না-গঙ্গার দেশে ভাতের পাতে মেঘের ছায়া

চষা মাটির ভেতর ঠেলে বেড়িয়ে আসছে পিরথিবির বুকের ওম। পিপাসা লাগছে অর। লাগবই তো। বৃষ্টি নাবল কি দু'-চার ফোঁটা?

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
না-গঙ্গার দেশে ভাতের পাতে মেঘের ছায়া

মাঠে মাঠে এখন চাষ দিতে লেগেছে মানুষ। এই দেখ, দশহরার দিনে সকাল থেকে কেমন মেঘ নেবেছে মাঠের ওপারে। চষা মাটির ভেতর ঠেলে কেমন ভাপ বেরিয়ে আসছে দ্যাখো! পিরথিবির ভেতরটো তেতেপুড়ে আছে গো। তারও তো খানিক খানিক পিপাসা লাগে, লয়?

তা জল হলে তবে তো! এ তো আর তোমার জলের দেশ লয়, এখেনে মানুষ জলের কাঙাল। নদীর বুকে দ্যাখো না কেমন বালি জমে তাল হয়ে রয়েছে! মানুষে ওই বালি ঠেলে ঠেলে এদিকে যায়, ওদিকে যায়। বন্যার বালি জমে বালির খাদান হয় একেকখানে। এখেনের মানুষ তাই জলের পিপাসায় বড় ব্যাকুল। এই তো দেখো না কেন, কাল এপাড়ার ছেলে-বুড়ো সব বাস ভাড়া করে সেই গঙ্গা চানে গেল। সে কী ঘটা গো! সেবার তো হাওড়া অবধিও গেছিল সব। তা এবেরে সব বললে, কলকেতায় গ্যাঞ্জাম কত! তারচে উদ্ধারণপুরেই চল কেনে! এপাড়ার মেয়ে-বউরা তাই উপোস গেল সারা দিন। ব্যাটাছেলেদের উপোস না গেলেও ক্ষতি নাই। ছেলেরা কি না খেয়ে পারে বাপু! সন্তুর বাপে তো চারটে মুড়ি ছাতু খেয়ে নিলে সক্কাল সক্কাল। দানা দানা আকের গুড় দে ছাতু-মুড়ি খাওনি তো! খেলে বুঝতে শান্তি কেমন। পেট ঠান্ডা একেবেরে।

তা গঙ্গা চানের পর খানিক খানিক মুড়ি খাওয়া হলো। তা বাপু ভিড় কত! দশহরা বলে কতা! উদ্ধারণপুরের ঘাট যেন উবজে পড়ছে। তা ঘরে ফিরে তো আর দড়াম করে শুয়ে পড়লে চলে না! সেই রান্না-খাওয়া সেরে তবে চাট্টি অব্‌সর হলো। তবু তা হলি কী হয়, গঙ্গা চানে এসে কিন্তু তুমি সেদ্ধ চালের ভাত খেতে পাবে না। তোমায় আলো চাল খেতে হবে। তা সে চালে ধম্ম হয়, তবু পেট কি ভরে গো! ভরে না। তার উপর এই দশহরায় আবার উপোস থাকো! সেই পুজো না হলে তুমি খেতে পাবে না। মনসাতলা নিকিয়ে মনসাগাছের ডাল পুঁতে পুজোর জোগাড়ে লেগেছে বুন আর মেয়ে। এই ফাঁকে খানিক খানিক চিনির পানা করে নিতি হবে। না, না নুন দিলি চলবিই না। পুজো না হলি 'পর তুমি নুন খেতে পাবে না আজ। আর যে নাগপঞ্চমী রাখবে, সে সারা সারা দিন খেতে পাবে না। তা এবারে অন্য শরিকের পালা পড়েছে, তাই খানিক সোয়াস্তি দেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
লীলাবতী, কালো বিড়াল আর জামাইষষ্ঠীর হাট

অরণ্যষষ্ঠীর গপ্পের চেয়ে ঢের বেশি কাব্যময় এই জামাইষষ্ঠীর হাটফেরতা বাজারের থলে।

এই দিনে লোকে তো বলে বিষ্টি হয়! তা কালে কালে কত কী যে হচে, কত কী যে না হচে, দ্যাখো কেনে! এই যে আমাদের রতন ওই মোড়ের মাথায় চায়ের দোকান খুলে বসেছে, ওকে নেমন্তন্ন করতে গেছিল তো সন্তুর বাবা। পেত্যেক দিন ওর দোকানে চা খাওয়া হয়, গল্পগাছা চলে, তা ওরে না বললি কী হয়! তা নেমন্তন্নর কথায় ফস করে দেশলাই চেয়ে বসে রতন। বলে, কাকা ম্যাচলাইটটা দ্যান তো। তা সে মনসাপুজোয় কী ধুম, কী ধুম আমাগো দ্যাশে। রায়নি শুনতে ভিড় কত! সে যদি তোমারে দ্যাখাতে পারতাম কাকা! মেয়ে, বুইনে, পাড়ার মাইয়ায়- সব মিলে সে যা ঘটা! দ্যাশে থাকতি সেসব দিন কী আছিল!

গল্পে গল্পে রতনের নিশ্বাস পড়ে। খাল-বিলের দ্যাশের থিক্কা কোথায় যে আইস্যা পড়সে! এমন বালি-জমা নদী হ্যায় জীবনে দ্যাহে নাই। কিন্তু মাইনষে আর কী করে! প্যাটের ধান্দায় আইস্যা পড়সে এই না-গঙ্গার দ্যাশে। ওই বালিখাদানের ওই ওপারে বাঙালপাড়া। সন্তুর বাপে জানে এসব, ঘরের লোককে তাই বলেই দিয়েছে, রতনের কথায় অবাক যেও না, বুঝলে! ওরা বাঙাল বটে। এহেন রতন আজ গঙ্গাপুজোয় না-গঙ্গার দ্যাশে পাত পেড়ে প্রসাদ পাবে, এই না কত! ফল, মণ্ডা, রঙিণ মঠ খেতে খেতে রতনের কি খানিক খানিক মন খারাপ হবে? অর বুইনে রথের মেলায় কেমন গোলাপি মঠ কিনত, সেই কি মনে পড়বে ওর? পড়তেও পারে, মাইনষের মন তো। ভূগোলরে সে মানতে চায় না।

এই তো গেলবারে শেতলষষ্ঠীর দিনে, সন্তুর বাপে কোটোয় ভরে কলাইসেদ্ধ এনে দিসিল। তা রতন কয় কী, এমন কলাইসেদ্ধ আগে খাই নাই কাকা। বেশ লাগসে। সন্তুর বাপে তাই এবারে বাড়িতেই ডাকসে অরে। রতন এখন এক মনে পরসাদ খায়। পরসাদ খাওয়া হলে সন্তুর পিসি বলে, ভাই আমাদের সঙ্গে খানিক আলোচালের ভাত খাও কেনে! লজ্জা লজ্জা! মুখ-হাত-পা ধুয়ে রতন তাই বসে পড়েছে ওই। ওই যে, কলকে ফুলের ওপাশে, নিকোনো দাওয়া! ওইখেনে। এমন দাওয়ায় বসে ও কতকাল ভাত খায় না ভাই-বুনেদের সঙ্গে। ভাতের মধ্যে দেখে ডাঁটা দেছে, ডিংলি দেছে, ঘি-করলা দেছে, মায় পটলও দেছে। সন্তুর ঠাকুমায় বলে কী, ছেলেটাকে বেলপাতা দে জ্বাল দেওয়া খানিক ঘি দাও না বউমা! সন্তুর মায়ে তাই ওই ঘরে গেছে, গন্ধ ছড়ানো ঘি আনতে।

না-গঙ্গার দ্যাশে এমন ভাতের পাতে যখন ম্যাঘের ছায়া নামে তখন রতন আর কী করতে পারে? তার ঠাকমায় কইত, এমন কইর‍্যাই তো। কইত, ও মনু খাইসো? খাইসো নি? অরে বাত দিবা না বউমা? বালাম চাউলের বাতে লাল টুকটুকে কুমড়াসেদ্ধ দিয়ে খাইতে যা সুখ! সে তোমারে কইবারে পারি না কাকা! রতনের এমন কথায় রতনের কাকা, আমাদের সন্তুর বাপে হাসে। বলে, এই তো জষ্টির মাঝামাঝি হয়ে গেল। ঘর ডিংলি লাগাও কেন! এ হলো গে তোমার ভাদুরে কুমড়ো। রতন এমন কথায় না হেসে পারে না। কয়, কাকা আমার আর জমি-জিরেত কই! সব তো গ্যাসে গিয়া। কাকা তবু খানিক খানিক বীজ দেছে অরে। বালির খাদান পেরিয়ে ওই নাবাল ঢালু জমির ওপারে একমুঠো গোবর সার দে, রতন ডিংলির বীজ রুইছে। রুইতে রুইতে মেঘ নামছে মাঠের ওপারে। চষা মাটির ভেতর ঠেলে বেড়িয়ে আসছে পিরথিবির বুকের ওম। পিপাসা লাগছে অর। লাগবই তো। বৃষ্টি নাবল কি দু'-চার ফোঁটা? মাটির গন্ধ পাইতেসেন আপনেরা? রতনরে জিগান, ও কইব- বালাম চাউলের গন্ধ পাচ্ছেননি কত্তা?

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।