছিলেন মধুবালা, সমস্ত লাবণ্য, মোহ ছেড়ে চলে গিয়েছিল অভিনেত্রীকে। শুধু ছিল বাঁচার আকাঙ্খা, তীব্র আকুতি। শেষ দিকে কাঁদতেন, কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, "মুঝে জিন্দা রেহনা হ্যায়, মুঝে মরনা নহিঁ হ্যায়, ডাক্তার কব ইলাজ নিকালেঙ্গে"।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।