অ্যাম্বাসাডর ফিরছে ইলেকট্রিক স্কুটার হয়ে! কেমন হতে চলেছে নয়া এই যান?

বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ও বাইক, এই মুহূর্তে ভারতীয় অটোমোবাইল জগতে এই বিষয়টি রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। একাধিক স্টার্ট-আপ থেকে শুরু করে ভারতীয় এবং বিদেশি জনপ্রিয় কোম্পানিগুলি, সকলেই তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎচালিত গাড়ি এবং দু'চাকার বাহন বাজারে নিয়ে আসতে ব্যস্ত। সঙ্গে এই ইলেকট্রিক গাড়ি ও স্কুটি-র হাত ধরে বাজারে নতুন করে ফিরতে প্রস্তুত একাধিক পুরনো অটোমোবাইল ব্র্যান্ড। মাসকয়েক আগেই আমরা জানতে পেরেছিলাম, ভারতের পুরনো বাইক-নির্মাতা কোম্পানি LML আবারও ফিরছে ইলেকট্রিক বাইকের হাত ধরে। কিন্তু, এবার যে কোম্পানিটি ইলেকট্রিক স্কুটার নিয়ে আসছে, তা মোটেও কোনও সাধারণ কোম্পানি না, বরং এটি ভারতের প্রথম স্বাধীন গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি- হিন্দুস্থান মোটরস।

তবে, এই তালিকায় হিন্দুস্থান মোটরস-এর যুক্ত হওয়াটা যেন একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। ফরাসি গাড়ি-নির্মাতা সংস্থা পিউজো-র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল বয়সের ভারে জরাজীর্ণ হয়ে ওঠা হিন্দুস্থান মোটরস সংস্থায়। সম্ভাবনা ছিল, নতুন রূপে ফিরবে তাদের ট্রেডমার্ক অ্যাম্বাসাডর। হলোও ঠিক তাই। অ্যাম্বাসাডর ২.০ আসতে চলেছে আর কিছুদিনের মধ্যেই। সেই গাড়ির প্রথম লুক এবং ফিল দেখে রীতিমতো আপ্লুত হয়েছেন বিশ্বের তাবড় তাবড় গাড়িপ্রেমীরাও। কিন্তু গাড়ি কেনার ক্ষমতা তো আর সবার থাকে না। তাই এবার সাধারণ মানুষের কথা ভেবেই ঐতিহ্যের সঙ্গে নবীনত্বের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাজারে ফিরছে হিন্দুস্থান মোটরস। অ্যাম্বাসাডর গাড়ির পাশাপাশি এবার হিন্দুস্থান মোটরস তৈরি করবে ইলেকট্রিক স্কুটি। আর এই স্কুটার তৈরি হবে পশ্চিমবঙ্গেরই হিন্দমোটরের কারখানাটিতে।

প্রায় ন'বছরের বিরতির পর আবারও নতুন করে আলো জ্বলতে চলেছে হিন্দুস্তান মোটরসের উত্তরপাড়া কারখানায়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী দু'বছরের মধ্যেই এই কারখানা থেকেই তৈরি হবে নতুন হিন্দুস্থান মোটরস ইলেকট্রিক স্কুটার। যদিও এই ইলেকট্রিক স্কুটারের নাম অ্যাম্বাসাডর গাড়ির নামে রাখা হবে কি না, তা এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে এই ইলেকট্রিক স্কুটার যে ভারতীয় পথের 'রাজা'-র ঐতিহ্যকে বহন করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যে সংস্থার কাছে ন'বছর আগে মাত্র ৮০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে গিয়েছিল এশিয়ার দ্বিতীয় এবং ভারতের প্রথম গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি হিন্দুস্থান মোটরস, সেই কোম্পানির হাত ধরেই মার্কেটে ফিরতে চলেছে অ্যাম্বাসাডর এবং নয়া একটি ইলেকট্রিক স্কুটার।

আরও পড়ুন: মন্ত্রীরা চড়তেন নিয়ম করে, বাঙালির প্রিয় অ্যাম্বাসাডর যতটা পথ পেরিয়ে এল

দিনকয়েক আগে থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে অ্যাম্বাসাডর ২.০-এর প্রথম লুক। মানুষের মনে সাড়া ফেলতেও সক্ষম হয়েছে এই নতুন অ্যাম্বাসাডর। ভারতে যে কয়টি অটোমোবাইল ব্র্যান্ড তাদের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো হিন্দুস্থান মোটরস। ব্রিটিশ মোটর কর্পোরেশনের মরিস অক্সফোর্ড সিরিজ ৩ গাড়িটি তৈরি করার মাধ্যমেই ১৯৫৪ সালে হুগলির উত্তরপাড়ার বুকে গড়ে উঠেছিল হিন্দুস্থান মোটরস। তারপর থেকেই কালক্রমে অ্যাম্বাসাডর এবং কনটেসা-র মতো আইকনিক কিছু গাড়ি তৈরি শুরু করে হিন্দুস্তান মোটরস। যে ধারা নতুন করে শুরু হতে চলেছে ফরাসি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি পিউজো-র হাত ধরে।

হিন্দুস্থান মোটরসের ইলেকট্রিক স্কুটার
ইতিমধ্যেই ভারতের সবথেকে পুরনো গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিটি বিদ্যুৎচালিত স্কুটার তৈরি করার লক্ষ্যে ইউরোপের একটি অটোমোবাইল কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। হিন্দুস্থান মোটরসের ডিরেক্টর উত্তম বসু এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ইউরোপের ওই সংস্থার সঙ্গে তাদের মউ স্বাক্ষর হয়ে গিয়েছে। একটি সাক্ষাৎকারে উত্তমবাবু জানিয়েছেন, দু'টি কোম্পানির মধ্যে ৫১:৪৯ অনুপাতে শেয়ার ভাগ হবে এবং হিন্দুস্থান মোটরস বেশি অংশগ্রহণ করবে। তবে, ইলেকট্রিক স্কুটি নির্মাণ করার জন্য কিন্তু হিন্দুস্থান মোটরস পিউজো-র সঙ্গে যুক্ত হয়নি। এখানে আবার অন্য একটি ইউরোপীয় ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে হিন্দুস্থান মোটরস।

তবে এখনও পর্যন্ত ইকুইটি প্যাটার্ন নিয়ে সম্পূর্ণ আলোচনা হয়নি। পরবর্তীতে ইকুইটি প্যাটার্ন পরিবর্তিত হতে পারে বলেও জানিয়েছেন উত্তমবাবু। কিন্তু হুগলি শিল্পাঞ্চলের জন্য সবথেকে খুশির খবরটি হল, ইলেকট্রিক স্কুটার তৈরির জন্য হিন্দুস্থান মোটরস বেছে নেবে হুগলি উত্তরপাড়ার এই প্ল্যান্টটিকেই। ২০১৪ সালেই এই কারখানায় তালা পড়েছিল অ্যাম্বাসাডরের জনপ্রিয়তার অভাবে।

জানুয়ারি, ২০১৭ সালে হিন্দুস্থান মোটরসের সঙ্গে‌ একটি বৈঠকের পর অ্যাম্বাসাডর নেমপ্লেট পুরোপুরি কিনে নেয় পিউজো। মাত্র ৮০ কোটি টাকায় ফরাসি কোম্পানির হাতে বিক্রি হয় হিন্দুস্থান মোটরসের অ্যাম্বাসাডর। তখন থেকেই নতুন গাড়ি আনার পরিকল্পনা শুরু হয়। অ্যাম্বাসাডর দীর্ঘ ৬ দশক ধরে ছিল ভারতের সবথেকে জনপ্রিয় গাড়ি। ভারতের প্রত্যেক মন্ত্রী-আমলা, এমনকী ফিল্মস্টাররা পর্যন্ত এই বিশেষ গাড়ি ব্যবহার করতেন। ট্যাক্সির জন্য ব্যবহার হতো এই গাড়ি। সেই ঐতিহ্যকে যখন আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, তখন ইলেকট্রিক স্কুটার কেন নয়? বর্তমান যুগে যখন ইলেকট্রিক স্কুটারের জনপ্রিয়তা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সময় যদি হিন্দুস্থান মোটরসের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী কোম্পানি ইলেকট্রিক স্কুটার নিয়ে আসে, তাহলে তা যে জনগণের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি করবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

হিন্দুস্থান মোটরসের কারখানা
কলকাতার কাছেই হুগলি শিল্পাঞ্চল এলাকায় হিন্দুস্থান মোটরসের উত্তরপাড়া কারখানাটি এশিয়ার দ্বিতীয় সবচেয়ে পুরনো কারখানা। প্রথম স্থানে অবশ্যই রয়েছে জাপানের টয়োটা গাড়ির কারখানা। প্রথমে গুজরাতে ১৯৪৮ সালে এই কোম্পানিতে তৈরি হলেও সেইসময় গাড়ি তৈরি করার কোনওরকম সুযোগসুবিধা ছিল না। তারপরে ১৯৫৪ সালে এল পরিবর্তন। হিন্দুস্থান ল্যান্ডমাস্টারের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ করল উত্তরপাড়া হিন্দুস্থান মোটরস প্ল্যান্ট। ২০১৪-র সেপ্টেম্বর মাসে এই কারখানায় তালা পড়লেও এখনও এই কারখানার কাছে রয়েছে ২৯৫ একর জায়গা। কোনও একটি গাড়ি কিংবা বাইকের প্ল্যান্ট তৈরি করতে হলে, এতটা জায়গা একেবারেই পারফেক্ট।

তাই উত্তরপাড়ার এই প্ল‍্যান্টকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য বদ্ধপরিকর হিন্দুস্থান মোটরস। তাদের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যেই অ্যাম্বাসাডর এবং ইলেকট্রিক স্কুটারের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করেছে হিন্দুস্থান মোটরস। একটা সময় যে জায়গাটা জমজমাট থাকত এই কারখানার জন্য, সেখানে আজ আবারও আশার আলো জেগেছে। একটা সময় এই কারখানায় কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২,৩০০। এখন এই সংখ্যাটা মাত্র ৩০০ হলেও তাদের এই নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হিন্দুস্থান মোটরস।

বিদ্যুৎচালিত দুই চাকার যান নির্মাণ
ইউরোপীয় যে কোম্পানির সঙ্গে হিন্দুস্থান মোটরস যুক্ত হয়েছে, সেই কোম্পানিটি কিন্তু প্রধানত লক্ষ রাখবে বিদ্যুৎচালিত দুই চাকার যানবাহনের ওপরেই। বিদ্যুৎচালিত গাড়ি তৈরি করবে পিউজো। তাই তারা ব্যবহার করছে চেন্নাইয়ের কারখানাটি। যে-সময় হিন্দুস্থান মোটরস নতুন ইলেকট্রিক স্কুটার মার্কেটে নিয়ে আসছে, সেই সময় এটির জনপ্রিয়তা এবং প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক।

হিন্দুস্থান মোটরসের ডিরেক্টর উত্তম বসুও এই যৌথ প্রজেক্ট নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তাঁর কথায়, এখন জ্বালানির দামের যা পরিস্থিতি, সেই দিক থেকে দেখতে গেলে বিদ্যুৎ এখনও অনেকের কাছেই অনেক সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী। পশ্চিমি বিশ্বে এই জিনিসটির জনপ্রিয়তা এখন এতটাই বেশি যে, সাধারণ স্কুটারের থেকেও কোনও কোনও জায়গায় জনপ্রিয়তায় এগিয়ে এসেছে ইলেকট্রিক স্কুটার। তাই এই যৌথ প্রকল্প হিন্দুস্থান মোটরসের জন্যও বেশ লাভদায়ক হবে বলে মনে করছেন উত্তম বসু। তিনি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, এই যৌথ প্রকল্পে হিন্দুস্থান মোটরসের তরফ থেকে দেওয়া হবে জমি এবং কারিগর। অন্যদিকে ইউরোপীয় ওই কোম্পানিটি প্রদান করবে অর্থ এবং টেকনোলজি। তবে এই যৌথ প্রোজেক্টের ব্যাপারে এখনও অনেক বিষয়ই অজানা। কিন্তু তাতে কী, তাদের সাধের 'HM'-এর প্রতি যে তাদের ভালবাসা এখনও অটুট, তা তো অ্যাম্বাসাডর ২.০-র প্রথম ঝলকেই স্পষ্ট।

 

More Articles

;