হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছাড়ার আসল কারণ কী? জল্পনা দানা বাঁধছে শুভেন্দুর নীরবতায়

স্রেফ জল্পনা বা অনুমানের ভিত্তিতে রাজনীতি হয় না৷ তবে রাজনীতিতে জল্পনার একটা ক্ষণস্থায়ী ভূমিকা থাকে৷ সেইসব পরিণতি জল্পনামাফিক না হলেও কিছু সময়ের জন্য তা চর্চার বস্তু হয়৷ আর সেই চর্চা তুমুল হয়, যদি এর সঙ্গে জুড়ে থাকে হেভিওয়েট কোনও রাজনীতিকের নাম৷ বাংলায় এই মুহূর্তে শুভেন্দু অধিকারী-সংক্রান্ত যে কোনও জল্পনাই বেশ মুচমুচে৷ তাই নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়কের দুম করে তমলুক বিজেপির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছাড়ার ঘটনা নিয়ে গুঞ্জন পল্লবিত হয়েছে৷

বিজেপির তমলুক সাংগঠনিক জেলা পদাধিকারীদের গ্রুপ ছেড়েছেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী৷ তাঁর সঙ্গেই গ্রুপ ছেড়েছেন জেলা বিজেপির সহ সভাপতি তথা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সাহেব দাস। তার কিছুক্ষণ আগে সাংগঠনিক গ্রুপ ছাড়েন গেরুয়া-বিধায়ক অশোক দিন্দা। বলা হচ্ছে, দিন্দাকে সমর্থন জানিয়েই গ্রুপ ছেড়েছেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক৷ সব মিলিয়ে রাজ্য বিজেপির অন্দরে এবং বাইরেও ভেসে বেড়াচ্ছে অজস্র জল্পনা৷ তাহলে কি দলীয় নেতৃত্বের ওপর গোঁসা করে এবার বিদ্রোহীদের তালিকায় নাম লেখালেন শুভেন্দু অধিকারীও? আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন কথাও ঘুরছে, শুভেন্দুর 'ঘর ওয়াপসি' না কি শুধুই সময়ের অপেক্ষা!

এমনিতেই ভালো নেই বিজেপি৷ সংসারের ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে৷ বঙ্গ বিজেপিতে বিদ্রোহের সুর চড়া হচ্ছে৷ দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন একের পর এক নেতা৷ আসানসোল এবং বালিগঞ্জের উপনির্বাচনে ভরাডুবির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে রাজ্য সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেন মুর্শিদাবাদের বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ-সহ ৩ নেতা। ক্ষোভের সুর বহরমপুরের বিজেপি বিধায়কের মুখেও৷ একই ধরনের বার্তা দিয়ে দলীয় পদ থেকে অব্যহতি চেয়েছেন একসঙ্গে নদিয়ার দশ নেতা। দলের এই বেহাল অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা অনুপম হাজরা। আর এবার তো জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে শুভেন্দুকে নিয়েই৷

আরও পড়ুন: মুখে ‘বেঙ্গল ফার্স্ট’, মমতায় আস্থা, এবার কি তৃণমূলে ‘ঘর ওয়াপসি’ অর্জুনের?

কিছুদিন আগে একইভাবে দলীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ত্যাগ করেছিলেন শিলিগুড়ির বিজেপির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। ওখানে দলের সংগঠনের দায়িত্বও তাঁর হাতেই৷ সঙ্গে সঙ্গেই চর্চা শুরু, দলত্যাগীদের তালিকায় এবার নাম লেখাতে চলেছেন শঙ্কর ঘোষ৷ তবে সেই জল্পনা বেশিক্ষণ চলতে দেননি তিনি৷ জল্পনায় জল ঢালেন শঙ্কর ঘোষ নিজেই৷ সব গুঞ্জন উড়িয়ে শঙ্কর ঘোষ তখনই জানান, "আমাদের দলে রোজ ওরকম কত গ্রপ তৈরি হয়। এত বেশি গ্রুপের জন্য অনেক সময় দরকারি তথ্য নজরে আসে না। যে গ্রুপটি ছেড়েছি, সেটি গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির জমানায় ভোট পরিচালনার জন্য তৈরি করা। ভোট মিটে গিয়েছে। সেই গ্রুপের আর কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই৷ এমন ইনঅ্যাক্টিভ গ্রুপ ছাড়ার মধ্যে বিতর্কের কী আছে?"

তবে শুভেন্দু-ইস্যুটি এত সহজে মিটছে না৷

পক্ষে-বিপক্ষে সমান তীব্রতায় যুক্তিযুদ্ধ চলছে৷ জল্পনার পালে আরও হাওয়া লাগিয়ে একপক্ষ বলছেন, তমলুক সাংগঠনিক জেলা বিজেপিতে আদি-নব্যের কোন্দল চরমে৷ রবিবার ওই জেলা বিজেপি ৪২টি মণ্ডল সভাপতির নাম ঘোষণা করে। এই তালিকায় নেই পুরনো মণ্ডল সভাপতিদের নাম৷ অথচ এই সভাপতিদের হাত ধরেই নির্বাচনে সাফল্য পায় বিজেপি৷ এই কারণেই আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। বিক্ষুব্ধদের বক্তব্য, জেলা সভাপতি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠদের নাম ঢালাওভাবে ঢোকানো হয়েছে ওই তালিকায়৷ নির্মমভাবে কাটা হয়েছে যোগ্য, দক্ষ নেতাদের নাম৷ ঘটনাচক্রে, এর ঠিক পরেই একে একে দলীয় গ্রুপ থেকে 'লেফট' হন নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী, ময়নার বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্দা এবং জেলার বিজেপি নেতা সাহেব দাস৷ বিজেপি সূত্রেই জানা যাচ্ছে, শুভেন্দু অধিকারী জেলা কমিটিতে যেসব নাম প্রস্তাব করেছিলেন, তা আমল দেয়নি দল। এতেই সম্পর্কের অবনতি হয়৷ এই ঘটনায় ভয়ানক চটেছেন শুভেন্দু ৷ এছাড়া কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে একটি রিপোর্টও জমা পড়েছে৷ এই ঘটনাগুলি ভালভাবে নেননি শুভেন্দু এবং তাঁর সহযোগীরা৷ এরপরেই একের পর এক নেতা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ত্যাগ করেন, যা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ৷ শুভেন্দু অধিকারীর এভাবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ত্যাগ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অজস্র জল্পনা সামনে আসছে৷ সব জল্পনাই শেষ হচ্ছে একটাই প্রশ্ন তুলে, তবে কি এবার বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলাতে চলেছে? শুভেন্দু কি ছাড়তে চলেছেন বিজেপি? তবে কি এবার নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী! রাজ্যে এই মুহূর্তে বিজেপি-র অন্যতম মুখ শুভেন্দু। তাঁকে নিয়ে এই ধরনের জল্পনায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে দলের মধ্যে এবং বাইরেও৷

ওদিকে এই সব জল্পনায় ঠাণ্ডা জল ঢেলেছেন অন্যপক্ষ৷ তাদের বক্তব্য, এই ইস্যুতে ভিত্তিহীন বিতর্ক বা জল্পনা তৈরি করা ঠিক হচ্ছে না৷ শুভেন্দু রাজ্যের অন্যতম শীর্ষ নেতা হওয়ায় সাংগঠনিকভাবে রাজ্য বিজেপির একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবেও তাঁর নিজস্ব একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে। এই গ্রুপটির সাহায্যে বিধায়কদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেন শুভেন্দু ৷ সব গ্রুপেই সমান সক্রিয় বিরোধী দলনেতা। শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠরা বলেছেন, রাজ্যের ব্যস্ততম রাজনীতিক শুভেন্দু৷ একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। সেই কারণেই তিনি একে একে ‘অপ্রয়োজনীয়’ কিছু গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ এই ঘটনা নিয়ে সংকীর্ণ রাজনীতির গন্ধ খোঁজা মূর্খামি৷ অন্যদিকে বিজেপি নেতা সাহেব দাস সাফাই দিয়ে বলেছেন, শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে তিনি গিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁর মোবাইল ফোন হারিয়ে যায়। নতুন মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ সেট করতে গিয়েই এই বিপত্তি ঘটেছে। এর মধ্যে দল ছাড়ার প্রসঙ্গ কেন তোলা হচ্ছে? নিজের কথা বললেও সাহেব দাস শুভেন্দুর গ্রুপ ছাড়া নিয়ে নীরব৷ তাঁর কথা, কেন গ্রুপ ছেড়েছেন, তা শুভেন্দুই বলতে পারবেন।

এই বিতর্ক তৈরি হওয়ায় একটা অন্তত কাজ হয়েছে৷ দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী দিনে শীর্ষ নেতাদের অনুমতি না নিয়ে, দলের কেউই জেলা স্তরের কোনও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাঁদের যুক্ত করতে পারবে না৷ ইদানীং, রাজ্য বিজেপি নেতাদের দলের কোনও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছাড়া নিয়ে পর পর বিতর্ক হচ্ছে৷ এর ফলে দল অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে৷ তাই দলের জেলা নেতৃত্বকে জানানো হচ্ছে, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার বা শুভেন্দু অধিকারী-র মতো নেতাদের অকারণে গুরুত্বহীন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা যাবে না৷ নানা কাজে তাঁরা ব্যস্ত থাকেন। তাছাড়া এই স্তরের নেতারা যদি জেলা স্তরের সাংগঠনিক গ্রুপে থাকেন, তাহলে জেলা নেতৃত্ব স্বাধীনভাবে কাজ করতেই পারবে না৷ শুভেন্দু অধিকারী তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েই জেলা স্তরের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সরে এসেছেন৷ এসব নিয়ে জল্পনা নেহাতই হাস্যকর৷

এর পরেও কিন্তু ছোট্ট একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে৷ তাঁর গ্রুপ লেফট নিয়ে এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, এত জল্পনা বাজার গরম করছে, সবকিছু দেখেও নীরব কেন শুভেন্দু অধিকারী?

 

More Articles