কেন 'শান্তি বিল' নিয়ে লোকসভায় উত্তেজনা?

SHANTI Bill Explained: বিরোধীদের মতে, বেসরকারি সংস্থার প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো হলেও পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বায়ত্তশাসন ও শক্তি বাড়ানোর বিষয়টি বিলে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

inscript
৩ মিনিট
কেন 'শান্তি বিল' নিয়ে লোকসভায় উত্তেজনা?

ভারতের পারমাণবিক শক্তি নীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চাইছে মোদি সরকার। সেই লক্ষ্যেই সংসদে আনা হয়েছে বহুল আলোচিত ‘শান্তি বিল’ (SHANTI Bill)। কিন্তু এই বিল ঘিরেই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা বা ‘নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি’ সংক্রান্ত একটি ধারাকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের সংঘাত আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, এই বিলের আড়ালে কর্পোরেট স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের অধিকারকে খর্ব করা হচ্ছে।

কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী, কংগ্রেসের মতে, শান্তি বিল আসলে ২০১০ সালের Civil Liability for Nuclear Damage Act-এর মূল উদ্দেশ্য ও কঠোরতা অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে। ওই আইনে স্পষ্টভাবে বলা ছিল, পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী নয়, প্রয়োজনে সরঞ্জাম সরবরাহকারী সংস্থাকেও দায়ী করা যাবে। এর ফলে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা নির্মাণগত গাফিলতির জন্য বিদেশি বা দেশীয় সরবরাহকারী সংস্থার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খোলা ছিল। কিন্তু নতুন শান্তি বিলে সেই ‘রাইট টু রিকোর্স’ বা সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে দায় চাপানোর অধিকার কার্যত সীমিত করে দেওয়া হয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।

লোকসভায় বিল নিয়ে বিতর্কে কংগ্রেস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, এটি একটি 'কর্পোরেটপন্থী আইন', যা বড় শিল্পগোষ্ঠী ও বিদেশি পারমাণবিক সংস্থাগুলিকে সুবিধা দিতে তৈরি করা হয়েছে। কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়ারির প্রশ্ন, যদি কোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে এবং তার কারণ হয় সরঞ্জামের ত্রুটি বা নকশাগত ভুল, তাহলে কেন সেই সরবরাহকারী সংস্থাকে দায়মুক্ত রাখা হবে? তাঁর মতে, এই বিলের মাধ্যমে সরকার আসলে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের দায় রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে, আর কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে আইনি ঝুঁকি থেকে বাঁচাচ্ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হিন্দু মানেই বিজেপি নয়, অযোধ্যা শিক্ষা দিয়েছে, লোকসভায়  রাহুল

Rahul Gandhi's Lok Sabha Speech: সোমবার অধিবেশন শুরু হতেই একের পর এক বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দাগতে দেখা গেল রাহুলকে। কার্যত তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে নাকানিচোবানি খেতে দেখা গেল একাধিক তাবড় বিজেপি নেতাকে।

শান্তি বিলের আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা। প্রস্তাবিত আইনে অপারেটরের দায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এই সীমার বেশি ক্ষতির ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে। কংগ্রেসের বক্তব্য, একটি বড়সড় পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর এই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ একেবারেই অপ্রতুল। তারা ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেছে, কয়েক দশক আগে ঘটে যাওয়া সেই শিল্প বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণের অঙ্কই ছিল এর চেয়েও বেশি। সেখানে পারমাণবিক দুর্ঘটনার মতো মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে এত কম ক্ষতিপূরণ কীভাবে ন্যায্য হতে পারে, সেই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির।

কেন্দ্র সরকারের যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। সরকারের দাবি, ভারতের পারমাণবিক শক্তি খাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হলে এবং ভবিষ্যতের শক্তি চাহিদা মেটাতে হলে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমান দায়বদ্ধতা আইন এতটাই কঠোর ছিল যে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। শান্তি বিল সেই জট খুলে দেবে এবং দেশে নতুন পারমাণবিক প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াবে বলে সরকারের আশা। সরকারের মতে, এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, তেমনই কম কার্বন নির্গমনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও সাহায্য করবে পারমাণবিক শক্তি।

তবে বিরোধীরা সরকারের এই যুক্তিকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা যায় না। পারমাণবিক শক্তি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে একবার দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করতে হয়। সেই কারণে এই খাতে আইনি দায়বদ্ধতা যতটা সম্ভব কঠোর হওয়া উচিত, শিথিল নয়। শান্তি বিল সেই দায়বদ্ধতাকেই দুর্বল করছে বলে তাদের দাবি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই অচল লোকসভা?

Opposition protest in Parliament: বিরোধীরা জনস্বার্থের নানা বিষয়ে আলোচনা চাইছে, কিন্তু সরকার নির্বাচন কমিশন বা বিহার নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলতেই দিতে চাইছে না।

বিল নিয়ে বিতর্কের আরেকটি বড় দিক হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা। বিরোধীদের মতে, বেসরকারি সংস্থার প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো হলেও পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বায়ত্তশাসন ও শক্তি বাড়ানোর বিষয়টি বিলে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কংগ্রেসের প্রশ্ন, যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে বড় কর্পোরেট সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না।

এই সমস্ত কারণ দেখিয়ে কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দল শান্তি বিলকে যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর দাবি জানায়। তাদের বক্তব্য ছিল, এমন সংবেদনশীল একটি বিষয় নিয়ে তড়িঘড়ি আইন পাশ না করে বিশেষজ্ঞ মতামত, জনমত ও বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু সরকার সেই দাবি মানেনি। শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের ওয়াকআউটের মধ্যেই লোকসভায় বিলটি পাশ হয়ে যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি বিল শুধু একটি আইন নয়। এটি আসলে দেশের উন্নয়নের পথ নিয়ে চলা বড় বিতর্কের অংশ। একদিকে দ্রুত শিল্প গড়ে তোলা, বিদেশি বিনিয়োগ আনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চাপ রয়েছে। অন্যদিকে মানুষের নিরাপত্তা, পরিবেশের ক্ষতি এবং দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি বিল এই দু'দিকে ঠিকমতো ভারসাম্য রাখতে পেরেছে কি না, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

এখন দেখার বিষয়, এই বিল কার্যকর হওয়ার পর বাস্তবে কীভাবে তার প্রয়োগ হয়। পারমাণবিক প্রকল্পে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়লেও, কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা যায় কি না, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা। আপাতত শান্তি বিল ভারতের পারমাণবিক নীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হলেও, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।