গর্ভবতী অবস্থায় ৭ জনের গলা কেটে খুন! স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলার ফাঁসি দেখবে দেশ?

First Woman To Be Hanged: বিচার চলাকালীনই জন্ম নেয় শবনমের সন্তান। বেশ কয়েক বছর আগে সন্তানটিকে সাংবাদিক উসমান সাইফি এবং তাঁর স্ত্রী বন্দনা দত্তক নেন।

inscript
৩ মিনিট
গর্ভবতী অবস্থায় ৭ জনের গলা কেটে খুন! স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলার ফাঁসি দেখবে দেশ?

৭ জনকে একসঙ্গে হত্যা। নিষ্ঠুরতার কথা উঠলে সাধারণত কোনও মহিলার চেহারাই ভেসে ওঠে না দীর্ঘদিনের চিন্তন অভ্যাসে। তবু, বাস্তব চিরকালই বড় রুক্ষ। স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা হিসেবে যাকে ফাঁসি দেওয়ার ঘোষণা করেছিল ভারতের আইন সেই মহিলার কাহিনি সেই রূঢ় বাস্তবকে আরও নিবিড় করে খোদাই করে দেয়। শিক্ষিকা থেকে খুনি হয়ে ওঠার সেই যাত্রাপথ নৃশংসতার সংজ্ঞা বদলে দেয়। ৩৮ বছর বয়সী ওই শিক্ষিকা, শবনম আলি পরিবারের সাত সদস্য, নিজের মা, বাবা, দুই ভাই, ননদ, খুড়তুতো ভাই এবং ১০ মাস বয়সী ভাইপোকে হত্যা করে। দুধের মধ্যে নেশার দ্রব্য মিশিয়ে তারপরে গলা কেটে খুন করা হয় পরিবারের ওই সাত জনকে। অথচ এই শবনমই স্কুলে পড়ুয়াদের কাছে ছিল বেশ প্রিয় শিক্ষিকা!

শবনম উচ্চ শিক্ষিতও। উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের আমরোহা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বাওয়াখেরির বাসিন্দা শবনম ইংরেজি এবং ভূগোলে ডবল এমএ করেছে। স্কুল শিক্ষিকা হিসাবে গ্রামেরই এক স্কুলে পড়াত শবনম। শবনমের কাকা সাত্তার আলি জানিয়েছিলেন, শবনমের মতো বাধ্য মেয়ের দেখা পাওয়া মুশকিল ছিল। এত বাধ্য, অনুগত মেয়ে কীভাবে বীভৎস খুনি হয়ে উঠল? কীভাবে নিজের পরিবারের স্বজনদের শেষ করে ফেলল একাই? নেপথ্যে রয়েছে শবনমের এক প্রেমের কাহিনি। শবনম আলি তার প্রেমিককে বিয়ে করার জন্যই পরিবারের ৭ জন সদস্যকে হত্যা করে। যদি এই ফাঁসি কার্যকরি হয় তবে এটিই হবে স্বাধীন ভারতের একজন মহিলার প্রথম ফাঁসি।

সাল ২০০৮। ১৪ এবং ১৫ এপ্রিলের মধ্যবর্তী রাতে শবনম তার পরিবারকে নেশার দ্রব্য খাইয়ে দেয় এবং গলা কেটে খুন করে। তার প্রেমিক সেলিমও একটি কুড়ুল দিয়ে পরিবারের গলা কেটে খুনে সাহায্য করে শবনমকে। যে সময় শবনম এমনটা করছে তখন সে সাত সপ্তাহের গর্ভবতী। এই সন্তান ছিল শবনম আর তার প্রেমিক সেলিমের। শবনমের পরিবারের সদস্যরা সেলিমের সঙ্গে তার এই সম্পর্কের বিরুদ্ধে ছিলেন। এই বিরোধিতার মূল কারণ দু'জনের আর্থ-সামাজিক পরিবেশ ভিন্ন এবং 'জাত'ও ভিন্ন। এবং শবনম ও সেলিমের বয়স তখন ২০-র আশেপাশে। খুনের পর নিজেদের উপর থেকে সন্দেহের তির অন্যদিকে ঘোরাতে শবনম জানিয়েছিল অজ্ঞাতপরিচয় কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হত্যার পাঁচ দিন পরে পুলিশ এই প্রেমিক ও প্রেমিকাকে গ্রেপ্তার করে। নেশার ওষুধ, রক্ত লাগা পোশাক এবং কুড়ুলও উদ্ধার করে পুলিশ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিতাভস্ম কিনতে শোরগোল পড়ে কলকাতায়! কানাইলালের ফাঁসি যেভাবে শিক্ষা দিয়েছিল ইংরেজদের

Freedom Fighter Kanailal Dutta Death: কোর্টে কানাইলালকে জিজ্ঞাসা করা হল, পিস্তল কোথায় পেয়েছিলে? উত্তরে বললেন,"ক্ষুদিরামের আত্মা পিস্তল দিয়ে গেছে।"

শবনমের পরিবার ছিল সাইফি মুসলিম পরিবার। জমিজমা ছিল বেশ ভালোই। অন্যদিকে সেলিম একজন পাঠান। শুধু তাই নয়, ষষ্ঠ শ্রেণির পরে স্কুলছুট হয়ে যায় সেলিম। দিনমজুরি করেই রোজগার করত সে। শবনমের পরিবার প্রায় ৩০ বিঘা জমির মালিক ছিল। তার বাবা স্থানীয় কলেজের কলাবিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন। শবনম নিজে একজন স্কুল শিক্ষিকা, আর প্রেমিক কিনা দিনমজুর, মেনে নিতে পারেনি পরিবার।

২০১০ সালে উত্তরপ্রদেশের আমরোহায় সেশনস কোর্ট শবনম ও সেলিমকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। পরবর্তী ১১ বছরে শবনম রাষ্ট্রপতি, এলাহাবাদের উচ্চ আদালত এবং দু'বার সুপ্রিম কোর্টেও ফাঁসির সাজা মকুবের আবেদন করেন। মথুরা জেলা জেলে দেশের প্রথম মহিলাকে ফাঁসি দেওয়ার তোড়জোর শুরু হয়ে যায়। দেড়শ বছর আগে নির্মিত, মথুরার ফাঁসির মঞ্চ, কাঠামো স্বাধীন ভারতে কখনও ব্যবহৃতই হয়নি। পবন জল্লাদ এসে সব তদারকিও করে যান। বিহারের বক্সার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দু'টি ফাঁসির দড়িও অর্ডার করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট আবেদন খারিজ করে দিলেও থেমে থাকেননি শবনম। এখনও চলছে বিচার।

এই বিচার চলাকালীনই জন্ম নেয় শবনমের সন্তান। বেশ কয়েক বছর আগে এই পুত্র সন্তানটিকে বুলন্দশহরের দম্পতি, সাংবাদিক উসমান সাইফি এবং তাঁর স্ত্রী বন্দনা দত্তক নেন। শবনম এবং উসমান ঘটনাচক্রে একই কলেজে পড়াশোনা করতেন। শবনম দু'বছরের সিনিয়র ছিল উসমানের। একই বাসে কলেজে যেতেন তারা। সেই সময় প্রবল অর্থকষ্টে রয়েছেন উসমান। একবার শবনমকে জানিয়েছিলাম কলেজের ফি জমা দেওয়ার মতো টাকা নেই তাঁর। শবনমই সাহায্য করে উসমানকে। উসমানের কাছে 'বড় দিদি’, পড়ুয়াদের কাছে 'প্রিয় শিক্ষিকা' সমস্ত পরিচয় ছাপিয়ে শবনম হয়ে উঠল এক খুনি। যার মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে দেশও। মহিলার ফাঁসি, স্বাধীন ভারতে প্রথম কোনও মহিলা ঝুলে পড়বেন দড়ি থেকে, দেশ যে দৃশ্য আগে দেখেইনি কখনও।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।