সাদা কাপড়ে এক ছিটে কালি, কেন ঝালদায় গো-হারা হারতে হল তৃণমূলকে?

কোনও নির্বাচনে এমন লজ্জাজনক পরাজয়ের ইতিহাস তৃণমূলের যেমন নেই, তেমনই হেরে যাওয়ার পর তৃণমূলের কোনও প্রার্থীও এতদিন এতখানি চড়া সুরে দলের একাংশর বিরুদ্ধেই এভাবে তোপও দাগেননি।

Kanad Dasgupta
৩ মিনিট
সাদা কাপড়ে এক ছিটে কালি, কেন ঝালদায় গো-হারা হারতে হল তৃণমূলকে?

দলের 'ভরা কোটালে' তৃণমূল প্রার্থীর ঝুলিতে মাত্র ১৫২ ভোট! ২০১১-র পর বাংলায় এমন ঘটনা সম্ভবত এটাই প্রথম‌।

শাসক দলের ব্যাখ্যা হতে পারে, ওয়ার্ডটি ছিল কংগ্রেসের হাতে। গত পুর-নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেস প্রার্থী তপন কান্দু চলতি বছরের মার্চ মাসে খুন হওয়ার কারণেই পুরুলিয়ার ঝালদা পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে উপনির্বাচন হয়। এখানে কংগ্রেস প্রার্থী করে নিহত তপন কান্দু-র ভাইপো মিঠুন কান্দু-কে। ফলে একটা 'সিমপ্যাথি ওয়েভ' কাজ করেছে‌।

সহানুভূতির হাওয়া অবশ্যই ছিল। কিন্তু ওই হাওয়ার বেগ কি এতটাই ছিল যে, মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৯০ শতাংশই চলে যাবে কংগ্রেসের বাক্সে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দশ বছ‍র পর পাহাড়ে ভোট, গোর্খারা পেতে চলেছে নতুন নেতা?

এবারের ভোট হচ্ছে মোট ৯২২টি বুথে৷ ভোটার সংখ্যা ৭ লক্ষ ৩২ হাজার৷ পাহাড়ের ভোটের ইতিহাস বলছে, ৫ লক্ষর কাছাকাছি ভোটার আসতে পারেন ভোটকেন্দ্রে৷

ঝালদা পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১৭৯ জন। ভোট দিয়েছেন ১১২০ জন। আর এই ১১২০ জনের মধ্যে ৯৩০ জনই ভোট দিয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থীকে। কংগ্রেস প্রার্থী মিঠুন কান্দু ৭৭৮ ভোটে পরাজিত করেছেন নিকটতম তৃণমূল প্রার্থী জগন্নাথ রজককে। ঘাসফুলের প্রতীকে ছাপ দিয়েছেন মাত্র ১৫২ জন। বিজেপি প্রার্থী অবশ্য একজন ছিলেন, পেয়েছেন হাতে গোনা ৩৩ ভোট‍।

এই ফল প্রকাশ্যে আসার পর বেনজির ব্যবধান নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই রাজ্যের একটি ওয়ার্ডে তৃণমূলের ভোটার মাত্র ১৫২ জন? এর উত্তর স্রেফ 'সহানুভূতি হাওয়া' বলে এড়ানো যায় না। পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী কিন্তু বিষয়টি এড়িয়ে যাননি। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্ঘাতের অভিযোগ এনে তৃণমূল প্রার্থী জগন্নাথ রজক বলেছেন, “জয় প্রত্যাশিত ছিল। পিছন থেকে ছুরি মারা হলো। ঝালদা শহর তৃণমূল কংগ্রেস এই কাজ করল। এরাই অন্তর্ঘাতের পিছনে রয়েছে।"

কোনও নির্বাচনে এমন লজ্জাজনক পরাজয়ের ইতিহাস তৃণমূলের যেমন নেই, তেমনই হেরে যাওয়ার পর তৃণমূলের কোনও প্রার্থীও এতদিন এতখানি চড়া সুরে দলের একাংশর বিরুদ্ধেই এভাবে তোপও দাগেননি। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই বিষয়টি আর আগে এগোতে দেবে না। দলীয় স্তরে হয়তো খোঁজখবর নেওয়া হবে। তারপর এক সময়ে সবাই সবকিছু ভুলেও যাবে। তৃণমূলের একাংশই দলীয় প্রার্থীর জয়ের পথে কাঁটা ছড়িয়েছিলেন কি না, তার স্পষ্ট কোনও প্রমাণ বা তথ্য এখনও সামনে আসেনি। তাই অন্তর্ঘাতের বিষয়টি সামনে এনে কংগ্রেসের জয়কে খাটো করা অযৌক্তিক। তবে অন্তর্ঘাত যদি হয়েই থাকে, তার কারণ হতে পারে প্রার্থী বাছাই। হয়তো দলের স্থানীয় স্তরের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা-কর্মী এই প্রার্থীকে পছন্দই করেননি। তাঁদের হাতে হয়তো বিকল্প নাম ছিল। কিন্তু দলীয় অনুশাসন মেনে দল অনুমোদিত প্রার্থীকে মেনে নেন। এমন ক্ষেত্রে সাধারণভাবে দেখা যায়, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে এক বা একাধিক 'নির্দল' প্রার্থী দাঁড়িয়ে যান। কিন্তু ঝালদা পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে এমন কাণ্ড ঘটেনি। আপাতভাবে সব পক্ষই প্রার্থীর সমর্থনে 'নেমে পড়ে'। আর দলীয় পরাজিত প্রার্থীর অভিযোগ বলছে, এই 'নেমে পড়া'-র অর্থ, 'পিছন থেকে ছুরি মারা'। এমন হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কী এমন ঘটনা ঘটল যে, শাসক দলের এক প্রার্থীকে মাত্র ১৫২টি ভোট পেয়ে দৌড় শেষ করতে হলো? বিষয়টি স্বাভাবিক নয়৷

আর যদি তথাকথিত 'অন্তর্ঘাত' না হয়ে থাকে, যদি গোটা দল এক হয়ে ভোট করতে নামার পরেও এই ফল হয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হয় দেওয়ালের লিখন অন্য বার্তা দিচ্ছে।

সেক্ষেত্রে এমন ধরে নেওয়া অসংগত হবে না যে, জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে শাসক দলবিরোধী একটা চোরাস্রোত বয়ে চলেছে। এই ইঙ্গিত কখনওই শাসক দলের পক্ষে সুখকর নয়। ঝালদা পুরসভায় মোট ১২টি ওয়ার্ড। গত পুরভোটে ৫টি করে ওয়ার্ডে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেস। দু'টি আসনে জিতেছিল নির্দল। ফলে কোনও দলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা মেলেনি। এরপরই কংগ্রেস কাউন্সিলর তপন কান্দু খুন হয়ে যান। এই উপনির্বাচনে তৃণমূল যদি জয়ী হতো, তাহলে বোর্ড গঠনের কাছাকাছি চলে যেতে পারত। কংগ্রেস নিজের আসন ধরে রেখে ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এল।

চন্দননগরে পুরনিগমের ১৭ নং ওয়ার্ডেও ওই একই দিনে উপনির্বাচন হয়েছে। ফলপ্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, ওই ওয়ার্ডে সিপিএম প্রার্থী জিতেছে ১৩০ ভোটে। দ্বিতীয় স্থানে আছে তৃণমূল কংগ্রেস। উপনির্বাচনে বামেরা পেয়েছে ১০১৮ ভোট। তৃণমূল প্রার্থী সুজিতকুমার নাথ পেয়েছেন ৮৮৮ ভোট। গতবারের বিজয়ী দল বিজেপির প্রার্থী সৌমেন দাস পেয়েছেন ৬৭ ভোট। কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছে ৪৪ ভোট। চন্দননগর পুরনিগমের ভোটের আগে বিজেপি প্রার্থী গোকুলচন্দ্র পালের মৃত্যুর কারণেই এই ওয়ার্ডে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছিল। এই ওয়ার্ডে প্রায় ৩২ বছর পর জয়ী হল বামেরা। ফলে এই জয় বামেদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই পুরনিগমের মোট ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩১টি তৃণমূলের দখলে, একটি সিপিএমের এবং এই ১৭ নম্বর ওয়ার্ডটি শূন‍্য ছিল। এত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও তৃণমূল এই ওয়ার্ডটি কীভাবে হারল, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও। সবুজ ও গেরুয়ার টানাটানিতে বামেদের এই জয় স্বভাবতই বড় সাফল্য, যা অন্য ভাবনার খোরাক দিয়েছে রাজনৈতিক মহলকে।

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।