এআই যতটা গর্জাচ্ছে ততটা বর্ষাবে?

AI Revolution: এই এআই বিপ্লব এখনও উপন্যাসের মধ্যভাগে, পথচলা অনেক বাকি, সবেমাত্র চরিত্ররা নিজস্ব ছাপ ছেড়ে যাচ্ছে, ক্লাইম্যাক্স এখনও অনেক দূর।

Abhirup pal
৩ মিনিট
এআই যতটা গর্জাচ্ছে ততটা বর্ষাবে?

দুনিয়ার এখন এমন এক অবস্থা যে দোকানে কিছু দিন আগেও লেখা থাকত 'ফোন রিচার্জ করা হয়', সেখানে কয়েক দিন পর হয়ত বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে 'এখানে সুলভ এআই দিয়ে প্রেম পত্র লেখা হয়'। লিফটম্যান, লেকচারার, গ্রন্থাগারিক সবাই এক কথাই বলছেন, 'এআই এলে আর মানুষকে নাকি কাজ করতে হবে না!' শুনলে মনে হয় বাঙালির হাতে চাঁদ। কিন্তু বিধি বাম। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলুর গলায় উল্টো সুর। তিনি বলছেন, হুজুগ কমান। সব বিপ্লবের শব্দ বড় হয় না, প্রযুক্তির ইতিহাস বলে বিপ্লবের শব্দ অনেক সময় গুগল ড্রাইভের নোটিফিকেশনের মতো নিশ্চুপে আসে।

ড্যারন অ্যাসেমোগলুরের নতুন গবেষণাপত্র 'The Simple Macroeconomics of AI-এ কাগজ, কলম, ক্যালকুলেটর নিয়ে তিনি হিসেব কষে দেখিয়েছেন এই বহুল ঘোষিত এআই বিপ্লব আসলে কোনও বড় ঢেউ নয়, একটা ছোট তরঙ্গমাত্র। তিনি লিখছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দশ বছরে মোট উৎপাদনশীলতা (TFP) বাড়াবে মাত্র ০.৫৩% থেকে ০.৬৬%, এক চিমটে নুনের মতো। ভাবুন, পৃথিবীতে এত সব বড় টেক কোম্পানি, লাখ লাখ সার্ভার, কোটি কোটি কোড লাইন থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতির গায়ে ঠান্ডা বাতাস লাগছে না ঠিকঠাক। অ্যাসেমোগলু বলছেন, প্রযুক্তি তখনই বদল আনে, যখন তা শুধু ডেটা বিশ্লেষকের ডেস্কে নয়, দোকানির ঘরেও কাজে লাগে।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনও কেবল সহকারী মাত্র। ফাইল সাজায়, ই-মেল লেখে, ডেটা খোঁজে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের ধরন বদলাচ্ছে বটে, তবে সমাজ বদলাচ্ছে কি? গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০% কাজ এআই দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু তার মধ্যে মাত্র এক চতুর্থাংশই আদপে স্বয়ংক্রিয়। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার বাড়লেও বাড়বে সর্বাধিক ১.৫৬%। সেটাও মূলধনের সাহায্যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একার ক্ষমতায় নয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এবার হাতের লেখা, সইও নকল করবে এআই! আপনি নিরাপদ তো?

AI Handwriting mimicry : এমন প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে যা সামান্য কয়েকটি লিখিত অনুচ্ছেদের উপর ভিত্তি করে যে কারও হাতের লেখা অনুকরণ করতে পারে।

অ্যাসেমোগলু বলছেন, এআই ছবি দেখে হয়ত সহজেই বুঝতে পারে সামনের লোভনীয় বস্তুটি ‘বিরিয়ানি’। কিন্তু সেই বিরিয়ানির গন্ধে স্মৃতি আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করতে গেলেই এআই-এর উত্তর হবে হয়ত Error 404। শ্রেণিবিন্যাস বা ডেটা সাজানোর মতো সহজ কাজ এআই-এর হাতে নিখুঁত, কিন্তু জটিল পারিবারিক থেরাপি, কূটনৈতিক আলোচনা যেখানে, সেখানে এআই এখনও ফার্স্ট বেঞ্চের ভয় পাওয়া ছাত্রটি।

অ্যাসেমোগলুর সহকর্মী, MIT-এর বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটর বরং আশাবাদী। তিনি বলছেন, জেনারেটিভ এআই সাধারণ মানুষকেও বিশেষ দক্ষতা ব্যবহার করতে দিচ্ছে। এতে মধ্যবিত্ত হারানো চাকরি ফিরে পেতে পারলেও পারে। কিন্তু অ্যাসেমোগলু সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তাঁর মতে, সব প্রযুক্তি মামদানির মত সমাজতন্ত্রী নয়। অভিজ্ঞতা বলছে নতুন কাজ মানেই নতুন স্কিল, আর নতুন স্কিল মানেই ইউটিউবে পনেরো মিনিটে প্রফেশনাল লার্নিংয়ের সার্চ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মিথ্যেবাদী অনৈতিক এআই, মানুষ তাকে সামলাতে পারবে?

AI Research: মানুষ মিথ্যে বললে পাপ, আর যন্ত্রে বললে 'আপগ্রেডেশন'? হ্যাঁ, ঠিক এই রকমই এক নৈতিক ভেলকিবাজির কেসস্টাডি প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়।

বৈষম্যের গল্পটা কোথায়? এই প্রযুক্তির লাভ কোথায় যাবে? হয়ত যেখানে কাঁচের দালান, ল্যাপটপ বা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘর সেখানে। কিন্ত গরিবের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিনি দুধ কম, জল বেশি এমন চায়ের থেকে বেশি কিছু কি হবে আদপে?

অ্যাসেমোগলুর বক্তব্য যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জিডিপি বাড়িয়েছে, কিন্তু সামাজিক শান্তি কমিয়েছে, এআই-ও ঠিক সেই পথে হাঁটছে। অর্থাৎ, জিডিপি খুশি হলেও, সমাজ কাঁদবেই। এআইও হয়ত অর্থনীতিতে নতুন সংখ্যা যোগ করবে, কিন্তু মানুষের সম্পর্কের অঙ্ক হয়ত আরও জটিল হবে। এআই আসলে পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মতো দেখবে, কিন্তু সাড়া পাবেন না।

গোল্ডম্যান স্যাক্সের গবেষকরা কিন্তু আশাবাদী। তাঁদের মতে, এআই আগামী বছরগুলোতে গড়ে ১.৫% হারে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে। নব্বইয়ের দশকের আইটি বিপ্লব, যেমন একসময় নতুন কাজের দুনিয়া খুলে দিয়েছিল ঠিক তেমনই হবে ব্যাপারটা। কিন্তু অর্থনৈতিক সংগঠন রিচমন্ড ফেড জু ঝাং মনে করিয়ে দেন, যত বড় প্রযুক্তি, তত জটিল রূপান্তর। এআই এখনও কেবল প্রাথমিক শ্রেণিতে অর্থাৎ, পরীক্ষার খাতা এখনও খোলেনি তার।

অ্যাসেমোগলুর গবেষণায় একটি উদ্বেগজনক তথ্যও সামনে এসেছে। কম শিক্ষিত শ্রমিকরা আয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মূলধন ও শ্রমের ব্যবধান তো বাড়বেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং পোস্ট ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর কিছু করবে কিনা সেইটেই সন্দেহের। এই এআই বিপ্লব এখনও উপন্যাসের মধ্যভাগে, পথচলা অনেক বাকি, সবেমাত্র চরিত্ররা নিজস্ব ছাপ ছেড়ে যাচ্ছে, ক্লাইম্যাক্স এখনও অনেক দূর। সেই পথচলায় আমরা হয়ত আবার শিখব,অর্থনীতি শুধু সংখ্যার হিসেব নয়, তারও উপরে আছে জীবনের ব্যালান্স শিট। চা খান, সময় দিন, এআই দুনিয়া এখনও 'লোডিং' মোডে আছে।

লিখেছেন
Abhirup pal
Abhirup pal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।