ধূপগুড়ির আকাশে রহস্যময় উল্কাপিণ্ড! কীভাবে তৈরি হয় মহাজাগতিক আলো?

Mysterious Fireball Over North Bengal: সাধারণত, মহাজাগতিক কোনো ধ্বংসাবশেষের অবশিষ্টাংশ যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠে বা অন্য গ্রহে পৌঁছায় তাকে উল্কাপিণ্ড বলা হয়।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
ধূপগুড়ির আকাশে রহস্যময় উল্কাপিণ্ড! কীভাবে তৈরি হয় মহাজাগতিক আলো?

১৮ ডিসেম্বর জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি এলাকার কয়েকজন মহাকাশ প্রেমী ভাই জানালো, গাধিয়ার কুটি (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ যথাক্রমে 26.64° N ও 88.91° E ) নামক জায়গায় সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ, ধূমকেতুর উল্টানো লেজের মতো উজ্জ্বল আলো দেখতে পাওয়া গিয়েছে, সেই সঙ্গে বিকট শব্দও শুনতে পায় তাঁরা। প্রথমে অতটা আমল না দিলেও পরে তাঁদের পাঠানো ছবি ও ভিডিও দেখে অনুমান করতে পারি যে বেচারিদের দাবি অমূলক নয়।

এমনিতেই গত কয়েক মাস ধরে মহাকাশ প্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল 3I/ ATLAS নামের আন্তনাক্ষত্রিক ধূমকেতু (যদিও এটি ধূমকেতু কিনা সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে সংশয় রয়েছে); এদিকে নাসা জানিয়েছে, ১৯ ডিসেম্বর পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে (আনুমানিক ২৭০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে) অবস্থান করবে এই মহাজাগতিক বস্তুটি; সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসার আগেই, পূর্ব থেকে উত্তর-পূর্ব দিগন্তে দেখা মিলতে পারে সেটির। কী এই 3I/ATLAS?

ধূপগুড়ির গাধিয়ার কুটি এলাকায় দেখা মিলল ধূমকেতুর উল্টানো লেজের মতো উজ্জ্বল আলো

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১১ বছর ধরে মহাকাশ স্ক্যান করে মানচিত্র! গায়া যেভাবে বদলে দিচ্ছে বিজ্ঞানীদের ধারণাও

Gaia Spacecraft: মহাকাশের স্ক্যানিং ও ম্যাপিংয়ের সময়, গায়া একটি নতুন ধরনের কৃষ্ণগহ্বর আবিষ্কার করে, যেটি পৃথিবীর খুব কাছাকাছি অবস্থিত।

এটি সাধারণত কঠিন বরফ (জল, কার্বন ডাই অক্সাইড ইত্যাদি) এবং ধুলো ও পাথরের সমন্বয়ে গঠিত এক মহাজাগতিক বস্তু, যার কেন্দ্রে থাকে ০.৬ থেকে ৫.৬ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নিউক্লিয়াস, যাকে কেন্দ্র করে গ্যাস ও ধুলোর মেঘ প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ল্যারি ডেননিউ ২০২৫ সালের ১ জুলাই রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এই মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পান।

এসবের মাঝে উত্তরবঙ্গের আকাশে হঠাৎ অগ্নিপিণ্ডের দেখা মেলায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সাধারণত এত কম উচ্চতায় উল্কার মতো মহাজাগতিক বস্তুর উপস্থিতির সম্ভাবনা প্রবল। অবশ্য কৃত্রিম উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ থেকে নির্গত টুকরোও এর জন্য দায়ী হতে পারে, তবে সে সম্ভাবনা এক্ষেত্রে ক্ষীণ বলেই ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণত, মহাজাগতিক কোনো ধ্বংসাবশেষের অবশিষ্টাংশ যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠে বা অন্য গ্রহে পৌঁছায় তাকে উল্কাপিণ্ড বলা হয়। এগুলোর ভর খুব বেশি না হলেও গতিবেগ মারাত্মক (সেকেন্ডে প্রায় ১১ থেকে ৭২ কিলোমিটার) বেশি হওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় জ্বলে ওঠে। আমরা জানি, মহাশূন্যে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, সেজন্য এরা বাধাহীন ভাবে ঘুরতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় তীব্র ঘর্ষণের মুখোমুখি হয়। বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে দেখেছেন এই ঘর্ষণের ফলে উল্কাপিণ্ডের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা পৌঁছায় প্রায় ৩,০০০° ফারেনহাইট (যা পৃষ্ঠের স্ফুটনাঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি) এবং উল্কাপিণ্ডটি স্তরে স্তরে বাস্পীভূত হতে শুরু করে।

আবার এই ঘর্ষণের কারণে উল্কাপিণ্ডের উপাদান এবং বায়ুমণ্ডলের অণুগুলি ভেঙে আয়নে পরিণত হয়, যাদের পুনরমিলনে তৈরি হয় একটি উজ্জ্বল উল্টানো লেজ, যেমনটি গতকাল ধুপগুড়িতে দেখা গিয়েছে। ধুমকেতু বা উল্কা বা কোনো মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে এরকম উল্টানো লেজ দেখা যায় কেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাকাশে কীসের হৃদস্পন্দন? কোন রহস্যের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা?

১৩ জুলাই নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গবেষকরা জানালেন, একেবারে হৃদস্পন্দনের মতো রেডিও তরঙ্গ ধরা দিয়েছে কানাডার সুবিশাল টেলিস্কোপে। এমনটি এর আগে কখনও ধরা পড়েনি আবিশ্ব কোনও টেলিস্কোপেই।

ধূপগুড়িতে মহাজাগতিক আলো

আমরা জানি, সূর্য থেকে প্রতি মুহূর্তে অজস্র আহিত কণা তীব্র বেগে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে, যাদের ধাক্কায় মহাজাগতিক বস্তুটিকে ঘিরে থাকা ধোঁয়া ও ধুলোর আস্তরণ সরে উল্টো দিকে চলে যায়। দেখলে মনে হবে যেন উল্টানো ঝাঁটা, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘আন্টি টেইল’।

ধূমকেতুর ক্ষেত্রে তো আনেক সময় দু'টি লেজ দেখা যায়– একটি ধুলোর লেজ (dust tail) আর একটি আয়ন লেজ বা গ্যাসীয় লেজ (Ion Tail or Gas Tail)। সূর্যের বিকিরণের ঠেলায় ধূমকেতুকে ঘিরে থাকা বাষ্পরাশি ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নে ভেঙে যায়। অপরদিকে, সূর্যের বিকিরণেও আহিত কণা থাকে। এদের মধ্যেকার আকর্ষণ ও বিকর্ষণের জন্য অনেক দু-দুটো লেজ দেখতে পাওয়া যায়। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, ঘর্ষণের কারণে, একটি গমের মতো আকারের উল্কাপিণ্ডের লেজ কয়েক ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। যে মহাজাগতিক ধ্বংসাবশেষের জন্য উল্কাপিণ্ডের জন্ম হয়, তার বেগ আরও বেশি হলে এই লেজ কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

আমাদের মনে হতে পারে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছানোর জন্য একটি উল্কাপিণ্ডকে ঠিক কত বড় হতে হবে? বিজ্ঞানীরা গণনা করে দেখেছেন, একটি ফুটবলের সাইজের উল্কাপিণ্ড বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষমেষ পৃথিবী পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; আর কোনোভাবে এর আকার যদি ২৫ মিটার ব্যাস বিশিষ্ট মাঠের চেয়ে বড় হয়, তাহলে পৃথিবী পৃষ্ঠে সাংঘাতিক ক্ষতের সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে। যদিও সচরাচর সেরকম উল্কার দেখা মেলে না। সাধারণত, অধিকাংশ উল্কাপিণ্ড আকারে ছোট হওয়ায় বায়ুমণ্ডলের মেসোস্ফিয়ারেই (৮০ কিলোমিটারের মধ্যে) জ্বলে শেষ হয়ে যায়। আকারে একটু বড় হলে (ওই মার্বেলের মতো), বায়ুমণ্ডলের ভিতর দিয়ে ধেয়ে আসা উল্কাপিণ্ডকে আমরা আমাদের দৃশ‍্যমান পরিমণ্ডলে দেখতে পাই— যেমন গতকাল এই রকম এক অপার্থিব আলোর দর্শন মিলেছিল জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ির আকাশে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।