গোরখনাথ মন্দিরে হামলা কি নতুন অশান্তির সলতে পাকাবে উত্তরপ্রদেশে?

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
গোরখনাথ মন্দিরে হামলা কি নতুন অশান্তির সলতে পাকাবে উত্তরপ্রদেশে?

সবে শেষ হয়েছে উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন। পরপর দু'বার উত্তরপ্রদেশের মসনদে বসেছেন যোগী আদিত্যনাথ। এর মধ্যেই খোদ মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অন্যতম ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু’ গোরখনাথ মন্দির আক্রমণ নিয়ে সরগরম উত্তরপ্রদেশের রাজ্য রাজনীতি। দু'দিন আগেই আহমেদ মুর্তাজা আব্বাসি নামের এক ব্যক্তি গোরখনাথ মন্দিরের দুই পিএসি জওয়ানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে। আহত হন দুই কনস্টেবল। এরপরেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ গ্রেফতার করে আব্বাসি-কে। তদন্তে নামে উত্তরপ্রদেশের অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াড। গোটা ঘটনার তদন্ত করতে নেমে এটিএস-এর হাতে উঠে আসে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। বম্বে আইআইটির প্রাক্তনী, পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আব্বাসি উদ্দ্যেশ্যপূর্ণভাবেই হামলা চালিয়েছে মন্দিরে। উত্তরপ্রদেশের ধর্মীয় রাজনীতিতে এই আক্রমণ বিভিন্ন সম্ভাবনাকে উসকে দিয়েছে।

‘গোরখনাথ মন্দির': উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির 'পাওয়ার পয়েন্ট'

উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির সুলুকসন্ধান করলেই দেখা যাবে কীভাবে ধর্ম, জাতপাত এখানকার রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। সেই নিরিখে ধরলে গোরখনাথ মন্দিরের গুরুত্ব উত্তরপ্রদেশ রাজনীতিতে অনস্বীকার্য। এখানকার মোহান্ত সম্প্রদায় বরাবরই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের হাত ধরে গোরখনাথ মন্দিরের এক নতুন ক্ষমতায়ন হয়েছে। ১৯৯৭ সালে গোরখনাথ মন্দিরেই যোগী সেবায়েতের ভূমিকায় যোগ দেন। দীর্ঘ ১৪ বছর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে নিজের অবদান রেখে ২০১৪-য় যোগী আদিত্যনাথ গোরখনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব পান। সেখান থেকেই ২০১৭-র উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে যোগীর নেতৃত্বে বিজেপির বিপুল বিজয় এবং উত্তরপ্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা। এহেন মন্দিরে হামলার ঘটনা এবং এটিএস-এর কাছে আব্বাসির স্বীকারোক্তি নিয়ে একাধিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

'সেক্রেড গেম': হামলা ও নীল নকশা

কেন গোরখনাথ মন্দিরেই হামলা চালাল আব্বাসি? পুলিশের এই প্রশ্নের মুখে আব্বাসি স্পষ্ট জানিয়েছে, গোটা ভারতে বিজেপি সরকারের আমলে মুসলিমদের ওপর যে আগ্রাসন ও আক্রমণ নেমে এসেছে, সেই প্রতিশোধস্পৃহা থেকেই সে আক্রমণ চালিয়েছে গোরখনাথ মন্দিরে। এমনকী, উদ্দেশ্য পূরণের পর আত্মঘাতী হওয়ার পরিকল্পনাও করে রেখেছিল সে। গোরখনাথ মন্দিরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু মন্দিরে হামলা যে দেশের রাজনীতিতে অশান্তি সৃষ্টি করবে, জেনেই আব্বাসি টার্গেট করেছিল গোরক্ষপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গোরখনাথ মন্দিরকে।

আব্বাসির ফোনের কল ডিটেইলস থেকে উঠে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য। ঘটনার দিন সে আবদুল রহমান বলে এক ব্যক্তিকে ফোন করে। দু'জনের মধ্যে একাধিকবার কথা হয়। এমনকী, এই হামলার পরিকল্পনা করার জন্য তারা দু'জন একসঙ্গে নেপাল গিয়েছিল। সেখানে উগ্রপন্থ্রী সংগঠন আইএস-এর ইফতিকারুদ্দিনের সঙ্গে তারা দেখা করে হামলার বিষয়ে পরামর্শ করে। গোটা ঘটনায় উগ্রপন্থী যোগের কথা মাথায় রেখে পুলিশ ও তদন্তকারী দলের অফিসাররা লাগাতার জেরা করেছেন আব্বাসিকে। জেরার সামনে আব্বাসি জানিয়েছে, দেশজুড়ে ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনাও করেছিল তারা। ভারতের মতো একটি দেশে কেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা বঞ্চিত ও অপমানিত হবেন, সেখান থেকেই তার মাথায় হামলার পরিকল্পনা এসেছিল।

এই ঘটনার পরই গোরখনাথ মন্দিরের প্রধান দর্শনার্থী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নিরাপত্তা আরও জোরদার করল পুলিশ। আগে যোগীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জেলা পুলিশ ও পিএসি-কে সরিয়ে সিআরপিএফ-এর ২৩৩ নম্বর ব্যাটেলিয়নকে যোগীর নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হল।

সাম্প্রদায়িক সলতে: আশঙ্কা ও সম্ভাবনা

গোরখনাথ মন্দির আক্রমণের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই সাম্প্রদায়িক অশান্তিকে উসকানি দিতে পারে। উত্তরপ্রদেশের মতো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাজ্যে এই ধরনের আক্রমণ স্বাভাবিকভাবে সাধারণ জনতাকে উত্তেজিত করতে পারে। যে উত্তরপ্রদেশের জনগণের বিপুল আস্থা অর্জন করেছেন যোগী, সেখানে এই ঘটনা মুসলিমদের ওপর আক্রমণের অছিলা হয়ে উঠবে না তো? সেক্ষেত্রে সরকার এবং প্রশাসন সাম্প্রদায়িক উসকানি রুখতে কতটা ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ করবে? আশি-কুড়ি বিভাজনের তত্ত্বে যিনি ভোট লড়েন, সেই যোগী আদিত্যনাথ কি কড়া হাতে পরিস্থিতি সামলাবেন?

তার উত্তর সময় দেবে।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।